মব-কর্তৃত্ব গণতন্ত্রের মূল ভিত্তি- আইন, স্বাধীনতা এবং ন্যায়বিচারের ওপর আঘাত হানে, যা গণতান্ত্রিক সংস্কৃতির অবক্ষয়ের কারণ হয়ে দাঁড়ায়। শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদ ও জনমতের মাধ্যমে সমস্যার সমাধান করার পরিবর্তে, মব-কর্তৃত্ব অস্থিরতা ও ভয়াবহ পরিস্থিতি সৃষ্টি করে। ফ্যাসিজম ঘরবাড়ি বা দালানে নয়, সিস্টেমে অবস্থান করে। স্বৈরাচার বা ফ্যাসিবাদকে আরেক স্বৈরাচারী বা ফ্যাসিবাদী কায়দায় মোকাবিলা কাম্য নয়। এ ধরনের ব্যবস্থার বিরুদ্ধে সর্বোচ্চ গণতান্ত্রিক পন্থায় লড়াই করতে হয়। এজন্য প্রয়োজন অন্তর্ভুক্তিমূলক গণতন্ত্র ও সংস্কৃতির, যা রাষ্ট্র ও সমাজের প্রতিটি স্তরে নির্মাণ করতে হবে।
মব (mob) শব্দটি লাতিন mobile vulgus থেকে এসেছে, যার মানে ‘চলন্ত জনতা’ বা ‘উত্তেজিত জনগণ’। ১৭ শতকের দিকে এর ব্যবহার শুরু হয়। এটি সাধারণত উত্তেজিত বা বিশৃঙ্খল জনসমাগম বোঝাতে ব্যবহৃত হয়, যখন তারা আইনি প্রক্রিয়া বা নিয়ম অগ্রাহ্য করে। মব কর্তৃত্ব বা জনরোষে মানুষ আইন ও সামাজিক কাঠামো উপেক্ষা করে নিজের হাতে ‘ন্যায়’ প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করে, যা গণতান্ত্রিক পদ্ধতির বিরোধী। সাধারণত এটি ক্ষোভ, অশান্তি বা অবিচারের প্রতিক্রিয়া হিসেবে ঘটে। কখনো কখনো নির্দিষ্ট শ্রেণি বা গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে সহিংসতা সৃষ্টি হয়।
মব জাস্টিস হলো এমন একটি পরিস্থিতি, যেখানে উত্তেজিত জনতা আইন নিজের হাতে তুলে নিয়ে অপরাধীকে শাস্তি দেয়, যা আইনানুগ বিচারপ্রক্রিয়ার পরিবর্তে ঘটে। এটি সাধারণত আইনের প্রতি অবিশ্বাস এবং দ্রুত প্রতিক্রিয়ার চাহিদার কারণে ঘটে। এর ফলে বেশির ভাগ সময়ই নিরীহ মানুষ এর শিকার হয়, যা ন্যায়বিচারের পরিপন্থি এবং সমাজে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করে। মব জাস্টিস গণতন্ত্রের অবক্ষয়ের একটি উদাহরণ, যেখানে প্রতিক্রিয়াশীল নাগরিক প্রক্রিয়া কার্যকরী হয়ে ওঠে। মবোক্র্যাসি এমন একটি পরিস্থিতি, যেখানে গণতান্ত্রিক পদ্ধতি বা আইন দুর্বল হয়ে যায় এবং জনতার উত্তেজনা বা ক্ষোভের ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়, যা আইনি প্রক্রিয়া ও ন্যায়বিচারের প্রতি শ্রদ্ধা ক্ষতিগ্রস্ত করে এবং সমাজে অরাজক পরিস্থিতি তৈরি করে, ফলে জনগণ সঠিক বিচার পাওয়ার সুযোগ থেকে বঞ্চিত হয়।
প্রাচীন গ্রিস ও রোমে আনুষ্ঠানিক বিচারব্যবস্থা থাকলেও ‘মব বিচার’ প্রচলিত ছিল। এথেন্সে ‘অস্ট্রাকিজম’-এর মাধ্যমে গণতন্ত্রের জন্য হুমকি মনে করা ব্যক্তিদের নির্বাসিত করা হতো এবং রোমে স্বৈরাচারী শাসকদের উৎখাত বা হত্যা করা হতো। মধ্যযুগে বিচারব্যবস্থা ছিল সামন্ত প্রভুদের নিয়ন্ত্রণে। তবে সাধারণ মানুষ সন্দেহভাজন অপরাধীদের শাস্তি দিত, বিশেষ করে ডাইনিদের হত্যা করা ছিল সাধারণ ঘটনা। পরবর্তী সময়ে কেন্দ্রীভূত শাসন প্রতিষ্ঠিত হলেও জনসমক্ষে মৃত্যুদণ্ড ও ধর্মীয় সহিংসতা মব বিচারের রূপে টিকে ছিল।
