ড. এ এম এম শওকত আলী ১৯৬৬ ব্যাচের সিএসপি অফিসার ছিলেন। তাঁর বড় ভাই এম আকতার আলী ছিলেন ১৯৬৫ ব্যাচের সিএসপি অফিসার। দুই ভাই-ই ডাকসাইটে অফিসার ছিলেন। আমি ১৯৮৩ সালে বাংলাদেশ সিভিল সার্ভিসে যোগদান করি। তখন থেকেই দুই সহোদর সিএসপির মেধা, দক্ষতা ও সাহসী মনোভাবের নানা গল্প শুনেছি। তাঁরা দুই ভাই তখন যুগ্মসচিব। এম আকতার আলীর সঙ্গে আমার কখনো দেখা হয়নি। ড. এম শওকত আলীর সঙ্গে আমি কাজ করেছি। তিনি যখন সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা, আমি অতিরিক্ত সচিব। ওই সময় তিনি আমার বিশেষ শ্রদ্ধাস্পদ প্রিয় মানুষে পরিণত হন।
ড. এ এম এম শওকত আলী ছিলেন অসাধারণ মেধাবী। তিনি একজন দক্ষ, বাস্তববাদী, ন্যায়নিষ্ঠ, সময়নিষ্ঠ, সাহসী ও দৃঢ়চিত্ত অফিসার ছিলেন। উপদেষ্টা হিসেবেও ঠিক ৯টা-৫টা অফিস করতেন। আমি তাঁর সঙ্গে এক বছর চাকরি করেছি। কখনো তাঁর সময়নিষ্ঠার ব্যত্যয় দেখিনি। তিনি ৯টা বাজার ৫ মিনিট আগে অফিসে উপস্থিত হতেন এবং ঠিক ৫টায় বেরিয়ে যেতেন। উপদেষ্টা রাজনৈতিক পদ। তা সত্ত্বেও তাঁর কোনো ভিজিটর থাকত না। তিনি অফিস সময়ের পুরোটা নিবিষ্ট মনে দাপ্তরিক কাজ করতেন। তাঁর টেবিলে কোনো ফাইল পৌঁছার কয়েক মিনিটের মধ্যে ফেরত আসত। তাঁর সিদ্ধান্ত প্রদানের ক্ষিপ্রতা ছিল শিক্ষণীয়। তিনি অতি সহজে যেকোনো জটিল বিষয়ে সঠিক সিদ্ধান্ত দিতে পারতেন। সিদ্ধান্ত দিতে কখনোই ঢিলেমি করতেন না।
আইনানুগ ও ন্যায়ানুগ সিদ্ধান্ত দিতেন। তাঁর মধ্যে কোনো আঞ্চলিকতাপ্রীতি, স্বজনপ্রীতি ও প্রিয়তোষণ দেখিনি। তিনি যার যা ন্যায্য পাওনা নিশ্চিত করার নীতি মেনে চলতেন। কারও প্রতি ন্যায্যতা নিশ্চিত করার জন্য তিনি প্রয়োজনে স্রোতের উল্টো দিকে হাঁটতেও দ্বিধান্বিত হতেন না। অনুজদের কাজের স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ করতেন না। কোনো তদবির করতেন না। অনুজদের মেধা ও দক্ষতার স্বীকৃতি দিতেন। বটবৃক্ষের মতো ছায়া দিতেন।
ড. এ এম এম শওকত আলী ছিলেন বাংলাদেশ সিভিল সার্ভিসের এক মহিরুহ, এক আইকন, এক কিংবদন্তি সূর্যসন্তান। তাঁর কাছে অনেক শিখেছি। তাঁর প্রতি গভীর শ্রদ্ধা ও কৃতজ্ঞতা। ড. এ এম এম শওকত আলী রাজশাহী কলেজিয়েট স্কুল থেকে ম্যাট্রিকুলেশন, রাজশাহী কলেজ থেকে ইন্টারমিডিয়েট এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বিএ অনার্স এবং এম এ পাস করেন। তিনি অস্ট্রেলিয়ার তাসমানিয়া বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পল্লী উন্নয়নে পিএইচডি ডিগ্রি লাভ করেন। পল্লী উন্নয়ন, জেলা প্রশাসন ইত্যাদি বিষয়ে অনেক গ্রন্থ রচনা করেন।
কর্মজীবনে ছিলেন অত্যন্ত সফল। তিনি সিলেট এবং ঢাকার জেলা প্রশাসক, রাজশাহীর বিভাগীয় কমিশনার, কৃষি ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও কৃষি উন্নয়ন করপোরেশনের চেয়ারম্যান ছিলেন। তিনি ডাক ও তার মন্ত্রণালয়, শিল্প মন্ত্রণালয়, জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় এবং কৃষি মন্ত্রণালয়ের সচিব ছিলেন। ২০০৮ সালে স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ এবং খাদ্য ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা ছিলেন তিনি। ড. এ এম এম শওকত আলী গত ২৩ ফেব্রুয়ারি রবিবার সকালে ঢাকার ইউনাইটেড হাসপাতালে মৃত্যুবরণ করেন (ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন)। মৃত্যুকালে তাঁর বয়স হয়েছিল ৮২ বছর। তিনি ১৯৪৩ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি পিরোজপুর জেলায় জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতা এম হুসাইন আলী জেলা ও দায়রা জজ এবং পূর্ব পাকিস্তান সরকারের আইন সচিব ছিলেন। ড. এ এম এম শওকত আলীর পেশাদারির গুণাবলি আমাকে মুগ্ধ করেছিল। তিনি আমার একজন প্রিয় মানুষ। তিনি এখন দৈহিকভাবে এ পৃথিবীতে নেই। কিন্তু তাঁর অনেক বন্ধু-স্বজন, গুণমুগ্ধ এবং আমি ও আমার মতো অনেক স্নেহধন্য অনুজের হৃদয়ে আছেন এবং চিরকাল থাকবেন।
এ কে এম আবদুল আউয়াল মজুমদার