এত দিন সালমান খান, আমির খান আর শাহরুখ খান- এ তিনজনই ছিলেন দুষ্কৃৃতকারীদের টার্গেট। এ নিয়ে সময় কম গড়ায়নি। কিন্তু হুমকি-ধমকি ও হামলা আর থামেনি। এবার বলিউডের সাইফ আলী খানের ওপরও হামলা হয়ে গেল। এরপরই নড়েচড়ে বসেছে বিশ্ব। তাঁদের প্রশ্ন, কেন বলিউডের খানরা দুর্বৃত্তদের টার্গেট।
বলিউড অভিনেতা সাইফ আলী খানের ওপর দুর্বৃত্তদের হামলার ঘটনা নিয়ে তুমুল আলোচনা চলছে দেশ-বিদেশের সংবাদমাধ্যমগুলোতে। গত বুধবার মধ্যরাতে সাইফের মুম্বাইয়ের বান্দ্রার বাড়িতে এক দুর্বৃত্ত হঠাৎ অভিনেতার ওপর হামলা চালায়। এরপরই বিশ্বব্যাপী বিষয়টি নিয়ে উঠছে নানা প্রশ্ন। কে এবং কী কারণে এ হামলা চালিয়েছে সে প্রশ্ন নিয়ে চলছে নানা জল্পনা-কল্পনা। বিশ্বের নানা মিডিয়া বলছে, ভারতে নরেন্দ্র মোদি সরকার গঠনের পর থেকে হিন্দুত্ববাদীরা মাথা চাড়া দিয়ে উঠতে শুরু করে। গোঁড়া হিন্দু অনেকে নানা বিষয়ে মুসলমানদের হেনস্তা এবং তাদের সন্ত্রাসবাদী ও দেশদ্রোহী বলতেও দ্বিধা করেনি। এরই ধারাবাহিকতা হলো বলিউড খানদের ওপর এ হুমকি আর হামলা। এদিকে সাইফের ওপর এমন আকস্মিক হামলার সূত্র ধরে ভারতীয় পুলিশ প্রশাসন বলিউড খানদের ওপর আক্রমণের বিষয়টি আলাদাভাবে তুলে এনেছে। সাইফ আলী খানের ওপর হামলার সন্দেহে একজনকে গ্রেপ্তারও করেছে পুলিশ। গ্রেপ্তারের পর তদন্ত করতে গিয়ে যে তথ্য পাওয়া গেছে তা চমকে দিয়েছে সবাইকে। তদন্তকারীদের বরাতে জানা গেছে, ওই সময়টাতে শুধু সাইফ নন, দুর্বৃত্তের নিশানায় ছিল শাহরুখ খানের বাড়িও। সাইফের বাড়িতে হামলা করার দুই দিন আগেই নাকি বান্দ্রায় শাহরুখের বাড়ি মান্নাতেও হানা দিয়েছে এক সন্দেহভাজন ব্যক্তি। বাড়ির ভিতরে প্রবেশ না করলেও বাইরে থেকে চারপাশ দেখে এসেছিল সেই ব্যক্তি। মনে করা হচ্ছে, সাইফের দুষ্কৃতকারীই শাহরুখের মান্নাতের চারপাশ রেকি করতে পৌঁছেছিল। বিষয়টি খতিয়ে দেখতে শাহরুখের বাড়িতেও মুম্বাই পুলিশের একটি দল গেছে। মান্নাতের সামনে যে সন্দেহভাজন ব্যক্তিকে ঘোরাফেরা করতে দেখা গিয়েছিল সে ৬ থেকে ৮ ফুটের একটি লোহার মই বেয়ে মান্নাতে প্রবেশ করার চেষ্টাও করে বলে খবরে প্রকাশ। তবে এ মুহূর্তে সাইফ হামলাকে ঘিরে যে বিষয় জনমনে সন্দেহ বাড়াচ্ছে তা হলো- আক্রমণকারীদের টার্গেট কেন ‘খান’ তারকারা। সাধারণ মানুষ বলছে, যে অভিনেতা কখনো ধর্মীয় বিষয়ে কোনো ধরনের কটু কথা বলেননি, সেই আমির খানও দুর্বৃত্তের কবল থেকে রেহাই পাননি। সামাজিক অসংগতি নিয়ে নির্মিত টিভি সিরিজ ‘সত্যমেব জয়তে’র শুটিংয়ের সময় হত্যার হুমকি দেওয়া হয়েছিল আমির খানকে। এতে আক্ষেপ করে আমির খান বলেছিলেন, নিজ দেশে তিনি আর নিরাপদ নন। শুধু তাই নয়, নিরাপত্তা না পেলে দেশ ছাড়ার কথাও বলেছিলেন; যা নিয়ে তুমুল বিতর্কের সৃষ্টি হয়েছিল। নিজ মন্তব্যের জেরে আমিরের