প্রিয়জন কাউকে হারানোর বেদনার সঙ্গে খুব কম জিনিসের তুলনা হয়। দুঃখের তীব্র অনুভূতি এড়ানোর কোনো উপায় না থাকলেও ক্ষতির সঙ্গে মানিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করি আমরা। শোক হলো গুরুত্বপূর্ণ কারও মৃত্যুর পরে যন্ত্রণাদায়ক অভিজ্ঞতা। যদিও এটি জীবনের একটি অনিবার্য অংশ- এমন কিছু যা কার্যত আমরা সবাই কোনো না কোনো সময়ে অতিক্রম করি। আমরা যাকে ভালোবাসি তাকে হারানো একটি সবচেয়ে বেদনাদায়ক অভিজ্ঞতা। রবীন্দ্রনাথ বলেছেন, ‘মানুষকে দুঃখ দিয়া ঈশ্বর মানুষকে সার্থক করিয়াছেন। তাহাকে নিজের পূর্ণশক্তি অনুভব করিবার অধিকারী করিয়াছেন।’ শোকের যত্ন হলো উপশমকারী যত্নের একটি মূল উপাদান। পঞ্চাশের দশকে বিশেষ করে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরে যুক্তরাষ্ট্র এবং যুক্তরাজ্যে ‘মৃত্যুসচেতনতা আন্দোলন’ নামে একটি আন্দোলন গড়ে ওঠে। সে সময় যুদ্ধের অমানবিকতা আর ভয়াবহতায়, মৃত্যু এবং মৃত ব্যক্তির সঙ্গে সম্পর্কিত বিষয়গুলো পারিবারিক মূল্যবোধ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছিল। এরই পরিপ্রেক্ষিতে এ আন্দোলনের সূচনা হয়। এ আন্দোলন মৃত্যুর বিষয়কে নানা দৃষ্টিকোণ থেকে বিশ্লেষণ করে। এর মধ্যে শারীরিক, নৈতিক, আধ্যাত্মিক, চিকিৎসা, সামাজিক এবং মানসিক দৃষ্টিভঙ্গিও ছিল। পরিবারগুলোর কাছে মৃত্যুপথযাত্রীকে দেখাশোনা করা বা তাদের প্রিয়জনের মৃত্যুতে উপস্থিত থাকার সুযোগ সীমিত হয়ে পড়েছিল। মৃত্যুসচেতনতা আন্দোলন প্রতিষ্ঠাতাদের মূল লক্ষ্য ছিল পরিবার এবং সম্প্রদায়ের মধ্যে মৃত্যুশিক্ষা উন্নত করা। পরবর্তীকালে এ আন্দোলনকে কেন্দ্র করে থানাটোলজি নামে একটি বিশেষায়িত কোর্স ও সেবা গড়ে ওঠে। যে কোনো মৃত্যু বা বিচ্ছেদকে আমরা মেনে নিতে চাই না। অবচেতন মন থেকেও মানতে পারি না। জীবনকে সরলভাবে সামনে এগিয়ে নেওয়ার জন্য সবকিছুকে স্বাভাবিকভাবে গ্রহণ করতে শেখা জরুরি। এটা ঠিক যে পরিবারের কেউ মৃত্যুবরণ করলে আমাদের স্বাভাবিক জীবন আয়োজনে বাধা আসে। গোছানো সংসার মুহূর্তেই এলোমেলো হয়ে যায়। সেই মানুষটির কথা বারবার মনে পড়ে। সেই মানুষের স্মৃতি নানাভাবে আলোড়িত করে আমাদের। এমতাবস্থায় যতটা সম্ভব আমাদের জীবনকে সামনে এগিয়ে নিতে হবে। আমরা অনেকেই শোককে মানিয়ে নিতে পারি না। অনেক সময় আতঙ্কগ্রস্ত হয়ে পড়ি। স্বজন হারানোর বেদনা আমাদের চারপাশের স্বাভাবিক জীবনকে ঘিরে ধরে। আমরা অবলম্বন খুঁজে পাই না। এ বিয়োগ পিতা-মাতা, সন্তান, স্ত্রী, একজন ঘনিষ্ঠ বন্ধু, অংশীদার বা অন্যান্য আত্মীয় হোক না কেন, এ রকম প্রিয়জনের মৃত্যু অপ্রতিরোধ্যভাবে শোকাচ্ছন্ন করে আমাদের। গভীর দুঃখ, শূন্যতা এবং হতাশা