ষাটের দশক থেকে রুপালি পর্দা দাপিয়ে বেড়িয়েছেন বেশ কজন জনপ্রিয় নায়িকা, দর্শকমন জয় করে অভিনয় করেছেন। নানা খেতাবেও ভূষিত হয়েছেন। লাভ করেছেন রাষ্ট্রীয় সম্মাননা। আজ তাঁদের চলচ্চিত্রে নেই কোনো ব্যস্ততা। এমন কয়েকজন নায়িকার কথা তুলে ধরেছেন- আলাউদ্দীন মাজিদ
শবনম : ষাটের দশকে এহতেশাম শবনমকে নায়িকা করে নির্মাণ করেন ‘চান্দা’ ছবিটি। এরপর প্রচুর ছবিতে অভিনয় করেন তিনি। দেশ স্বাধীন হওয়ার পর পশ্চিম পাকিস্তান চলে যান। সেখানকার চলচ্চিত্রে নিয়মিত হন।
নব্বই দশকে বাংলাদেশে ফেরেন। সর্বশেষ ওই দশকেই কাজী হায়াতের ‘আম্মাজান’ ছবিতে অভিনয় করেন। এরপর মানসম্মত গল্প আর চরিত্রের অভাবে অভিনয় থেকে দূরে সরেন তিনি। এখন বাসায় ধর্মকর্ম আর সংসারের কাজকর্ম নিয়েই কাটছে শবনমের অবসর সময়।
সুচন্দা : ষাটের দশক থেকে আশির দশক পর্যন্ত জনপ্রিয়তার শীর্ষে থাকা অভিনেত্রী কোহিনূর আক্তার সুচন্দা হঠাৎ করেই অভিনয় থেকে বিদায় নেন। ২০০৫ সালে নির্মাণ করেন জহির রায়হানের উপন্যাস অবলম্বনে চলচ্চিত্র ‘হাজার বছর ধরে’। তিনি একাধারে অভিনেত্রী, প্রযোজক ও পরিচালক। চলচ্চিত্রের সার্বিক অবস্থা মন্দ হওয়ায় স্বেচ্ছায় এ জগৎ থেকে দূরে সরেন তিনি। ছেলেমেয়ে আর নাতিদের নিয়ে অবসর সময় কাটান। নানা রোগ প্রায়ই ভোগায় তাঁকে।
সুজাতা : ষাটের দশকে সালাউদ্দীন পরিচালিত ‘রূপবান’ ছবির মাধ্যমে চলচ্চিত্রে আসেন সুজাতা। এরপর অভিনয় এবং চলচ্চিত্র নির্মাণ করেন ২০০০ সালের প্রথম পর্যন্ত। বর্তমানে বাসার নানান কাজ ও ধর্মকর্ম নিয়েই কাটছে এ অভিনেত্রীর সময়।
শাবানা : ১৯৬৭ সালে এহতেশামের ‘চকোরী’ ছবিতে শাবানা নায়িকার ভূমিকায় প্রথম অভিনয় করেন। ৩ শতাধিক চলচ্চিত্রে অভিনয়, ২৫টি চলচ্চিত্র প্রযোজনা ও এগারো বার জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারসহ আজীবন সম্মাননা পেয়েছেন। ১৯৯৬ সালে আজিজুর রহমানের ‘ঘরে ঘরে যুদ্ধ’ ছবিটিতে ছিল তাঁর শেষ অভিনয়। এরপর ব্যক্তিগত কারণে চলচ্চিত্র থেকে দূরে সরে যান এবং আমেরিকা প্রবাসী হন। মাঝে-মধ্যে দেশে আসেন। মূলত ধর্মকর্ম ও সংসার নিয়েই কাটছে বিউটিকুইন খ্যাত শাবানার অবসরের দিনকাল।
ববিতা : ১৯৬৮ সালে জহির রায়হানের ‘সংসার’ চলচ্চিত্রের মাধ্যমে বড় পর্দায় আসেন ববিতা। সর্বশেষ ২০১৪ সালে নার্গিস আক্তারের ‘পুত্র এখন পয়সাওয়ালা’ ছবিতে অভিনয় করেন তিনি। এরপর গল্পের মানহীনতার কারণে চলচ্চিত্র থেকে স্বেচ্ছা নির্বাসনে চলে যান। এখন সমাজকল্যাণমূলক কাজ নিয়েই দেশ-বিদেশে ব্যস্ত রয়েছেন। ববিতা বছরের বেশির ভাগ সময় কানাডায় তাঁর পুত্র অনীক ও প্রবাসী ভাইদের সঙ্গে থাকেন। দেশে থাকলে গুলশানের বাড়িতে ছাদে বাগান পরিচর্যা নিয়েই সময় কাটে তাঁর।
