বাংলাদেশের পাপেটম্যান শিল্পী মুস্তাফা মনোয়ার। এ সব্যসাচী একাধারে চারুশিল্পী, নির্দেশক ও শিল্প গবেষক। নতুনধারার শিল্প বিনির্মাণে যিনি বরাবরই সৃজনী ও উদ্ভাবনী প্রতিভার স্বাক্ষর রেখেছেন। ৮৯ বছর বয়সি এ কিংবদন্তির সঙ্গে কথোপকথনে - পান্থ আফজাল
মাঝে অসুস্থ ছিলেন, এখন কেমন আছেন?
আসলে বয়স তো হয়েছে, তাই না? ৮৯ তো কম কথা নয়! তাই নানা রকম রোগ বাসা বেঁধেছে। এ সুস্থ-অসুস্থতা নিয়েই তো জীবন। তবে এখন বেশ ভালো আছি, সুস্থ আছি।
জীবন নিয়ে আপনার দর্শন জানতে চাই...
আমি মনে করি, বেঁচে থাকাটা কোনো ব্যাপারই না। দুই দিন থাকলেও যা, তিন দিন থাকলেও তা। আর বেঁচে থাকার সঙ্গে কোনো চাওয়া-পাওয়ার সম্পর্ক নেই। আবার প্রকাশের সম্পর্ক নেই। বেশিদিন বাঁচলেই কি বেশি প্রকাশ করব? তা নয়। যতটুকুু পেরেছি আমি নিজে মনে করি যথেষ্ট পেরেছি।
নতুন বছরে আপনার প্রত্যাশা কী?
নতুন বছরে যদি আমরা কিছুটা পথ দেখাতে পারি, তাহলে সেই পথে গেলে নিশ্চয়ই আরও নতুন পথ তৈরি হবে। কিন্তু আমরা বহু পরিবর্তন দেখেছি দেশের। সামাজিক-সাংস্কৃতিক পরিবর্তন দেখেছি, রাজনৈতিক পরিবর্তন দেখেছি। তবে আমাদের এখনকার সময়টা খুবই পরিবর্তনের সময় এবং নতুন নির্মাণের সময়। তাই নতুন নির্মাণের যে অভিজ্ঞতা ও ইচ্ছা, এটা যেন সর্বদা সবার থাকে। আর সবচেয়ে বড় কথা- বাংলা সাহিত্য ও সংস্কৃতি এত বড়, বিশেষ করে বাংলা ভাষাটা এত বড়, সেই সঙ্গে রবীন্দ্র-নজরুল- এসব যেন আমরা জানতে চেষ্টা করি।
সেকালের সাদা-কালো ভিজ্যুয়াল যুগের সঙ্গে এ সময়ের রঙিন যুগের পার্থক্য নিয়ে কিছু বলবেন কি?
সাদা-কালো বা কালার যাই হোক অথবা সাদা-কালো যখন ছিলও না তখন কি আমাদের কালচার থেমে ছিল? মানুষের যে মনের ইচ্ছাটা আমি নিজেকে প্রকাশ করব, সেই প্রকাশের কোনো মিডিয়া হয় না। বিশেষ কোনো মিডিয়া হয় না। যখন পাথর ছিল তখন তো পাথর খোদাই করে মনের ইচ্ছা প্রকাশ করেছে মানুষ। তারপর পাতাতে লিখেও করেছিল। আসলে মনের ভাব প্রকাশের যদি ইচ্ছা থাকে, সেখানে মিডিয়া তো কিচ্ছু না। মিডিয়া তো যান্ত্রিক ব্যাপার। আর মানুষের যে মনের ইচ্ছা সেটা চিরন্তন; একসময় প্রকাশ করবেই সে।
মঞ্চ, নাটক আর ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রির কি কোনো পরিবর্তন জরুরি?
অবশ্যই দরকার আছে। অনেক কিছু এগোবার দরকার আছে। কিন্তু আমাদের একটা দোষ আছে, আমরা যেটা দেখছি সেটাকে ভালো করে দেখছি না। প্রশংসাও করতে চাই না। আমরা না দেখার ভান করি। এটার অর্থ নিজেকে বড় করা। একটা দাম্ভিকতা! আমি মনে করি, যেটা হচ্ছে সেটা ভালোই হচ্ছে। পরে যদি কেউ আসে সেও একসময় ভালো করবে। তাই সর্বদা খারাপ বলা বা অন্য ব্যাখ্যা দেওয়া ঠিক নয়। এখন তো অনেক কিছুই ঠিক আছে। আমাদের সময় তো কিচ্ছু ছিল না, শুধু চক ছাড়া। আমরা তাই দিয়ে সেট করেছি এবং মানুষের জীবনও তাই। প্রক্রিয়া লাগে না, জিনিসপত্র লাগে না। এই হৃদয়টাই আসল। যে যা কিছু পারে, সে প্রকাশ করবেই। নিষ্ঠা যদি থাকে তাহলে কোনো কিছুরই দরকার নেই।
টিভি ইন্ডাস্ট্রির উত্তরণে কোনো পরামর্শ দেবেন?
হ্যাঁ, টেলিভিশনের একটা বিশাল কর্তব্য যে, ছোটদের অনুপ্রাণিত করা। তবে অনুপ্রাণিত মানে যদি হয় অনেক জিনিসপত্র, যান্ত্রিক কতগুলো জিনিস-তাহলে তো কোনোদিনই অনুপ্রাণিত হবে না। কত অল্পে যা কিছু আছে, সবকিছুকে শ্রদ্ধা করে সেসব হতে পারে। সেই শিক্ষা যদি বাড়ি থেকে পায়, তাহলে আর কিছুর অভাব হবে না। তারা দেখবে, শিখবে। পৃথিবী দেখবে, আকাশ দেখবে, শিখবে। কোথায় যে কে লুকিয়ে আছে শিক্ষা দেওয়ার জন্য, এটা তো বলা ভারী মুশকিল!