১০ মার্চ বাংলাদেশ প্রতিদিন পত্রিকায় প্রকাশিত ‘অধ্যাপক টি এ চৌধুরী আর নেই’ খবরটা পড়ে মুহূর্তে মনটা ভারাক্রান্ত হয়ে যায়। ৯ মার্চ তিনি না ফেরার দেশে পাড়ি জমান। ওই দিন বিকালে কানাডা থেকে হোয়াটসঅ্যাপে খবরটি আমাকে প্রথম জানায় কানাডাপ্রবাসী আমার ছেলে স্বাগত ঘোষ। ডা. টি এ চৌধুরীর ব্যাপারে তার আগ্রহের কারণ পরে বলছি। অধ্যাপক টি এ চৌধুরীর বয়স হয়েছিল ৮৭ বছর। তাঁর পুরো নাম আবুল হাসনাত মোহাম্মদ তৌহিদুল আনোয়ার চৌধুরী। স্ত্রীরোগ ও প্রসূতিবিদ্যা বিষয়ে কিংবদন্তি এই চিকিৎসক দীর্ঘ প্রায় ছয় দশক রোগীদের চিকিৎসাসেবা দিয়ে গেছেন। তাঁর চিকিৎসা ও পরামর্শে দীর্ঘদিন পর মা হতে পেরেছেন সন্তানপ্রত্যাশী অনেক নারী। চিকিৎসাসংক্রান্ত প্রশাসনিক বিভিন্ন পদেও তিনি সফলতার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করেছেন। চিকিৎসার পাশাপাশি গ্রামীণ জনগোষ্ঠীর মধ্যে শিক্ষার আলো ছড়িয়ে দেওয়ার ব্যাপারেও তাঁর বিশেষ অবদান ছিল। তাঁর নিজ জেলা নোয়াখালীতে প্রতিষ্ঠা করেছেন একটি বিদ্যালয়। চিকিৎসাসেবায় বিশেষ অবদানের জন্য ২০১৭ সালে তাঁকে স্বাধীনতা পুরস্কার দেওয়া হয়।
আশির দশকের মাঝামাঝি সময়। দেশের বিশিষ্ট স্ত্রীরোগ বিশেষজ্ঞ হিসেবে টি এ চৌধুরীর খ্যাতি তখন দেশব্যাপী ছড়িয়ে পড়েছে। আমার প্রথম সন্তান পৃথিবীর আলো দেখবে। দেশের এই বিশিষ্ট চিকিৎসকের অধীনে চেকআপে থাকার পরামর্শ দেন অনেকে। খোঁজ নিয়ে জানতে পারি, প্রতিদিন বিকালে শান্তিনগরে তাঁর ব্যক্তিগত চেম্বারে রোগী দেখেন তিনি। কিন্তু আগে থেকে অ্যাপয়েন্টমেন্ট অর্থাৎ সিরিয়াল নিতে হবে। কয়েক সপ্তাহ অপেক্ষার পর অ্যাপয়েন্টমেন্ট পাই। প্রথম দিন তাঁর প্রতিষ্ঠিত ফরিদা ক্লিনিকে ঢুকে দেখি ওয়েটিং রুম রোগীতে ভর্তি। দেয়ালে টাঙানো পোস্টার- ‘ডেলিভারির জন্য নয়, চিকিৎসার জন্য আসুন।’ এটা পড়ে খটকা লাগল। মনটা খারাপ হয়ে গেল। আমার তো তেমন কোনো সমস্যা নেই। আমি তো এসেছি রুটিন চেকআপের জন্য। আমাকে কি ফিরিয়ে দেবেন স্যার? তখন চার মাস চলছে। যদি এমন হয়, তখন আমি কোথায় যাব, কী করব? এসব দুশ্চিন্তা আমার মাথায় ঘুরপাক খাচ্ছে। অবশেষে একসময় আমার ডাক পড়ল। মনে কিছুটা ভয় নিয়ে ভিতরে ঢুকলাম। ভিতরে ঢুকে দেখি পরিবেশ খুবই শান্ত। ছিমছাম কক্ষ। টেবিলটা গোছানো। কোনো সমস্যা আছে কি না, জানতে চাইলেন স্যার। জবাব দিলাম, ‘না’। প্রয়োজনীয় রুটিন চেকআপ শেষে কিছু ওষুধ প্রেসক্রাইব করলেন। কিছু টেস্ট করতে দিলেন। ব্যবস্থাপত্রের ওপর ইংরেজিতে বড় করে লিখে রাখলেন ‘নো কমপ্লেইন’। রক্তের গ্রুপ লিখে রাখলেন। ব্যবস্থাপত্রে বিভিন্ন রঙের কালি ব্যবহার করতেন তিনি। ওষুধের নাম কালো কালিতে; বিশেষ নির্দেশনা