একটা সময় ছিল যখন ভাষাকে কেবল যোগাযোগের মাধ্যম বা একজন ব্যক্তির মনের ভাব প্রকাশের উপযুক্ত প্রক্রিয়া বলে গণ্য করা হতো। পরবর্তী সময়ে ভাষার ব্যবহার ও উপযোগিতা বহুমাত্রিক রূপ লাভ করে। তবে বিভিন্ন ধরনের ভাষার মধ্যে মাতৃভাষার আবেদন, উপযোগিতা ও শক্তিমত্তা অন্য সবকিছুকে ছাড়িয়ে যায়।
সাধারণভাবে জন্মের পর একটি শিশু যে ভাষা শুনতে পায় বা আয়ত্ত করে, সেটাই তার মাতৃভাষা। ব্যক্তি হিসেবে মানুষের চিন্তাভাবনা, আবেগ, বুদ্ধির বিকাশ ইত্যাদি অনেকাংশেই মাতৃভাষার ওপর নির্ভর করে। এই ভাষার ওপর ভিত্তি করেই তার যোগাযোগের সক্ষমতা, পারিপার্শ্বিক জগৎকে জানা ও বোঝার দক্ষতা গড়ে ওঠে। একটি জাতি বা অঞ্চলের সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের ধারক ও বাহকরূপে ভূমিকা রাখা মাতৃভাষার সবচেয়ে বড় অবদান। মাতৃভাষা চর্চার মাধ্যমে মানুষ পারিপার্শ্বিক ইতিহাস, ঐতিহ্য ও মূল্যবোধের সঙ্গে সরাসরি সম্পৃক্ত হয়। তাই মাতৃভাষাকে তুলনা করা হয় একটি সেতুর সঙ্গে, যা প্রজন্মের পর প্রজন্মকে ধারাবাহিকভাবে সংযুক্ত করে চলে। মাতৃভাষায় স্থানীয় জ্ঞানবিজ্ঞান ও লোককাহিনিসহ শিল্প-সংস্কৃতির নানা দিক এক প্রজন্ম থেকে অন্য প্রজন্মের কাছে বহমান রাখে। মাতৃভাষায় যোগাযোগের ক্ষেত্রে মানুষ মমত্ব অনুভব করে এবং নিজের সংস্কৃতিকে শক্তিশালী করার সুযোগ পায়। আর মাতৃভাষা থেকে বিচ্ছিন্ন হলেই ব্যক্তিগত ও জাতীয় পর্যায়ে সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য দুর্বল হয়ে পড়ে এবং ক্রমান্বয়ে ব্যক্তি বা জনপদ তার মূল সংস্কৃতি, মূল্যবোধ এবং ইতিহাস ও ঐতিহ্যের ধারাবাহিকতা থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে।
বিশ্বজুড়ে বিভিন্ন ভাষায় কথা বলা মানুষের ওপর গবেষণা করে দেখা যায় যে, যারা মাতৃভাষায় জ্ঞান চর্চা করে, তাদের চিন্তাশক্তি ও উদ্ভাবনী ক্ষমতা ক্রমান্বয়ে শক্তিশালী হতে থাকে। পরিচিত ভাষার কারণে শিক্ষার্থীরা যে কোনো বিষয় সহজে উপলব্ধি করে এবং সহজেই দ্রুত সমস্যার সমাধানের কৌশল উদ্ভাবন করতে পারে। মাতৃভাষায় আয়ত্ত করা বিষয়গুলো শিশুরা দীর্ঘদিন মনে রাখতে পারে। মাতৃভাষা আয়ত্ত ও চর্চার ক্ষেত্রে যে যতটা দক্ষ, বিদেশি ভাষা শিখার ক্ষেত্রেও সে ততটা স্বাচ্ছন্দ্য অনুভব করে।
মাতৃভাষা মানুষের আবেগ প্রকাশ ও সামাজিক বন্ধন বৃদ্ধিতে বিশেষ অবদান রাখে। মানুষ তার চিন্তাভাবনা ও অনুভূতিগুলো মাতৃভাষায় সহজে প্রকাশ করতে পারে। একই রকম ভাষায় কথা বলা মানুষের মাঝে পারস্পরিক বোঝাপড়া ও হীনম্মন্যতা ত্যাগ করে কাছে আসার প্রবণতা ব্যাপক হারে বৃদ্ধি করে। প্রযুক্তির কল্যাণে মানুষ জ্ঞানবিজ্ঞান চর্চার ক্ষেত্রে অনেক দূর এগিয়ে গেছে। কিন্তু প্রতিটি জাতি, উপজাতি বা আদিবাসী স্থানীয় তথা মাতৃভাষায় প্রকৃতি, সংস্কৃতি, চিকিৎসা ও ইতিহাস-সম্পর্কিত এমন কিছু শাব্দিক, অঙ্কনকৃত বা মৌখিকভাবে প্রচলিত তথ্যভান্ডার থাকে, যা মানবসভ্যতা বিকাশের অনন্য উপাদানরূপে বিবেচিত হয়। তাই মাতৃভাষা সংরক্ষণে আজ সারা বিশ্বে নতুন জাগরণ সৃষ্টি হয়েছে।
