শীতের সময়ে শ্বাসকষ্টের রোগীদের সমস্যা বেড়ে যায়, বিশেষ করে যারা অ্যাজমা বা হাঁপানি, সিওপিডি, ব্রঙ্কাইটিস, ব্রংকিয়েক্টাসিস বা দীর্ঘমেয়াদি কোনো শ্বাসকষ্টের সমস্যায় ভোগেন। শ্বাসকষ্টের চিকিৎসায় নানা ধরনের চিকিৎসা পদ্ধতি রয়েছে। মুখে খাওয়ার ওষুধ ছাড়াও কার্যকরী চিকিৎসা হচ্ছে ইনহেলার বা নেবুলাইজার। শ্বাসকষ্টের জন্য ব্যবহৃত মুখে খাওয়ার ওষুধ সেবনের পর পরিপাকতন্ত্রের মাধ্যমে রক্তের সাহায্যে শরীরের বিভিন্ন স্থানে তথা শ্বাসতন্ত্রে পৌঁছে। এতে শ্বাসকষ্টের লাঘব তাৎক্ষণিক বা আশাপ্রদ হয় না, কিন্তু ওষুধের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া বেশী হয়। পক্ষান্তরে ইনহেলার বা নেবুলাইজারের মাধ্যমে প্রয়োগকৃত ওষুধ সরাসরি শ্বাসযন্ত্রে প্রবেশ করায় অনেক বেশি কার্যকর ও নিরাপদ হয়। ইনহেলার বা নেবুলাইজারের মাধ্যমে প্রয়োগকৃত স্টেরয়েড বা শ্বাসযন্ত্র সম্প্রসারণ করার ওষুধ (ব্রংকোডাইলেটর) সূক্ষ্ম কণায় প্রস্তুতকৃত, যা শ্বাসের মাধ্যমে শ্বাসযন্ত্র তথা ফুসফুসের ভিতরে টেনে নিতে হয়। এভাবে ওষুধ প্রয়োগের ফলে ওষুধ সরাসরি শ্বাসযন্ত্রে কাজ করে, ওষুধের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়াও হয় কম এবং অনেক কম পরিমাণ ওষুধেই নির্দিষ্ট কার্যকারিতা পাওয়া যায়। সঠিক পদ্ধতিতে ইনহেলার ব্যবহার হাঁপানি বা অন্যান্য শ্বাসকষ্টের চিকিৎসায় খুবই কার্যকরী। তবে স্টেরয়েড জাতীয় ইনহেলার ব্যবহারের পর ভালভাবে কুলকুচি করতে হবে যাতে মুখগহ্বরে ওষুধ না লেগে থাকে।
ইনহেলার দুই ধরনের, মিটার ডোজ ইনহেলার (এমডিআই) ও ড্রাই পাউডার ইনহেলার (ডিপিআই)। মিটার ডোজ ইনহেলার স্পেসারের সাহায্যে ব্যবহার করলে বেশি উপকার বা কার্যকারিতা পাওয়া যায়, বিশেষ করে অতিশয় অসুস্থ বা অল্পবয়সি শিশু-কিশোর এবং বেশি বয়স্ক রোগীদের জন্য স্পেসারের মাধ্যমে ইনহেলার নেওয়া আবশ্যক।
কোনো সময় রোগীর শ্বাসকষ্টের সমস্যা তীব্র আকার ধারণ করলে ইনহেলার টেনে নেওয়ার মতো সক্ষমতা বা পরিস্থিতি থাকে না। তখন নেবুলাইজার মেশিনের মাধ্যমে তরল অবস্থায় প্রস্তুতকৃত ওষুধগুলোকে মেশিনের সাহায্যে বাষ্পাকারে পরিণত করে ফেসমাস্কের মাধ্যমে ব্যবহার করতে হয়, যা রোগীরা সহজেই শ্বাসযন্ত্র তথা ফুসফুসের ভিতরে টেনে নিতে পারে। জটিল শ্বাসকষ্টের রোগীকে নেবুলাইজারের মাধ্যমে ওষুধ প্রয়োগ করা হলে দ্রুত উপশম বা রোগ নিয়ন্ত্রণ সম্ভব হয়। তবে নিয়মিত চিকিৎসার জন্য নেবুলাইজার ব্যবহার না করে ইনহেলারই ব্যবহার করতে হবে। ইনহেলারের মাধ্যমে বিভিন্ন ধরনের ওষুধ যেমন, সালবিউটামল, সালমেটেরল, ফরমোটেরল, ইপ্রাটোপিয়াম, ফ্লুটিকাসন, বুডিসোনাইড, বেক্লোমেথাসন ইত্যাদি ব্যবহার করা হয়। উল্লিখিত কিছু কিছু ওষুধ নেবুলাইজারের মাধ্যমে ব্যবহারের জন্য তরল বা সল্যুশন আকারে পাওয়া যায়। এছাড়াও কিছু কিছু ঔষধ ডিপিআই পাউডার ক্যাপসুল হিসেবে পাওয়া যায়, যা রোটাহেলার জাতীয় ডিভাইস দিয়ে শ্বাসযন্ত্র তথা ফুসফুসের ভিতর টেনে নিতে হয়।
কীভাবে ইনহেলার, এমডিআই বা ডিপিআই এবং নেবুলাইজার ব্যবহার করবেন তা অবশ্যই আপনার চিকিৎসকের কাছে জেনে নিবেন। সঠিক পদ্ধতিতে ইনহেলার বা নেবুলাইজার ওষুধ ব্যবহার করলেই শ্বাসকষ্ট রোগ নিয়ন্ত্রণ বা নিরাময় করা সম্ভব। অনেকেই মনে করেন, ইনহেলার শ্বাসরোগের শেষ চিকিৎসা! আসলে তা নয়। ইনহেলার হলো আধুনিক, নিরাপদ ও সর্বোত্তম চিকিৎসা এবং রোগের শুরুতেই তথা বয়স যত কমই হোক না কেন, ইনহেলার দিয়ে চিকিৎসা করলে রোগ নিরাময়ের সম্ভাবনা বেশি থাকে এবং ফুসফুসের কার্যক্ষমতা নষ্ট কম হয়। তাই শুধু বেশি শ্বাসকষ্টের সময় নয়, হাঁপানি বা অন্যান্য শ্বাসকষ্টের রোগীদের চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী সারা বছর ইনহেলার ব্যবহার করতে হয়। যদিও ইনহেলার বা নেবুলাইজারের কাজ প্রায় একই, তবে নিয়মিত ব্যবহারের জন্য ইনহেলার আর রোগ জটিল আকার ধারণ করলে তাৎক্ষণিক উপশমের জন্য নেবুলাইজার ব্যবহার করার দরকার হতে পারে।
অধ্যাপক ডা. মো. খায়রুল আনাম, রেসপিরেটরি মেডিসিন, পপুলার কনসালটেশন সেন্টার, ধানমন্ডি, ঢাকা।