ভারতের প্রখ্যাত চলচ্চিত্র নির্মাতা শক্তি সামন্ত ১৯৭৭ সালে চলচ্চিত্র পরিচালক এবং ঔপন্যাসিক শৈলজানন্দ মুখোপাধ্যায়ের গল্প অবলম্বনে নির্মাণ করেন কালজয়ী চলচ্চিত্র ‘আনন্দ আশ্রম’। এতে প্রধান চরিত্রে অভিনয় করেন অশোক কুমার, উত্তম কুমার, শর্মিলা ঠাকুর, মৌসুমী চ্যাটার্জি ও রাকেশ রোশন।
চলচ্চিত্রটি নির্মাণকালীন বেশ কিছু মজার ঘটনা আছে। এর মধ্যে একটি হলো- চলচ্চিত্রটির শুটিং শুরু হওয়ার পাঁচ-ছয় দিন আগে আনন্দ আশ্রমের হিন্দি স্ক্রিপ্টটা দাদামনি অর্থাৎ অভিনেতা অশোক কুমারের চেম্বারে পৌঁছাতে গিয়েছিলেন পরিচালক প্রভাত রায়। স্ক্রিপ্টটি হাতে নিয়েই অশোক কুমার বলেছিলেন, ‘এ কি তুমি হিন্দিটা নিয়ে এসেছ কেন? বাংলাটা নিয়ে এসো।’ অশোক কুমার এর কারণ জানিয়ে বলেন, ‘কদিন পরে বাংলার রয়েল বেঙ্গল টাইগার উত্তমের সামনে দাঁড়িয়ে অ্যাক্টিং করতে হবে। বাংলা ডায়লগ ঠিকঠাক বলতে না পারলে ও তো আমাকে চিবিয়ে খেয়ে নেবে।’ পরদিন প্রভাত রায় সকালেই অশোক কুমারকে বাংলা স্ক্রিপটা পৌঁছে দিলেন। বিকালে উত্তম কুমার কলকাতা থেকে মুম্বাইয়ে পৌঁছেই শক্তি ফিল্মসের অফিসে হাজির। বললেন, ‘প্রভাত আনন্দ আশ্রমের স্ক্রিপটা দে।’ প্রভাত রায় বাংলাটা হাতে দিতেই বলে উঠলেন, ‘আরে বাংলাটা দিলি কেন ওটা আমি ম্যানেজ করে দেব। তুই আমাকে হিন্দিটা দে। দাদামনির সামনে হিন্দি সংলাপ বলে অভিনয় করতে গেলে তো লেজেগোবরে হয়ে যাব। চিবিয়ে ছিবড়ে করে দেবে।’ হিন্দি স্ক্রিপটা উত্তম কুমারের হাতে দিয়ে প্রভাত রায় বললেন, ‘কাল দাদামনিও এই একই কথা বলেছিলেন।’ পাশ থেকে নির্মাতা শক্তি সামন্ত বললেন, ‘উত্তমদা লড়ে যান দাদামনির সঙ্গে।’ উত্তম কুমার কপালে হাত ঠেকিয়ে বললেন, ‘মাথা খারাপ, ওনার সঙ্গে লড়ব। কত বড় অ্যাক্টর উনি, বাপরে।’ একজন অভিনেতার আরেকজন অভিনেতার প্রতি অসীম শ্রদ্ধা দেখে সেদিন প্রভাত রায় অবাক হয়েছিলেন। উত্তম কুমারের এমন অনেক মানবিক গুণাবলি ছিল। পর্দার বাইরে এবং ভিতরে সবখানেই তিনি ছিলেন অনন্য এবং অসাধারণ একজন মানুষ। অনেকের ধারণা, উত্তম কুমার শুধু একজন রোমান্টিক ঘরানার অভিনেতা। সেই ধারণা তিনি ভুল করে দিয়েছিলেন। রোমান্টিকতার বাইরেও শক্ত অবস্থান ছিল উত্তম কুমারের। নিজেই ছিলেন নিজের প্রতিদ্বন্দ্বী। নির্মাতারাও তাঁর বিকল্প খুঁজে পাননি। শুধু রোমান্টিক নায়ক নন, ব্যতিক্রমী অনেক চরিত্রে