আগা খান সম্পর্কে জানার সুযোগ হয় ষষ্ঠ শ্রেণিতে পড়ার সময়। আমাদের দুজন সহপাঠী ছিল ইসমাইলীয়। দক্ষিণ এশিয়া উপমহাদেশে যারা খোজা নামে পরিচিত। সহপাঠী দুই বন্ধুর কাছেই শুনি আগা খান তাদের আধ্যাত্মিক নেতা। ইসমাইলীয়রা শিয়া মুসলমানদের একটি ভিন্ন মতাবলম্বী শাখা। ইসলামের ইতিহাসে এই ধর্মীয় গোষ্ঠীর উৎপত্তি একটি বিতর্কিত বিষয়। খ্যাতনামা ইতিহাসবিদ অধ্যাপক কে আলীর ‘ইসলামের ইতিহাস’-এ বলা হয়েছে, শিয়াদের ষষ্ঠ ইমাম জাফর সাদিক জ্যেষ্ঠ পুত্র ইসমাইলকে ইমাম মনোনীত করেন। কিন্তু তাঁর অসদাচরণের কারণে দ্বিতীয় পুত্র মুসা আল কাজিমকে উত্তরাধিকার ঘোষণা করা হয়। শিয়াদের সংখ্যাগরিষ্ঠ অংশ এ পরিবর্তন মেনে নিলেও একটি দল ইসমাইলের অনুগত থাকে। তাদের বাতেনিও বলা হয়। কারণ তাদের মতে, ইসমাইল মদ্যপায়ী হলেও তাঁর আত্মিক সৌন্দর্য তাতে কোনোভাবে নষ্ট হয়নি। ইসমাইলের এই গোপন আধ্যাত্মিক শক্তিকে বাতেন বলা হয়।
ইসমাইলীয়রা পরে বিভিন্ন উপদলে বিভক্ত হয়ে পড়ে। এদের একটি অংশের নাম ছিল কারামতি। হাসান কারামত যে গোষ্ঠীর প্রতিষ্ঠাতা। আব্বাসীয় আমলে দলটি খুব শক্তিশালী হয়ে ওঠে। কারামতি নেতা আবু সাঈদ আল জানাবি বাহরাইন ও ধারেকাছের অনেক এলাকায় তাঁদের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করেন। তাঁর পুত্র আবু তাহের আল জানাবি মক্কায় অভিযান চালিয়ে পবিত্র হাজরে আসওয়াদ বা কালো পাথর লুট করে নিয়ে যান। হাজার হাজার হজযাত্রীকে হত্যা করেন এই পাষণ্ড। জমজম কূপে হাজিদের লাশ ফেলা হয়। ইসলামের ইতিহাসে যা একটি ট্র্যাজেডি হিসেবে বিবেচিত। বেশ কয়েক বছর পর আব্বাসীয় খলিফা বিপুল মুক্তিপণের বিনিময়ে হাজরে আসওয়াদ ফেরত আনেন।
একসময় ইসমাইলীয়দের একাংশ উগ্রপন্থি হিসেবে শিয়া এবং সুন্নি দুই সম্প্রদায়ের কাছেই ছিল সমালোচিত। তাদের একটি শাখা নিজারি ইসমাইলিয়া নামে পরিচিত। অতীত যাই হোক, দেড় শ বছরেরও বেশি সময় তারা একটি শান্তিবাদী ধর্মীয় গোষ্ঠী হিসেবে দুনিয়াজুড়ে পরিচিত এবং প্রশংসিত। পাকিস্তান আমলে স্কুল পর্যায়ের সাধারণ জ্ঞানের পাঠ্যপুস্তকে পড়ানো হতো পৃথিবীর সবচেয়ে ধনী ব্যক্তির নাম আগা খান। যিনি পাকিস্তানের নাগরিক। আগা খান কিন্তু কোনো ব্যক্তির নাম নয়। এটি একটি উপাধি। ইসমাইলীয় মুসলিম সম্প্রদায়ের নিজারি শাখার আধ্যাত্মিক নেতা প্রিন্স করিম আল হুসেইনী বা চতুর্থ আগা খান ৪ ফেব্রুয়ারি মারা গেছেন পর্তুগালের রাজধানী লিসবনে। পৃথিবীর প্রায় দেড় কোটি ইসমাইলীয় সম্প্রদায়ের নতুন আধ্যাত্মিক নেতা হিসেবে অধিষ্ঠিত হয়েছেন প্রিন্স রহিম আল হুসেইনী। তিনি প্রিন্স করিম আল হুসেইনীর বড় ছেলে। প্রিন্স রহিম পঞ্চম আগা খান হিসেবে অভিহিত হবেন।