থেকে শুরু করে শক, অসাড়তা, অপরাধবোধ বা অনুশোচনা পর্যন্ত তীব্র এবং খুব কঠিন আবেগ অনুভব করি আমরা। প্রিয়জনের মৃত্যুর পরিস্থিতিতে রাগ হতে পারে নিজের ওপর, ডাক্তার, অন্যান্য প্রিয়জন বা সৃষ্টিকর্তার ওপর। এমনকি যে মানুষটি সত্যিই চলে গেছে, তা মেনে নেওয়া আমাদের পক্ষে কঠিন হতে পারে বা সেই শোক সামলে ওঠার জন্য আমাদের ক্রমাগত লড়াই করে যেতে হয়। শোক শুধু মানসিক প্রতিক্রিয়ার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়; প্রিয়জনের মৃত্যুতে শোকও শারীরিক প্রতিক্রিয়ার কারণ হতে পারে। যার মধ্যে রয়েছে ওজন এবং ক্ষুধা পরিবর্তন, ঘুমাতে অসুবিধা, ব্যথা এবং যন্ত্রণা। সেই সঙ্গে শরীরে সৃষ্টি হয় একটি দুর্বল প্রতিরোধব্যবস্থা, যা অসুস্থতা এবং অন্যান্য স্বাস্থ্য সমস্যাকে জটিল করে তোলে। দুঃখের মানসিক প্রভাব ছাড়াও যখন একজন জীবনসঙ্গী বা একান্ত কাউকে আমরা হারাই তখন আমাদের মৃত্যু-পরবর্তী আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন করতে আর্থিক সমস্যার মতো বিষয়গুলোর চাপ মোকাবিলা করতে হয়। সন্তানদের কাছে তাদের মায়ের মৃত্যু ব্যাখ্যা করতে হয় এবং একই সঙ্গে নিজের কষ্ট মোকাবিলা করার সময় তাদের সান্ত্বনা দেওয়ার একটি উপায় খুঁজে বের করতে হয়।
শোকসন্তপ্ত পরিবারকে সাহচর্য দেওয়ার প্রয়োজনীয়তা সবচেয়ে বেশি অনুভূত হয়েছিল করোনার সময়। ভয়াবহ এ মহামারিতে কোনো কোনো পরিবারে মৃত্যুর মিছিল বয়ে গেছে। ওই পরিবারে যারা জীবিত ছিলেন তাদের কাছে যাওয়া বা একটু সহানুভূতি দেওয়ার জন্য যাওয়াটাও ছিল ঝুঁকিপূর্ণ। তবু এর মধ্যে অনেকেই জীবনের ঝুঁকি নিয়েও শোকসন্তপ্ত পরিবারগুলোর পাশে দাঁড়িয়েছেন। এ কথা ঠিক যে আমাদের সমাজে কোনো শোকগ্রস্ত পরিবারের কাছে যাওয়া, সেই পরিবারের সদস্যদের সান্ত্বনা দেওয়া ঐতিহ্যেরই অংশ। এখনো অনেক পরিবারে কেউ মারা গেলে আশপাশের অনেক পরিবার থেকে অন্তত তিন-চার দিন খাবার দেওয়া হয়। নানাভাবে শোকসন্তপ্ত পরিবারকে সাহচর্য দেওয়া হয়। এ পরিস্থিতির অবনতি ঘটে ভয়াবহ মহামারি করোনোর সময়। সংগত কারণেই জীবনের ঝুঁকি নিয়ে কেউ কারও বাড়িতে যেতে চাইত না। পরিশেষে বলা যায়, যখন ব্যথা এবং শোকের অনুভূতি কিছুটা কমে আসে তখন আপনি অনুভব করতে পারেন যে একটি শান্ত এবং স্বাচ্ছন্দ্যপূর্ণ অবস্থায় আছেন। এ পর্যায়ে আপনি অনুভব করবেন যে আপনার জীবনকে আবার একত্র করা এবং সামনে এগিয়ে যাওয়া সম্ভব। এর মানে এই নয় যে আপনি এখনো দুঃখের মুহূর্তগুলো আর অনুভব করবেন না বা প্রিয়জনকে ভুলে যাবেন। এগুলোকে ধারণ করেই আপনি অনুভব করবেন আপনি এখন এক পা সামনে রেখে এগিয়ে যেতে পারেন এবং ভবিষ্যতের দিকে তাকাতে পারেন।
লেখক : গবেষক