বাংলাদেশের সাম্প্রতিক বিপ্লবের সময় ও বিপ্লব-পরবর্তী সময়ে মাতৃভাষা তথা বাংলায় উচ্চারিত বিশেষ কিছু শব্দ, বাক্য ও স্লোগান যে কোনো মারণাস্ত্রের চেয়ে বেশি কার্যকর হয়ে ওঠে। এটাই মাতৃভাষার অন্তর্নিহিত শক্তি। স্বৈরাচার নামক একটি মাত্র শব্দই একজন ফ্যাসিবাদী শাসক ও লুটেরার মুখোশ উন্মোচন ও তার বিগত ১৬ বছরের সব অপকর্ম প্রকাশ্যে আনার জন্য যথেষ্ট ছিল। গুম নামক একটি শব্দ যেন আপনজন হঠাৎ নিরুদ্দেশ হয়ে যাওয়া শত শত পরিবারের বুকে জমে থাকা কষ্টের সব কথা বলে দিয়েছিল। ‘রাজাকারের বাচ্চা’ কেবল কথার কথা হয়ে থাকেনি, এক দাম্ভিক ও হৃদয়হীনা শাসকের প্রতিবিম্ব হয়ে উঠেছিল। সেই সঙ্গে যখন ‘তুমি কে আমি কে- রাজাকার রাজাকার, কে বলেছে কে বলেছে- স্বৈরাচার স্বৈরাচার’ রবে স্লোগান ওঠে, তখন রক্তে আগুন জ্বলেছিল লাখ লাখ বিপ্লবী তরুণ-তরুণীর। ঢাকার রাজপথে সীমান্তরক্ষী বা বর্ডার গার্ড রেজিমেন্টের সৈন্যদের দেখে তখন ওই তরুণ সমাজ নির্দ্বিধায় ও নির্ভয়ে সেøাগান তুলে ‘সীমান্তে ডিম পাড়ে-ঢাকায় এসে মানুষ মারে।’ একজন আত্মমর্যাদাসম্পন্ন সৈনিকের কাছে এমন সেøাগান শোনা বুলেটের আঘাত সহ্য করার মতোই কষ্টকর। এটাই মাতৃভাষার মূল শক্তি।
চব্বিশের বিপ্লবের আরেকটি অন্যতম দিক ছিল দেয়ালের ভাষা বা গ্রাফিতি। স্বৈরশাসকের চাপে বাক্স্বাধীনতা যখন রুদ্ধ হয়ে যায়, তখন গ্রাফিতি হয়ে ওঠে বিপ্লবী তরুণ সমাজের মনের দুঃখ, কষ্ট, হতাশা কিংবা ক্রোধ প্রকাশের একমাত্র ভাষা। দেয়ালের গায়ে মাতৃভাষা বাংলায় লেখা স্লোগান ‘চেয়েছিলাম অধিকার-হয়ে গেলাম রাজাকার’ বলে দিয়েছিল লাখো তরুণ-তরুণীর বুকের জমে থাকা কষ্টের কথা। কয়েকটি পানির বোতল হাতে এক তরুণের ছুটে চলার দৃশ্য এঁকে কিংবা ‘পানি লাগবে’ মর্মে দুটি শব্দ লিখেই সংশপ্তক বীর শহীদ মীর মুগ্ধের আত্মদানের মর্মস্পর্শী উপাখ্যানের পুরোটাই লেখা হয়ে যায়।
জ্ঞানবিজ্ঞানে মানুষ যতই এগিয়ে যাক, যান্ত্রিকতা যতই তাকে গ্রাস করুক, অপসংস্কৃতির আগ্রাসন যতই ঘটুক, মাতৃভাষার শক্তির কাছে তা অতি তুচ্ছ ও নগণ্য। আনন্দ, বেদনা, প্রেম কিংবা বিদ্রোহে মাতৃভাষার কাছেই মানুষকে বারবার ফিরে আসতে হয়। মাতৃ শব্দটি তো মায়েরই সমার্থক। মায়ের অবদান যেমন অমূল্য, তেমনি অমূল্য মাতৃভাষার অবদান।
♦ লেখক : গবেষক, বিশ্লেষক ও কলামিস্ট
ইমেইল : [email protected]