প্রিন্স রহিম আগা খান যুক্তরাষ্ট্রের ব্রাউন ইউনিভার্সিটিতে তুলনামূলক সাহিত্য নিয়ে পড়াশোনা করেছেন। এবং দায়িত্ব পালন করেছেন আগা খান ডেভেলপমেন্ট নেটওয়ার্কের বিভিন্ন সংস্থার পরিচালনা পর্ষদে।
এ সংস্থা স্বাস্থ্যসেবা, আবাসন, শিক্ষা এবং গ্রামীণ অর্থনৈতিক উন্নয়নে কাজ করে। ৩০টিরও বেশি দেশে তাদের কার্যক্রম পরিচালিত হয়। সংস্থাটির বার্ষিক বাজেট প্রায় ১ বিলিয়ন ডলার। অলাভজনক উন্নয়নমূলক কর্মকাণ্ডে এ অর্থ ব্যয় হয়। প্রিন্স রহিম জলবায়ু পরিবর্তন ও পরিবেশ সংরক্ষণের বিষয়েও বিশেষভাবে আগ্রহী।
আগা খানদের পূর্বপুরুষদের বসতি পারস্য বা ইরানে। ১৮১৮ সালে পারস্যের কাজার রাজ্যের শাসক ফাতেহ আলি শাহ নিজারি ইসমাইলীয়দের ৪৬তম ইমাম হাসান আলি শাহকে সম্মানসূচক আগা খান উপাধিতে ভূষিত করেন। কারমানের গভর্নর হিসেবে নিয়োগ পান তিনি। এর দুই দশকের মধ্যে রাজপরিবারের সঙ্গে আগা খানের সম্পর্কের অবনতি ঘটে। ১৮৩৮ সালে কাজার রাজবংশকে উৎখাতের এক ব্যর্থ প্রচেষ্টায় নেতৃত্ব দেন তিনি। প্রাণ বাঁচাতে দলবলসহ ভারতে পালিয়ে আসেন আগা খান। ভারতের ব্রিটিশ শাসকদের সঙ্গে সুসম্পর্ক গড়ে তোলেন তিনি। এই উপমহাদেশের ব্যবসাবাণিজ্যে আগে থেকেই ইসমাইলীয় বা খোজা সম্প্রদায়ের অংশগ্রহণ ছিল। ১৮৮১ সালের এপ্রিলে প্রথম আগা খান ভারতের মুম্বাইয়ে মৃত্যুবরণ করেন। মৃত্যুর আগে তিনি জ্যেষ্ঠ পুত্র আকা আলি শাহকে উত্তরসূরি মনোনয়ন করেন। দ্বিতীয় আগা খান মাত্র চার বছর খোজা সম্প্রদায়ের ইমাম হিসেবে দায়িত্ব পালনের সুযোগ পান। ১৮৮৫ সালের ১৭ আগস্ট তিনি মৃত্যুবরণ করেন। মৃত্যুর পর দ্বিতীয় আগা খানকে ইরাকের কুফায় হজরত আলি (রা.)-এর মাজার প্রাঙ্গণে দাফন করা হয়। দ্বিতীয় আগা খান ইসমাইলি সম্প্রদায়ের পাশাপাশি ভারতবর্ষের অন্য মুসলমানদের কাছেও জনপ্রিয় ছিলেন। তাঁর মৃত্যুতে গভীর শোকে ভেঙে পড়েন তাঁর অনুসারীরা।
দ্বিতীয় আগা খানের মৃত্যুর পর ইসমাইলীয় সম্প্রদায়ের ইমাম বা তৃতীয় আগা খান হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন সুলতান মোহাম্মদ শাহ। তখন তাঁর বয়স মাত্র সাত বছর। তৃতীয় আগা খানের জন্ম ১৮৭৭ সালের ২ নভেম্বর সিন্ধুর করাচি নগরীতে। মাত্র সাত বছর বয়সে তিনি বাবাকে হারান। ওই বয়সেই তাঁর হাতে একটি ধর্মীয় সম্প্রদায়ের আধ্যাত্মিক নেতার দায়িত্ব অর্পিত হয়। তাঁর মা নবাব আলিয়া শামসুল মুলক তাঁর একমাত্র পুত্রকে সুশিক্ষিত ও সুযোগ্য করে গড়ে তোলেন। তৃতীয় আগা খানের মা ছিলেন পারস্যের কাজার রাজ্যের শাহ ফতেহ আলি শাহের নাতনি। তৃতীয় আগা খান ছিলেন আধুনিকমনা এবং ক্যারিশমাটিক ব্যক্তিত্ব। তিনি শুধু ইসমাইলীয় সম্প্রদায় নয়, ভারতবর্ষের