শাবান মাস। আরবি বর্ষপঞ্জিকার অষ্টম মাস। পবিত্র রমজানুল মুবারকের পূর্ববর্তী এই মাসটি বিভিন্ন কারণেই মহিমান্বিত। শাবান মাস রমজানুল মুবারকের প্রস্তুতি নেওয়ার মাস। এই মাসে যারা যথার্থভাবে রমজানের প্রস্তুতি গ্রহণ করবে তাদের জন্য রমজানের বরকত ও কল্যাণ পুরোপুরিভাবে অর্জন করা সহজ হয়ে যায়। বক্ষমান নিবন্ধে আমরা শাবান মাসে রমজানের প্রস্তুতিমূলক পাঁচটি আমলের বিষয়ে আলোকপাত করব ইনশাল্লাহ।
১. দিন গণনা : রসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, তোমরা রমজানের (প্রস্তুতির উদ্দেশ্যে) শাবানের দিনগুলো গণনা করতে থাকো। (মুসান্নেফে আবদুর রাজ্জাক, হাদিস : ৭৩০৩, সুনানে তিরমিজি, হাদিস : ৬৭৮, আল-মুজামুল আওসাত, হাদিস : ৮২৪২)।
২. অধিক পরিমাণে রোজা রাখা : শাবান মাসের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ আমল হচ্ছে। এ মাসে অধিক পরিমাণে রোজা রাখা। এতে করে রমজানের রোজার প্রাথমিক অনুশীলন চমৎকারভাবেই সম্পন্ন হয়ে যাবে। রসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এ মাসে অধিক পরিমাণে রোজা রাখতেন।
হজরত আয়েশা (রা.) বর্ণনা করেন, তিনি বলেন, আমি রসুল (সা.)-কে রমজান মাস ছাড়া অন্য কোনো মাসে পুরো মাস রোজা রাখতে দেখিনি এবং আমি তাঁকে শাবান মাসের মতো এত অধিক নফল রোজা অন্য কোনো মাসে রাখতে দেখিনি। (সহিহ আল-বোখারি, হাদিস : ১৯৬৯, সহিহ মুসলিম, হাদিস : ১১৫৬, সুনানে আবু দাউদ, হাদিস : ২৪৩৪, সুনানে তিরমিজি, হাদিস : ৭৩৬)।
শাবান মাসে বান্দার আমল আল্লাহর কাছে উত্থিত হয়। হজরত উসামা বিন যায়েদ (রা.) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, একবার আমি রসুলুল্লাহ (সা.)-কে জিজ্ঞেস করলাম, ইয়া রসুলুল্লাহ! আপনাকে শাবান মাসে যে পরিমাণ রোজা রাখতে দেখি, অন্য কোনো মাসে সে পরিমাণ দেখি না। রসুলুল্লাহ (সা.) বললেন : এ মাস হলো রজব ও রমজানের মধ্যবর্তী মাস। লোকেরা যার সম্পর্কে গাফেল। এটি এমন মাস, যে মাসে বান্দাদের আমলসমূহ আল্লাহ পাকের দরবারে উত্থিত হয়। আর আমি চাই, রোজাদার অবস্থায় যেন আমার আমল পেশ করা হয়। (সুনানে নাসাঈ-২৩৫৭)।
৩. প্রচুর পরিমাণে কোরআন তিলাওয়াত করা। শাবান মাসে প্রচুর পরিমাণে কোরআন তিলাওয়াত করা উচিত। এতে করে অন্তরে ইমানি শক্তি বৃদ্ধি পাবে। আর ইমানি শক্তি বৃদ্ধি পেলে আমল করা সহজ হবে। পবিত্র কোরআন মাজিদে ইরশাদ হয়েছে-
‘যারা ইমানদার, তারা এমন যে যখন আল্লাহর নাম নেওয়া হয় তখন ভীত হয়ে পড়ে তাদের অন্তর। আর যখন তাদের সামনে পাঠ করা হয় কালাম, তখন তাদের ইমান বেড়ে যায় এবং তারা স্বীয় পরওয়ার দিগারের প্রতি ভরসা পোষণ করে’ (সুরাতুল আনফাল-২)।
৪. নফল ইবাদতে আত্মনিয়োগ করা। শাবান মাসে অধিক পরিমাণে নফল ইবাদতে আত্মনিয়োগ করা উচিত। তাহাজ্জুদ, ইশরাক নামাজসহ যাবতীয় নফল ইবাদতে মনোযোগী হওয়া শাবান মাসের একটি অন্যতম দাবি। এতে আল্লাহর সঙ্গে বান্দার সম্পর্ক গভীর হয়।
হজরত আবু হুরাইরা (রা.)-এর সূত্রে বর্ণিত, নবী করিম (সা.) বলেন, মহান আল্লাহ বলেছেন, যে ব্যক্তি আমার কোনো বন্ধুর সঙ্গে দুশমনি করবে আমি তার বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করব। বান্দা যেসব আমলের মাধ্যমে আমার নৈকট্য লাভ করে, তার মধ্যে অন্যতম হচ্ছে আমার ফরজ বিধিবিধান। বান্দা নফল ইবাদতের মাধ্যমে আমার নৈকট্য লাভ করতে থাকে। এমনকি এক পর্যায়ে আমি তাকে ভালোবেসে ফেলি। যখন তার সঙ্গে ভালোবাসার সম্পর্ক তৈরি হয়ে যায়, আমি তার কান হয়ে যাই, যা দিয়ে সে শুনে। চোখ হয়ে যাই, যা দিয়ে সে দেখে। হাত হয়ে যাই, যা দিয়ে সে ধরে। পা হয়ে যাই, যা দিয়ে সে চলে। সে আমার কাছে আশ্রয় প্রার্থনা করলে অবশ্যই আমি তাকে আশ্রয় দিই (মুজামুল কাবির লিততবরানি, হাদিস নম্বর : ৭৮৩৩)।
৫. অধিক পরিমাণে দান-সদকা করা। শাবান মাসে অধিক পরিমাণে দান-সদকা করা উচিত। এতে সমাজের গরিব অসহায় মানুষ অর্থনৈতিকভাবে কিছুটা হলেও স্বাবলম্বী হবে। ফলে রমজানে তাদের অর্থকষ্ট খানিকটা হলেও লাঘব হবে।
দান-সদকা আল্লাহর কাছে অনেক পছন্দনীয় একটি আমল। ইরশাদ হয়েছে, ‘যারা স্বীয় ধনসম্পদ ব্যয় করে, রাত ও দিনে, গোপনে ও প্রকাশ্যে। তাদের জন্য তাদের সওয়াব রয়েছে তাদের পালনকর্তার কাছে। তাদের কোনো আশঙ্কা নেই এবং তারা চিন্তিতও হবে না (সুরাতুল বাকারা-২৭৪)। তাই আসুন, শাবান মাসে উপরিউক্ত আমলগুলো সম্পাদন করে পবিত্র রমজানুল মুবারকের প্রস্তুতি গ্রহণ করি। আল্লাহ আমাদের সবাইকে আমলের আলোয় জীবনকে আলোকিত করার তৌফিক দান করুন।
♦ লেখক : মুহাদ্দিস, জামিয়া গাফুরিয়া মাখজানুল উলুম টঙ্গী গাজীপুর। খতিব, আউচপাড়া জামে মসজিদ টঙ্গী, গাজীপুর