শত্রু বনে গিয়েছিলেন যারা, তারা যে হাত গুটিয়ে নিয়েছেন, এটি এখনো মনে করেন না আমির খান। ২৬ বছর আগে ‘হাম সাত সাত হ্যায়’ সিনেমার শুটিংয়ে গিয়ে কৃষ্ণকায় হরিণ শিকার করেছেন বলে অভিযোগ উঠেছিল সালমান খানের বিরুদ্ধে; যা নিয়ে বহুবার আদালতের চৌকাঠ মাড়াতে হয়েছিল তাঁকে। সবচেয়ে ভয়াবহ বিষয় হলো- হরিণ শিকারকে কেন্দ্র করে এখনো প্রাণনাশের হুমকি পেয়ে আসছেন সালমান। এক রকম মৃত্যুর খড়গ মাথার ওপর ঝুলিয়ে রেখেছে গ্যাংস্টার লরেন্স বিষ্ণোইয়ের দল। তাদের দাবি, যে কৃষ্ণকায় হরিণকে তাদের ধর্মীয় সম্প্রদায়ের মানুষ সৃষ্টিকর্তার দূত হিসেবে গণ্য করেন, সেই হরিণ শিকার করার অপরাধ কোনোভাবেই ক্ষমা করবেন না। যদিও লরেন্স বিষ্ণোই এখন ভারতের জেলে, তারপরও তাঁর নেটওয়ার্কের পান্ডারা দেশের নানা প্রান্তে খুনখারাবি চালিয়ে যাচ্ছে। শুধু এ অভিনেতা নন, একই সঙ্গে তাঁর বাবা খ্যাতিমান লেখক ও চিত্রনাট্যকার সেলিম খানকেও হুমকি দিয়েছে বিষ্ণোই গ্যাং। এ ছাড়াও সালমানের বাসা বান্দ্রার গ্যালাক্সি অ্যাপার্টমেন্টের বাইরে কয়েক মাস আগে কয়েক রাউন্ড গুলি চালিয়েছিল তারা। আমির, সালমানের মতো নিজ দেশে নিরাপদ নন বলিউড বাদশাহ শাহরুখ খান। মুম্বাইয়ের আন্ডারওয়ার্ল্ডের পক্ষ থেকে একাধিকবার হত্যার হুমকি পেয়েছেন এ অভিনেতা। প্রথম হুমকি এসেছিল মাফিয়াদের কথা অনুযায়ী কাজ না করার কারণে। শাহরুখ সাহসিকতার সঙ্গে তাদের সব প্রস্তাব ফিরিয়ে দিলে সেবার কোনো অঘটন ঘটেনি। কারণ তখনো শাহরুখ বলিউড বাদশাহ হয়ে ওঠেননি। পরবর্তী সময়ে অভিনয়ের পাশাপাশি প্রযোজক হিসেবে শাহরুখ যখন প্রথম সারিতে চলে আসেন, তখন আবার এ অভিনেতার ওপর রক্তচক্ষু মেলে মাফিয়ারা। তাঁর কাছে ব্লকবাস্টার সিনেমা ‘হ্যাপি নিউ ইয়ার’ সিনেমা থেকে আয় করা অর্থের কিছু অংশ দাবি করে বসেছিল। সেবার শাহরুখ নির্ভয়ে স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছিলেন তিনি কোনোভাবেই তাদের কোনো টাকা-পয়সা দেবেন না। এতে তারা যদি আক্রমণ করতে চায় করতে পারে, তিনি ভয় পান না। এমন জবাব পেয়ে মাফিয়ারা পিছিয়ে গিয়েছিল ঠিকই; রোষ যে এতটুকু কমেছে তার কোনো আভাস পাওয়া যায়নি। কারণ সেই ঘটনার পর আরও একবার গত বছরের নভেম্বরে ফোনে হুমকি পেয়েছেন শাহরুখ। ভারতীয় পুলিশি তদন্তে বেরিয়ে এসেছে, সেই ফোনটি এসেছিল ছত্তিশগড় থেকে। কিন্তু হুমকিদাতাকে সঠিকভাবে শনাক্ত করা যায়নি। কারণ তার ফোন নম্বরের কাগজপত্র ছিল জাল। এও জানা যায়নি, হুমকিদাতা কোনো মাফিয়া সদস্য কি না।
সব মিলিয়ে এখন মোটেও নিরাপদ নন বলিউড খানরা, বলছে বিশ্ব মিডিয়া। আর এর কারণ কি শুধু হিন্দুত্ববাদী রোষ ও মাফিয়া চক্র, নাকি এর পেছনে সুদূরপ্রসারী কোনো দেশি-বিদেশি নীলনকশা রয়েছে সেটি খতিয়ে দেখতে জোর দাবি উঠেছে ভারত এবং আন্তর্জাতিক অঙ্গনে।