মুসলমানদের শীর্ষ নেতা হিসেবেও আবির্ভূত হন। ভারতীয় মুসলমানদের প্রথম রাজনৈতিক সংগঠন মুসলিম লীগ প্রতিষ্ঠিত হয় ঢাকায়- ঢাকার নবাব সলিমুল্লাহর সভাপতিত্বে। সর্বভারতীয় মুসলিম লীগের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি ছিলেন তৃতীয় আগা খান সুলতান স্যার মোহাম্মদ শাহ। ভারতবর্ষের সাংবিধানিক সংস্কারের ওপর ইংরেজদের সঙ্গে গোলটেবিল বৈঠকে তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। আন্তর্জাতিকভাবেও তৃতীয় আগা খান ছিলেন ব্যাপক সুনামের অধিকারী। ১৯৩৭ সালে তিনি লিগ অব নেশনস বা জাতিপুঞ্জের সভাপতি নিযুক্ত হন। স্মর্তব্য যে, জাতিসংঘের আগে লিগ অব নেশনস বা জাতিপুঞ্জ ছিল বিশ্বের সবচেয়ে প্রভাবশালী সংগঠন।
তৃতীয় আগা খান ইসমাইলীয় সম্প্রদায়ের সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতা বা ইমাম হিসেবে ইসলাম ধর্ম সম্পর্কে যেমন ছিলেন সুশিক্ষিত, তেমন ইংল্যান্ডের কেমব্রিজ ইউনিভার্সিটি থেকে উচ্চশিক্ষা গ্রহণ করেন। তিনি নারী-পুরুষনির্বিশেষে ইসমাইলীয় সম্প্রদায়ের সদস্যদের শিক্ষা গ্রহণের ওপর গুরুত্ব দেন। তৃতীয় আগা খানের নেতৃত্বগুণে তাঁর সম্প্রদায় শিক্ষাদীক্ষা ও ধনসম্পদে ভারতীয় মুসলমানদের মধ্যে ছিল এগিয়ে। আলিগড় মুসলিম বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠায়ও তিনি অগ্রণী ভূমিকা রেখেছেন। ৭৭ বছর ধরে তিনি ইসমাইলীয় সম্প্রদায়ের নেতৃত্ব দেন। ১৯৫৭ সালের ১১ জুলাই সুইজারল্যান্ডের ভার্সোইক্স শহরে তিনি মারা যান। মিসরের নীল নদের পশ্চিম তীরে আসওয়ানে তাকে দাফন করা হয়। মৃত্যুর তিন বছর আগে তিনি নিজের জন্য কবরের জায়গা ঠিক করে যান।
তৃতীয় আগা খান সুলতান স্যার মোহাম্মদ শাহ পুত্র আলি খানকে উত্তরাধিকার থেকে দূরে রাখার সিদ্ধান্ত নেন। আলি খান ছিলেন খোলামেলা জীবনধারায় বিশ্বাসী। যা একজন ধর্মীয় নেতার জন্য একেবারে বেমানান। বিশ্বখ্যাত মার্কিন অভিনেত্রী রিটা হেওয়ার্থকে বিয়ে করেন তৃতীয় আগা খানের পুত্র আলি খান। আমেরিকান ফিল্ম ইনস্টিটিউটের হিসাবে রিটা সর্বকালের ১০০ জন তারকার অন্যতম। লাইফ ম্যাগাজিনের প্রচ্ছদে পাঁচবার তিনি ঠাঁই পেয়েছেন নিজ যোগ্যতা বলে। হলিউডের অভিনেত্রী রিটা ছিলেন চতুর্থ আগা খান করিম আল হুসেইনীর সৎমা। বর্তমান আগা খান প্রিন্স রহিমের সৎদাদি।
তৃতীয় আগা খান তাঁর নিজের পুত্র আলি খানকে বাদ দিয়ে পৌত্র করিম আল-হুসেইনি শাহ (১৯৩৬-২০২৫)-কে উত্তরসূরি হিসেবে বেছে নেন। ২০ বছর বয়সি চতুর্থ আগা খান সে সময় হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র ছিলেন। প্রিন্স করিম আল-হুসেইনি আগা খান ১৯৫৭ সালের জুলাই মাসে ব্রিটিশ রানি এলিজাবেথের কাছ থেকে ‘হিজ হাইনেস’ উপাধি লাভ করেন। মাত্র দুই সপ্তাহ আগে তাঁর দাদা তৃতীয় আগা খান তাঁকে ইসমাইলি মুসলিম সম্প্রদায়ের পরবর্তী আধ্যাত্মিক নেতা হিসেবে ঘোষণার পর এটি ছিল তাঁর জন্য এক বিরাট সম্মান।
