বাঙালির সর্বকালের সেরা অভিনেত্রীদের মধ্যে এখনো অদ্বিতীয় মহানায়িকা সুচিত্রা সেন। তিনি যেমন পর্দায় অপ্রতিদ্বন্দ্বী অভিনয় দিয়ে নিজেকে রহস্যঘেরা করে রেখেছিলেন তেমনি ব্যক্তিজীবনের নানা ঘটনায় আজও রহস্যময়ী হয়ে আছেন। কানাঘুষা ছিল উত্তম-সুচিত্রার গোপন সম্পর্ক নিয়ে। যদিও সেই গসিপে সিলমোহর কোনোদিনই দেননি এ দুজনের কেউই। একটা সময় যখন সুচিত্রা সেন অভিনয় থেকে সরে গেলেন তখন প্রথম যে কারণটা ওঠে এসেছিল তালিকায়, তা হলো উত্তম কুমার। ুতাঁর সঙ্গে অভিনয় করতে না পারার কারণেই নাকি তিনি অভিনয় থেকে বিরতি নিয়েছিলেন। সুচিত্রা সেনের অভিনয় ছাড়া প্রসঙ্গে মুখ খোলেন সুচিত্রার মেয়ে অভিনেত্রী মুনমুন সেন। তিনি জানান, ‘মা অভিনয় ছেড়েছিলেন চিত্রনাট্যের কারণে’। দূরদর্শনে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে আসল সত্য খোলাসা করেছিলেন মুনমুন সেন। ১৯৭০ দশকে ধীরে ধীরে পাল্টে যেতে থাকে ছবির ধরন। পাল্টে যেতে থাকে গল্প। তিনি যে পরিচালকদের সঙ্গে কাজ করতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করতেন তাঁরাও প্রয়াত হয়েছিলেন। যার ফলে কীভাবে তিনি ছবির গল্পের সঙ্গে মানিয়ে নেবেন বুঝতে পারছিলেন না। মুনমুন স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছিলেন, সুচিত্রা সেন একটা সময় প্রশ্ন করতেন তিনি কার সঙ্গে অভিনয় করবেন। তখন উত্তম কুমারের প্রয়াণ ঘটেছে। পর্দা থেকে তাই সরে দাঁড়ানোর সিদ্ধান্তই নিয়েছিলেন সুচিত্রা সেন। বুঝে উঠতে পারেননি ঠিক কী ধরনের ছবিতে নিজেকে তুলে ধরবেন। তাই রাতারাতি সরে দাঁড়িয়েছিলেন সিনে দুনিয়া থেকে। একবার দীনেন গুপ্তের ‘দেবী চৌধুরাণী’ ছবিটি করার সময় সুচিত্রা সেনের মধ্যে কেমন যেন এক জড়তা লক্ষ্য করা যেত। আসলে দেবী চৌধুরাণীর নায়ক ব্রজেশ্বর চরিত্রের জন্য যে বয়স হওয়া উচিত, সেটা উত্তম বাবু অনেক আগেই পেরিয়ে এসেছিলেন। আবার দেবী চৌধুরাণী বা প্রফুল্লর ভূমিকার জন্য সুচিত্রাও একটু বেশি বয়সের জন্য বেমানান হয়ে গিয়েছিলেন। ফলে ছবিটি বক্স অফিসে মার খেয়েছিল। এ ছবিতে অভিনয় করতে গিয়ে সুচিত্রা কিছুতেই যেন স্বচ্ছন্দ হতে পারছিলেন না। শেষ পর্যন্ত জানা গেল, ছবির নায়ক রঞ্জিত মল্লিক তাঁর চেয়ে বয়সে অনেক ছোট বলে সুচিত্রার এ সংকোচ। পরে অবশ্য সেটা কেটে গিয়েছিল। ঘনিষ্ঠ এক সাংবাদিককে সুচিত্রা বলেছিলেন, এ চরিত্রে উত্তম কুমার থাকলে অভিনয়টা অন্য মাত্রায় নিয়ে যেতাম। উত্তম-সুচিত্রা জুটির প্রথম হিট ছবি ‘অগ্নিপরীক্ষা’। আশাপূর্ণা দেবীর কাহিনি নিয়ে ১৯৫৪ সালে অগ্রদূত (বিভূতি লাহা) পরিচালিত এ ছবি ঝড় তুলেছিল। ওই সময় থেকেই উত্তম-সুচিত্রা জুটির সূত্রপাত। এ ছবির সাফল্য থেকেই সুচিত্রা একটু একটু করে নিজেকে পাল্টাতে থাকেন। ঘনিষ্ঠ ব্যক্তি ছাড়া বাকিদের সঙ্গে বেশি মিশতেন না। মেপে কথা বলতেন। উত্তম কুমারের কিন্তু কোনো পরিবর্তন ছিল না। তিনি ছিলেন আগের মতোই দিলদরিয়া। অগ্নিপরীক্ষা সুপার-ডুপার হিট করার পর ছবি নির্বাচনে সুচিত্রা অসম্ভব চুজি হয়ে পড়লেন। কাহিনি, চিত্রনাট্য ও নিজের চরিত্র না জেনে কোনো ছবিতে সাইন করতেন না। এদিকে প্রযোজক-পরিচালকদের লম্বা লাইন পড়ে গেল তাঁর বাড়ির সামনে। সবার ধারণা, উত্তম-সুচিত্রাকে নিয়ে ছবি করলে আরেকটা অগ্নিপরীক্ষা হবেই। ব্যাপারটা যে ভুল নয়, সেটা এদের জুটির পরবর্তী ছবিগুলোই প্রমাণ করেছে।
উত্তম কুমারের সঙ্গে সুচিত্রা সেন যে ৩০টি ছবি করেছেন, তার মধ্যে সুচিত্রার প্রিয় ছবির তালিকায় ছিল- অগ্নিপরীক্ষা, শিল্পী, সাগরিকা, সবার উপরে, পথে হলো দেরী, কমললতা প্রভৃতি। বিশেষ করে ‘সাগরিকা’ ছবির কথা মিসেস সেন বারবার তাঁর প্রিয়জনদের কাছে উল্লেখ করেছেন। এ ছবির বিষয়বস্তু সেই যুগের পক্ষে ছিল যথেষ্ট সাহসী। এক অন্ধ ব্যক্তিকে সারা দিন দেখাশোনার পর রাতে তাঁকে ঘুম পাড়িয়ে ফিরে যায় এক অবিবাহিতা সুন্দরী তরুণী। পরিচালক অগ্রগামীর সরোজ দে চাইলে ছবিতে অনেক ঘনিষ্ঠ দৃশ্য রাখতে পারতেন। কিন্তু যেভাবে দুজনের নিষ্কাম প্রেমের দৃশ্য দেখানো হয়েছে, তাতে সরোজ বাবুর রুচির ভূয়সী প্রশংসা করতেন সুচিত্রা সেন। সুচিত্রা সেন যখন যে ছবিতে কাজ করতেন সেই ছবিতে অভিনীত চরিত্রের সঙ্গে একাত্ম হয়ে যেতেন।
তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়ের কাহিনি নিয়ে ‘সপ্তপদী’ ছবিটি করেছিলেন পরিচালক অজয় কর। নায়ক কৃষ্ণেন্দুর চরিত্রে উত্তম কুমার। রীনা ব্রাউনের ভূমিকায় সুচিত্রা সেন। গল্পে নায়ক-নায়িকার মধ্যে বিস্তর কলহের পর শেষ পর্যন্ত মধুর সমাপ্তি ঘটবে। সেই অনুসারে বাদানুবাদের দৃশ্যগুলো টেক করেছিলেন অজয় বাবু। ক্যামেরা চালু হলেই সুচিত্রা যেন রাগে ফেটে পড়তেন উত্তম কুমারের ওপর। কাট বলার পরও অনেকক্ষণ তার মধ্যে উত্তেজনা থাকত। পরে নিজেই উত্তম কুমারের কাছে এগিয়ে গিয়ে বলতেন, ‘খুব রাগ দেখিয়ে ফেলেছি, তাই না? কিছু মনে করো না, প্লিজ।’