অভিনয় করেছেন উত্তম। সে সব ছবি অভিনেতা হিসেবে তাঁকে সার্থক প্রমাণ করেছে। ছবিগুলো যুগ যুগ ধরে তাঁর অভিনয়ের স্মারক হয়ে আছে। তাঁর বহুরূপী অভিনয়ের গুণকীর্তন তাই দিকে দিকে। অষ্টাদশ শতকের ফিরিঙ্গি কবি অ্যান্টনি। তার ওপর ছবি তৈরি হবে। কে হবেন সেই কবি? নির্বাচন করা হলো উত্তমকে। ‘অ্যান্টনি ফিরিঙ্গি’ ছবিতে নামভূমিকায় ছিলেন তিনি। একজন কবির আবেগ, হতাশা, যন্ত্রণা, কবির লড়াইয়ে উত্তেজনা-
সবই সার্থকভাবে তুলে ধরেছিলেন উত্তম। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের গল্প ‘খোকাবাবুর প্রত্যাবর্তন’ অবলম্বনে নির্মিত ছবিতে গৃহভৃত্য রাইচরণের চরিত্রে উত্তমের অসাধারণ অভিনয় সবার মনে দাগ কাটে। বিমল মিত্রের উপন্যাস নিয়ে ‘স্ত্রী’ ছবিতে লম্পট অথচ সরলমনা জমিদারের চরিত্রেও তিনি অনন্য। তিনি এখানে খলনায়ক হয়েও প্রধান ভূমিকায়। তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়ের উপন্যাস ‘বিচারক’ অবলম্বনে তৈরি ছবিতে নাম ভূমিকায় ছিলেন উত্তম কুমার। বিচারকের মনোজগতের দ্বন্দ্ব সার্থকভাবে পর্দায় তুলে ধরেন তিনি। ‘শেষ অংক’ ছবিতে তিনিই যে স্ত্রীর হত্যাকারী বিষয়টি দর্শককে চমকে দেয়। ‘সপ্তপদী’তে ফাদার কৃষ্ণেন্দ, ‘অগ্নিশ্বর’ ছবির চিকিৎসক, ‘নিশিপদ্ম’ ছবির মাতাল, ‘থানা থেকে আসছি’র ইন্সপেক্টর, ‘দেবদাস’র চুনিলাল এসব চরিত্র নায়ক উত্তমকে নয়; বরং অভিনেতা উত্তমকে তুলে ধরে। ‘আমি, সে ও সখা’ ছবিতে চিকিৎসক সুধীরের ভূমিকায় তাঁর অভিনয়ও ছিল অসাধারণ। সত্যজিৎ রায়ের ‘চিড়িয়াখানা’ ছবিতে গোয়েন্দা ব্যোমকেশ বক্সির ভূমিকায় ছিলেন অনবদ্য। ‘চিড়িয়াখানা’ ও ‘অ্যান্টনি ফিরিঙ্গি’ ছবিতে অভিনয়ের জন্য সে বছর (১৯৬৭) তিনি সেরা অভিনেতার জাতীয় পুরস্কার পান।
১৯৬১ সালে ‘দোসর’ ছবিতে অভিনয়ের জন্যও সেরা অভিনেতার জাতীয় পুরস্কার পান। ‘হারানো সুর’, ‘হ্রদ’, ‘সপ্তপদী’, ‘নায়ক’, ‘গৃহদাহ’, ‘এখানে পিঞ্জর’, ‘অমানুষ’, ‘বহ্নিশিখা’ ছবির জন্য আটবার বেঙ্গল ফিল্ম জার্নালিস্ট অ্যাসোসিয়েশনের সেরা অভিনেতার পুরস্কার পান। উত্তম কুমার বাংলা চলচ্চিত্রে অভিনয়ের ধারা পাল্টে দেন। লাউড (চিৎকারসর্বস্ব) অভিনয়ের ধারা পাল্টে তিনি আন্ডারটোন (নিচুস্বর) ও স্বাভাবিক অভিনয়ের ধারার সূচনা করেন। তাই তাঁকে অনবদ্য এক আন্তর্জাতিক মানের অভিনেতা বলতে কলকাতা চিত্রজগৎ দ্বিধা করেনি।