তৃতীয় আগা খান সুলতান স্যার সুলতান মোহাম্মদ শাহ ভারতবর্ষের শীর্ষ রাজনীতিকদের একজন বলে বিবেচিত হতেন। জাতিপুঞ্জের সভাপতি হিসেবে তিনি বিশ্ব সম্প্রদায়েরও নেতৃত্ব দিয়েছেন। তবে তাঁর পৌত্র চতুর্থ আগা খান রাজনৈতিক বিষয় থেকে দূরে থেকেছেন সচেতনভাবে। ইসমাইলি মুসলমানদের আধ্যাত্মিক নেতা, সমাজসেবক ও ইসলামি সংস্কৃতি এবং মূল্যবোধের সুরক্ষণে তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছেন। মুসলমানদের সঙ্গে পশ্চিমা বিশ্বের সেতুবন্ধন রচনায় তিনি রেখেছেন অনন্য ভূমিকা।
চতুর্থ আগা খান একসময় ছিলেন বিশ্বের সেরা ধনী। তিনি বিভিন্ন পারিবারিক ব্যবসায় জড়িত ছিলেন। তাঁর সম্প্রদায়ের সিংহভাগ লোকজনও ব্যবসায়ী হিসেবে সমাদৃত। তারপরও প্রশ্ন ওঠে ব্যবসার পরিসর খুব বড় না হলেও আগা খান বিশ্বের সেরা ধনীদের একজন বিবেচিত হন কীভাবে? এর কারণ ইসমাইলীয় মুসলমানরা তাদের আয়ের সাড়ে ১২ শতাংশ পর্যন্ত আগা খান ফান্ডে দান করেন। এটিকে তারা ধর্মীয় কর্তব্য বলে ভাবেন। দুনিয়াজুড়ে চিকিৎসা, শিক্ষা, সমাজসেবায় আগা খান যে বিপুল অর্থ ব্যয় করেন, তার উৎস অনুসারীদের দেওয়া অর্থ।
পাদটীকা : উপমহাদেশের স্বাধীনতা আন্দোলনের অন্যতম প্রাণপুরুষ পাকিস্তানের প্রতিষ্ঠাতা কায়েদে আজম মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ জন্মসূত্রে একজন ইসমাইলীয়। জিন্নাহর পূর্বপুরুষরা ছিলেন ভারতের গুজরাটের অধিবাসী। জাতিতে সনাতন ধর্মাবলম্বী। সাধারণভাবে যাদের হিন্দু বলা হয়। জিন্নাহর দাদা মাছ ব্যবসায়ে নামেন। ট্রলারে করে সমুদ্র থেকে ধরা হতো মাছ। এ ব্যবসায় তাঁরা বিপুল সম্পদের মালিক হন। কুলীন হিন্দুরা নিরামিষভোজী সম্প্রদায়ের কোনো সদস্য মাছ ব্যবসায় জড়িয়ে পড়বেন, এটি ভালো চোখে দেখেনি। তারা তাদের সমাজচ্যুত করে। জিন্নাহর বাপ-দাদা ইসমাইলীয় ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করেন। গুজরাট থেকে তাঁরা চলে আসেন করাচিতে। জিন্নাহ অবশ্য ব্যক্তিজীবনে ধর্মের ধার ধারতেন না। কংগ্রেস থেকে তিনি মুসলিম লীগে যোগ দেন মহাত্মা গান্ধীর ওপর বিরক্ত হয়ে। স্বনামধন্য এই আইনজীবীর নেতৃত্বে ভারত ভেঙে পাকিস্তান প্রতিষ্ঠিত হয় ১৯৪৭ সালে। মুসলমানদের অধিকার প্রতিষ্ঠায় তিনি পাকিস্তান আন্দোলনের নেতৃত্ব দিলেও জিন্নাহ কখনো গোঁড়ামিতে বিশ্বাস করতেন না।
লেখক : সিনিয়র সহকারী সম্পাদক, বাংলাদেশ প্রতিদিন
ইমেইল : [email protected]