অলিভিয়া : অলিভিয়া প্রথম বড় পর্দায় নায়িকা হয়ে আসেন এস এম শফী পরিচালিত ‘ছন্দ হারিয়ে গেলো’ ছবির মাধ্যমে। ১৯৭২ সালে ছবিটি মুক্তি পায়। এরপর জনপ্রিয়তা নিয়ে- দি রেইন, মাসুদ রানা, যাদুর বাঁশি, বাহাদুর, পাগলা রাজাসহ শতাধিক ছবিতে অভিনয় করেন। ১৯৮৬ সালে ‘হিম্মতওয়ালী’ ছবির পর ব্যক্তিগত নানা জটিলতায় বড় পর্দা ছেড়ে লোকচক্ষুর আড়ালে চলে যান তিনি। বর্তমানে সংসারজীবন নিয়েই কাটছে তাঁর সময়।
জয়শ্রী কবির : ১৯৭৫ সালে প্রখ্যাত চলচ্চিত্রনির্মাতা আলমগীর কবিরের হাত ধরে বড় পর্দায় আসেন জয়শ্রী কবির। তাঁর প্রথম ছবি ‘সূর্যকন্যা’। এরপর সীমানা পেরিয়ে, রূপালী সৈকতে, পুরস্কারসহ হাতে গোনা কয়েকটি ছবিতে অভিনয় করেন এবং জনপ্রিয়তা পান। আশির দশকের শেষদিকে ব্যক্তিজীবনের নানা টানাপোড়েনের কারণে চলচ্চিত্র ছাড়েন এবং একসময় লন্ডন প্রবাসী হন। সেখানে শিক্ষকতা পেশা শুরু করেন।
অঞ্জু ঘোষ : ‘বেদের মেয়ে জোসনা’ খ্যাত অভিনেত্রী অঞ্জু ঘোষ। ১৯৮২ সালে ‘সওদাগর’ ছবি দিয়ে বড় পর্দায় তাঁর অভিষেক। ১৯৮৬ সালে মুক্তি পাওয়া ‘বেদের মেয়ে জোসনা’ ছবিটি তাঁর অভিনয় জীবনের সেরা ছবি। আশির দশকের শেষ ভাগে কলকাতা পাড়ি জমান তিনি। এরপর টালিগঞ্জের চলচ্চিত্রে নিয়মিত হন। একই সঙ্গে যাত্রাপালাও করেন। ২০১৯ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে সাঈদুর রহমান সাঈদের ‘মধুদা’ ছবিতে অভিনয়ের জন্য ঢাকায় আসেন এবং এক সপ্তাহ থেকে কলকাতা চলে যান। বর্তমানে তিনি কলকাতার সল্টলেকে বাসার কাজ আর ধর্মকর্ম নিয়ে অবসর সময় কাটাচ্ছেন। এর মধ্যে একটি ছবি নির্মাণের ঘোষণা দিলেও এ নিয়ে আর কোনো খবর আপাতত নেই।
রোজিনা : ১৯৭৬ সালে কালিদাসের ‘জানোয়ার’ চলচ্চিত্রের মাধ্যমে বড় পর্দায় আসেন রোজিনা। ১৯৯২ সাল পর্যন্ত প্রায় ২ শতাধিক চলচ্চিত্রে কাজ করেন তিনি। বিরতি দিয়ে ২০০০ সালের শুরুতে মতিন রহমানের ‘রাক্ষুসী’ ছবিতে কাজ করেন। ২০২৩ সালে মুক্তি পায় তাঁর নির্মিত ও অভিনীত ছবি ‘ফিরে দেখা’। এরপর ‘এখনই সময়’ নামের একটি ছবি নির্মাণের ঘোষণা দিলেও এখন পর্যন্ত এটি নির্মাণ শুরু করেননি তিনি। বছরের বেশির ভাগ সময় তিনি আমেরিকায় প্রবাসজীবন কাটান। দেশে এলে সামাজিক কর্মকাণ্ড নিয়েই বেশি ব্যস্ত থাকেন।