১৮ শতকের ফরাসি বিপ্লবে ‘জনগণের আদালত’ ও গিলোটিন ব্যবহারের মাধ্যমে বিপ্লবের শত্রুদের শাস্তি দেওয়া হতো। রুশবিপ্লবেও মব বিচার ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি পায়। যুক্তরাষ্ট্রে আইন প্রয়োগে দুর্বল থাকায় ‘ভিজিলেন্স কমিটি’ গঠিত হয়, যারা বিচার ছাড়াই শাস্তি দিত। গৃহযুদ্ধ-পরবর্তী দক্ষিণে শ্বেতাঙ্গ আধিপত্যবাদীদের ‘লিঞ্চিং’ ব্যাপক আকার ধারণ করে। ২০ শতকে ফ্যাসিবাদের উত্থানের সঙ্গে মব বিচারও বৃদ্ধি পায়। নাৎসি জার্মানির ‘ক্রিস্টালনাখট’ ছিল রাষ্ট্র-সমর্থিত সহিংসতার একটি নজির; যেখানে ইহুদিদের ওপর হামলা চালানো হয়। আধুনিক বিশ্বেও আরব বসন্ত, ক্যাপিটল হিল হামলা বা জার্মানিতে রাজনীতিকদের বিরুদ্ধে জনরোষ সহিংস রূপ নেয়।
বাংলাদেশেও বিভিন্ন সময় ‘মব বিচার’ স্বাধীনতা আন্দোলন, নব্বইয়ের স্বৈরাচার পতন থেকে সাম্প্রতিক সময় পর্যন্ত বিভিন্ন রাজনৈতিক, সামাজিক ও ধর্মীয় ইস্যুতে মব সহিংসতা লক্ষণীয়। ২০১৩ সালে শাহবাগ আন্দোলন, ২০১৮ সালের নিরাপদ সড়ক আন্দোলন, ২০২০ সালের ধর্মীয় উত্তেজনা, ২০২১ সালে ভাস্কর্য বিতর্ক ও গণপরিবহন খাতে অনিয়মের প্রতিবাদ মব বিচারের রূপ নেয়। ৫ আগস্ট ২০২৪-এর ছাত্র-জনতার গণ অভ্যুত্থানের পর ছয় মাস ধরে বিভিন্ন স্থানে মব ও বিক্ষোভ দেখা যায়। যা পরবর্তী সময়ে প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে।
৫ ফেব্রুয়ারি ২০২৫, রাতে ভারতে অবস্থানরত শেখ হাসিনার সোশ্যাল মিডিয়ায় বক্তব্য বা বিবৃতির প্রতিবাদে ধানমন্ডি ৩২ নম্বরে বাড়ি ভেঙে ফেলা হলো। ঢাকা, খুলনা, বরিশাল, ভোলা, নোয়াখালী, কুমিল্লা, নাটোর ও পিরোজপুরসহ বিভিন্ন শহরে আওয়ামী লীগ নেতা-কর্মীদের বাড়িতে হামলা ও ভাঙচুরের ঘটনা ঘটেছে। এ প্রসঙ্গে অধ্যাপক আনু মুহাম্মদ বলেছেন, ‘বাড়ি, চিহ্ন, প্রতীক ভেঙে রাগ দেখানো যায়, কিন্তু ফ্যাসিবাদ যায় না, বরং ফ্যাসিবাদের পুনরুৎপাদন হয়।’
বাম জোটের নেতারা বলেছেন, ২০২৪ সালের গণ অভ্যুত্থানের মাধ্যমে মানুষের মধ্যে গড়া গণতান্ত্রিক ও বৈষম্যমুক্ত সমাজের আকাক্সক্ষা সামনে রেখে সুষ্ঠু নির্বাচন প্রক্রিয়ায় অগ্রসর হওয়ার প্রচেষ্টা চলছে। তবে কিছু উসকানিমূলক কর্মকাণ্ড পরিস্থিতি জটিল করছে। শেখ হাসিনা ও আওয়ামী লীগ বিদেশে বসে উসকানিমূলক কর্মকাণ্ড চালাচ্ছে, যা জনগণকে ক্ষুব্ধ করছে। ধানমন্ডি ৩২ নম্বর বাড়িতে ভাঙচুর ও বুলডোজার ব্যবহার সরকারের নিষ্ক্রিয়তা প্রদর্শন করছে। যদি সরকার নীরব থাকে তাহলে গণ অভ্যুত্থানের চেতনা প্রশ্নবিদ্ধ করা হতে পারে। তারা সব গণতান্ত্রিক দল ও সচেতন মহলকে অপতৎপরতার বিরুদ্ধে সজাগ থাকার আহ্বান জানান এবং ফ্যাসিবাদী কর্মকাণ্ডের বিরুদ্ধে রাজনৈতিকভাবে মোকাবিলা করার আহ্বান জানান।
ড. ইউনূসের নেতৃত্বে অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর ১৯ সেপ্টেম্বর ২০২৪ ঢাকার ফজলুল হক মুসলিম হলে ছাত্রদের হাতে এক ব্যক্তিকে পিটিয়ে হত্যার ঘটনা মব জাস্টিসের ভয়াবহ উদাহরণ হয়ে দাঁড়ায়। তখনো জনগণ বলেছিল, এ ধরনের ঘটনা থামাতে হবে। কিন্তু সরকার তা থামাতে পারেনি; তবে চেষ্টা দেখা গেছে। এর ফলে শিক্ষকরা পদত্যাগে বাধ্য হয়েছেন, ধর্মীয় স্থাপনা ও মাজারে হামলা, হত্যা ও ধর্ষণের ঘটনা বেড়েছে। গণপিটুনি, ব্যক্তিকে ছিনিয়ে মেরে ফেলা ও পদত্যাগে বাধ্য করা- এগুলো সবই অন্যায় বা মব জাস্টিসেরই উদাহরণ।