লাল কালিতে। পরবর্তী চেকআপের তারিখের জন্য আবার অন্য কালি। কথা বলতেন মেপে মেপে। প্রয়োজনের বেশি একটি শব্দও উচ্চারণ করতেন না। তাই বলে কোনো তাড়াহুড়া করতেন না। যে রোগীর জন্য যতটুকু সময় দেওয়া প্রয়োজন, ততটুকু সময় ঠিকই তিনি দিতেন। তাঁর ক্লিনিকে ডাক্তার দেখানোর পর চেম্বারের বাইরে এসে ফি জমা দিতে হতো। এত বড় ডাক্তার। কিন্তু সে তুলনায় ফি ছিল খুবই কম। আমার স্পষ্ট মনে নেই। তবে যত দূর মনে পড়ে তখন তাঁর ফি ছিল দুই বা তিন শ টাকা। টি এ চৌধুরী স্যার ছিলেন রাশভারী প্রকৃতির। তাঁকে যেমনটা দেখেছি, তিনি ছিলেন খুবই ধৈর্যশীল এবং পরিশ্রমী। একটি ঘটনার কথা বলি। একদিন আমার সিরিয়াল অনেক পরে থাকায় রাত প্রায় ১২টার দিকে স্যারের চেম্বারে আমার ডাক পড়ে। আমার আগে তিনি অনেক রোগী দেখেছেন। কিন্তু স্যারের মুখের দিকে তাকিয়ে আমার মনে হলো, আমিই স্যারের প্রথম রোগী। চেহারায় ক্লান্তির কোনো ছাপ নেই। এতটাই ধীরস্থির ছিলেন তিনি। ঠান্ডা মাথায় রোগীদের সবকিছু বুঝিয়ে বলতেন। প্রসবের আগে সর্বশেষ যেদিন স্যারকে দেখাতে যাই সেদিন চেম্বারের বাইরে অপেক্ষমাণ আমার স্বামীকে ডেকে নিয়ে তিনি বললেন, ‘সিজার’ করতে হতে পারে। সম্ভাবনা ফিফটি পার্সেন্ট। সে ক্ষেত্রে সম্ভাব্য ব্যয়ের একটা ধারণা দিয়ে তিনি যোগ করলেন, সিজার আমাদের এখানেও করাতে পারেন অথবা আপনাদের পছন্দমতো অন্য কোনো ক্লিনিকেও করাতে পারেন। সিদ্ধান্ত আপনাদের। যা হোক, সন্তান প্রসবের জন্য স্যারের ক্লিনিকে নির্দিষ্ট দিনে ভর্তি হই। আমার প্রথম সন্তান ভূমিষ্ঠ হবে। তাই সিজার না করে অনেকটা সময় অপেক্ষা করেন স্যার ও তাঁর টিম। সফলও হন তাঁরা। নরমাল ডেলিভারি হয়। আমি পুত্র সন্তানের মা হই। প্রথম মাতৃত্বের স্বাদ পাই। আমার দ্বিতীয় সন্তান সুপ্রীতি ঘোষের জন্মও হয় এই ক্লিনিকে স্যারের তত্ত্বাবধানে। প্রসঙ্গত আমার দুই সন্তানই চিকিৎসক। ক্লিনিকে ভর্তি থাকাকালীন লক্ষ করেছি, স্যার মাঝরাত পর্যন্ত চেম্বারে রোগী দেখে পরদিন খুব ভোরে প্রতিটি কেবিন ভিজিট করে রোগীদের দেখে যেতেন। ক্লিনিকের সবকিছু চলত নিয়মমাফিক। সিস্টার বা নার্সকে ডাকাডাকির প্রয়োজন হতো না। এত কম খরচে এত সুন্দর সেবা তখন রাজধানীর অন্য কোনো ক্লিনিকে ছিল কিনা আমার জানা নেই। মৃত্যু চিরন্তন সত্য। কিন্তু কিছু কিছু মানুষ আছেন যাঁদের চিরবিদায়ে দেশ ও সমাজের এতটাই ক্ষতি হয় যা সহজে পূরণ হওয়ার নয়। প্রফেসর টি এ চৌধুরী তেমনই একজন ব্যক্তিত্ব। চিকিৎসাসেবায় তাঁর অসামান্য অবদান অনস্বীকার্য। প্রয়াত স্যারের স্মৃতির প্রতি গভীর শ্রদ্ধা জানাই। মহান সৃষ্টিকর্তা যেন তাঁকে জান্নাতবাসী করেন, অন্তর থেকে এই প্রার্থনা করি।
♦ বনানী রায় চৌধুরী