ড. ইউনূস বলেছিলেন, শান্তি প্রতিষ্ঠার জন্য যে কোনো সহিংসতা ও বৈষম্যকে অগ্রহণযোগ্য। তথ্য উপদেষ্টা নাহিদ ইসলাম মন্তব্য করেছিলেন, নির্যাতনকারী ও সন্ত্রাসীদের বিরুদ্ধে দ্রুত ব্যবস্থা না নিলে উত্তেজিত মব নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন হবে। শিক্ষার্থীদেরও দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করতে হবে, কারণ মব জাস্টিস কখনো সমাধান আনবে না। আইন উপদেষ্টা আসিফ নজরুল বলেছিলেন, ঢাবি ও জাবিতে যে মব জাস্টিসের ঘটনা ঘটেছে, সে ঘটনায় সরকার মর্মাহত। এ ধরনের বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড বন্ধে কঠোর পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে এবং মব জাস্টিস দমনে কঠোর অবস্থানে থাকবে অন্তর্বর্তী সরকার।
সে কথা কতটুকু রেখেছে সরকার! মবের কর্তৃত্ব রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক এবং সামাজিক শক্তির মাধ্যমে তৈরি হয়, যার মাধ্যমে জনতাকে তাদের স্বার্থে ব্যবহার করা হয়। রাষ্ট্র, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী, ধর্মীয় গোষ্ঠী, ব্যবসায়ী এবং গণমাধ্যম এ কর্তৃত্ব তৈরিতে সাহায্য করে। সোশ্যাল মিডিয়া ও প্রচারণার মাধ্যমে মব দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে এবং রাজনৈতিক, সামাজিক ও অর্থনৈতিক আন্দোলনে প্রভাব ফেলে। মব সংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে আসা অত্যন্ত জরুরি। মব জাস্টিসের বিরুদ্ধে সচেতনতা বৃদ্ধি এবং সমালোচনামূলক চিন্তা উৎসাহিত করা প্রয়োজন। শিক্ষাব্যবস্থায় বিশ্লেষণধর্মী চিন্তা ও গুজব সম্পর্কে সতর্কতা শেখানো উচিত। ডিজিটাল লিটারেসি ও সোশ্যাল মিডিয়ায় ভুয়া তথ্য শনাক্ত করার প্রশিক্ষণও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
আইনের কঠোর প্রয়োগ, সুশাসন এবং গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানের প্রতি জনগণের আস্থা পুনরুদ্ধার করতে হবে। পুলিশ বাহিনীকে শক্তিশালী ও দক্ষ করে অপরাধীদের দ্রুত আটকানোর ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে। পাশাপাশি গুজব প্রতিরোধে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে। পাশাপাশি সামাজিক মাধ্যমে নজরদারি বাড়ানো উচিত। জনসাধারণের মধ্যে আইনি সচেতনতা বৃদ্ধি এবং নৈতিক শিক্ষার প্রচার অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, যাতে মানুষ বুঝতে পারে যে আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়া অনৈতিক। সরকারের উচিত, মব জাস্টিসের বিরুদ্ধে শক্ত পদক্ষেপ নেওয়া।
দেশের চলমান পরিস্থিতিতে বিএনপি এক বিবৃতিতে বলেছে, অন্তর্বর্তী সরকার পলাতক ফ্যাসিস্ট এবং তাদের দোসরদের আইনের আওতায় আনতে এখনো যথেষ্ট সাফল্য দেখাতে পারেনি। ফলে অনেকেই বেআইনি কর্মকাণ্ডে উৎসাহিত হচ্ছে। সরকারের কাছে জনগণের প্রত্যাশা আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা, কিন্তু ‘মব কালচার’ ও প্রশাসনিক অব্যবস্থাপনা বেড়ে গেছে। সরকারের দায়িত্ব ছাত্র-জনতার গণ অভ্যুত্থানের শহীদদের সহায়তা, পলাতক নেতাদের দ্রুত বিচার এবং গণতন্ত্র ও মানবাধিকার নিশ্চিত করা। ফ্যাসিবাদী আদর্শের বিরুদ্ধে রাজনৈতিক ঐক্য গড়ে তোলা প্রয়োজন এবং দ্রুত নির্বাচনের আয়োজন করা সরকারের প্রধান দায়িত্ব।
লেখক : সাংবাদিক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক