কলেজে ভর্তি হওয়ার জন্য অপেক্ষা করছি। নটর ডেম কলেজে চান্স পেয়েছি। দুটো সমস্যা দেখা দিল। ভর্তির টাকা জোগাড় করা আর গেন্ডারিয়া থেকে আরামবাগে গিয়ে কলেজ করার খরচ। নটর ডেমে ভর্তি হওয়া হলো না। জগন্নাথেও ভর্তির ডেট চলে যাচ্ছে। অসহায়ের মতো ঘুরে বেড়াই। ভর্তির টাকা জোগাড় হয় না। অধ্যাপক মোমিন নামে এক ভদ্রলোকের সঙ্গে পরিচয় হয়েছে। কোনো এক মফস্বল কলেজে শিক্ষকতা করেছেন। পঁয়ত্রিশ-ছত্রিশ বছর বয়স। নিঃসন্তান। আমাকে খুব ভালোবাসেন। বাংলাবাজারে তাঁদের বইয়ের বিজনেস। পৈতৃক ব্যবসা। অন্য ভাইরাও মালিক। মোমিন সাহেব বড়। তাঁদের বইয়ের দোকানটির নাম ‘আজিজিয়া লাইব্রেরি’। দোকানের ভিতর একপাশে তাঁর ছোট্ট কেবিন। সেখানে বসে লেখালেখির কাজ করেন। সংস্কৃতিমনা মানুষ। একটা মাসিক পত্রিকা প্রকাশের উদ্যোগ নিয়েছেন। পত্রিকার নাম দিয়েছেন ‘শুভেচ্ছা’। ওই নিয়ে ব্যস্ত থাকেন। অনেক সময় আমাকে বাসা থেকে ডেকে বাংলাবাজারে নিয়ে যান। একদিন হাঁটতে হাঁটতে যাচ্ছি। বাহাদুর শাহ্ পার্কের সামনে এসে তীক্ষè চোখে আমার মুখের দিকে তাকালেন। ‘কী হয়েছে তোমার? এত মনমরা হয়ে আছ কেন?’ আমি কেঁদে ফেললাম। ‘সবাই কলেজে ভর্তি হয়ে গেছে। আমি ভর্তি হতে পারিনি। বাসা থেকে টাকা দিতে পারছে না।’ মোমিন ভাই আমার কাঁধে হাত দিলেন। ‘হয়ে যাবে, চিন্তা করো না।’ পরদিন জগন্নাথ কলেজে নিয়ে তিনি আমাকে ভর্তি করে দিয়ে এলেন। পুরো টাকাটা নিজের পকেট থেকে দিলেন। এসব ভাবলে নিজেকে বড় ভাগ্যবান মনে হয়। কত মানুষের ভালোবাসা আমি পেয়েছি। নিঃস্বার্থভাবে কত মানুষ সেসব কষ্টের দিনে আমার পাশে দাঁড়িয়েছেন। তখনো নাসিমা ও ফাতেমাকে পড়াই। কামালদের তিন ভাইবোনকে পড়াই। যেটুকু টাকা পাই সংসারে দিয়ে দিতে হয়। আব্বার কর্মস্থল মিউনিসিপ্যালিটিতে যাই প্রায়ই। বড় ভাইয়ের টঙ্গীর চাকরিটা আছে। আব্বার যাঁরা ঊর্ধ্বতন ছিলেন তাঁরা চাইছেন মিউনিসিপ্যালিটিতে আমাকে একটা চাকরি দিতে। বয়স কমের কারণে চাকরি দিতে পারছেন না। বছরখানেকের মধ্যে অবশ্য আমার বড় ভাইয়ের চাকরি হয়ে গেল মিউনিসিপ্যালিটিতে। কেরানির চাকরি। টঙ্গীর চাকরি ছেড়ে তিনি যোগ দিলেন মিউনিসিপ্যালিটিতে। লক্ষ্মীবাজারে অফিস। তারও বছরখানেকের মধ্যে আমার নামে একটা ট্রেড লাইসেন্স করলেন। এক বন্ধুর মায়ের কাছ থেকে কিছু টাকা নিয়ে চাকরির ফাঁকে ফাঁকে কন্ট্রাক্টরির কাজ শুরু করলেন। কাজ দেখাশোনা করতে হতো আমাকে। ওই করে করে কয়েক বছরের মধ্যে সংসারের চেহারা বদলাতে শুরু করেছিল। সচ্ছলতার মুখ দেখতে শুরু করেছিলাম আমরা। কিন্তু তার আগের দিনগুলো অতি দুঃখ-দারিদ্র্যের মধ্যে কাটছিল। সেই অবস্থায় একটা খুব বড় আশ্রয়ের জায়গা হয়ে দাঁড়িয়েছিলেন ‘আম্মা’। আম্মা মানে আমার ছাত্র কামালের মা। কামালকে পড়াতে গেলেই আম্মা প্রথমে আমার মুখের দিকে তাকাতেন। বোঝার চেষ্টা করতেন সকালে নাশতা করা হয়েছে কি না আমার। সন্ধ্যার দিকে পড়াতে গেলে প্রথমে চা-বিস্কুট খাওয়াতেন। রাতে ভাত না খেয়ে ফিরতে দিতেন না। খালুজান চুপচাপ ধরনের মানুষ। ফুড ইন্সপেক্টরের চাকরি করেন। ওই চাকরিতে প্রচুর ঘুষ খাওয়ার অবকাশ। কিন্তু খালুজান হচ্ছেন চূড়ান্ত সৎ একজন মানুষ। অসৎ পয়সা একটিও জীবনে হাতে নেননি। যদি তাই করতেন, তাহলে ঢাকা শহরে কামালদের পাঁচ-ছয়টা বাড়ি থাকতে পারত। সেই অসামান্য মানুষটিও আমাকে খুব ভালোবাসতেন। পরিবারের সবার সঙ্গে টেবিলে বসে আমি খেতাম। আম্মা এটা-ওটা পাতে তুলে দিতেন। কামালরা তিন ভাইবোন তত দিনে আমার খুব অনুরাগী হয়েছে। কামালের গানের প্রতি ঝোঁক। সেই ঝোঁক তো আমারও ছেলেবেলা থেকে। মিনু খালার দুঃসম্পর্কের এক দেবর আমার এ কথা জেনে সত্তর টাকা দিয়ে সিঙ্গেল রিডের পুরোনো একটা হারমোনিয়াম কিনে দিয়েছিলেন। ওই হারমোনিয়াম নিয়ে একটু একটু রেওয়াজ করতাম। একটা-দুটো গান তুলতে শিখেছি। সেই সময় আম্মা বাসা বদলে আমাদের রজনী চৌধুরী রোডের কাছে এস কে দাস রোডের একটা বাড়িতে এসে উঠলেন। বাড়ির সামনের গলিটি খুব সরু। তবে বাড়ির ভিতরটা বেশ বড় ও পরিচ্ছন্ন। গেট দিয়ে ঢুকলেই একটা উঠোন। দক্ষিণ পাশে রান্নাঘর। দুয়েকটা গাছও আছে বাড়িতে। একতলা বাড়িটির যে অংশ আম্মা ভাড়া নিয়েছেন সেখানটায় তিন-চারটা রুম। সন্ধ্যাবেলা রোজই কামালদের পড়াতে যাই। বাড়িতে টেলিভিশন কেনা হয়েছে। টেলিভিশনে নাটক দেখার জন্য সবার সঙ্গে বসে থাকি। এই বাড়িটাতে কামালের চাচাতো ভাইবোনরা প্রায়ই আসেন। লীনা আপা, বাবুলদা, আজাদদা, রুবেল, মণি, নীলু সবাই মিলে বেশ একটা জমজমাট পরিবেশ বাড়িতে। কামালের চাচা ফজলুল হক সাহেব অতি সম্মানীয় মানুষ। তিনি জজ। ধূপখোলা মাঠের দক্ষিণ পাশে দোতলা বাড়ি। ছিমছাম, স্নিগ্ধ পরিবেশ বাড়ির।
সেই সময় কোনো কোনো রাতে কামালদের সঙ্গে টেলিভিশন দেখতে দেখতে রাত গভীর হয়ে যেত। আমাদের বাসা কাছেই। তবু আম্মা আমাকে ফিরতে দিতেন না। আম্মার দুই ভাই ফিরোজ আর লিটন আম্মার সঙ্গে থাকেন। কামালদের মতো আমিও তাঁদের মামা বলি। ফিরোজ মামা আমাকে একটু বেশিই ভালোবাসেন। লিটন মামা আমার বয়সি। আমার সঙ্গে এসএসসি পাস করেছেন। ওই বয়সেই বেশ গম্ভীর। আমার সঙ্গে কথা বলতেন কম। তাদের সঙ্গে এক রুমে আমি থেকে যেতাম। এক রাতে মুকুলের সঙ্গে ওদের প্রেসে থেকে গেছি। প্রেসটা লক্ষ্মীবাজারে। মুকুলের বাবা গেছেন গ্রামের বাড়িতে। সকালবেলা ঘুম থেকে উঠে মুকুল পরোটা আর হালুয়া কিনে এনেছে, চা এনেছে। ওই সব খেয়ে ফিরতে ফিরতে সাড়ে নয়টা-দশটা বেজে গেছে। আম্মার বাসায় থাকলে সাধারণত এতটা বেলা করে ফিরি না। সেদিন দেরি দেখে আমার ছোট ভাই বাদল কামালদের বাসায় আমাকে খুঁজতে গেছে। রাতে বাড়ি ফিরিনি শুনে আম্মা দিশেহারা হয়ে গেলেন। বাদলের সঙ্গেই ছুটে এলেন আমাদের বাসায়। খানিক পর আমি ফিরেছি। আমার মায়ের চেয়ে আম্মাই আমাকে ধমকালেন বেশি। আমি মাথা নিচু করে বসে রইলাম।
মিজানুর রহমান কামাল নামে আমার এক নতুন বন্ধু হয়েছে। ‘সীমান্ত গ্রন্থাগার’-এর গলিতে ওদের বাড়ি। অতি অল্প সময়ে ভীষণ ঘনিষ্ঠতা হলো। আমার সঙ্গে জগন্নাথ কলেজেই ভর্তি হয়েছে। আইএসসি। মুকুল তো আছেই। এই তিনজন আমরা এক ফাঁকে বুলবুল একাডেমিতে ভর্তি হয়ে গেলাম গান শেখার জন্য। রবীন্দ্রসংগীত শিখব। তিন বন্ধু একসঙ্গে যাই গান শিখতে। আমার ছাত্র কামালের ইচ্ছে হলো, সে একটা হারমোনিয়াম কিনবে। পাটুয়াটুলীর মোড়ে বিখ্যাত ‘যতীন এন্ড কোম্পানী’র দোকান। হারমোনিয়াম কেনা হলো। নিজে গানের কিছুই তখনো শিখিনি। ওই বিদ্যা নিয়েই কামালকেও গান শেখাতে লাগলাম। দুটো মাত্র গান হারমোনিয়ামে তুলতে শিখেছি। কামালকে সারগাম শেখাবার ফাঁকে ফাঁকে সেই গান দুটোও গাইতে শেখাই। দুটোই রবীন্দ্রনাথের গান। ‘ওগো নদী আপনবেগে পাগলপারা’। আরেকটা ‘যে রাতে মোর দুয়ারগুলি ভাঙলো ঝড়ে’। আমার বন্ধুরা কমবেশি সবাই গান গাইতে পারত। মানবেন্দ্র তো খুবই ভালো গাইত। গেন্ডারিয়া স্কুলের এক অনুষ্ঠানে ফখরুল স্যার আমাকে দিয়ে গান গাইয়েছিলেন। তখন ক্লাস নাইনে পড়ি। নজরুলগীতি গেয়েছিলাম। ‘নয়নভরা জল গো তোমার’।
দিনগুলো তখন বহু রকমের ব্যস্ততার মধ্য দিয়ে কাটছিল। কলেজের পড়াশোনা, বড় ভাইয়ের কন্ট্রাক্টরির ব্যবসা দেখা, নাসিমা ও ফাতেমাকে পড়ানো, কামালদের পড়ানো, বুলবুল একাডেমি, এসবের ফাঁকে ফাঁকে সীমান্ত গ্রন্থাগারে গিয়ে বই পড়া আর বন্ধুদের সঙ্গে আড্ডা তো আছেই। বাড়ির কাছে এত বড় ধূপখোলা মাঠ। কখনো কখনো সেই মাঠে ঘুরতে যাই। খেলাধুলা পারি না কোনোটাই। কামালদের পরিবারে সবকিছুই সামলাতেন আম্মা। খালুজান পুরোপুরিই নির্ভর করতেন তাঁর ওপর। মোহাম্মদপুরের বাবর রোডে ২০ হাজার টাকায় আম্মা একটা বাড়ি কিনে ফেললেন। গেন্ডারিয়ার পাট চুকিয়ে চলে গেলেন মোহাম্মদপুরে। নাসিমা ও ফাতেমার ভাইয়েরাও মোহাম্মদপুরে বাড়ি কিনে চলে গেলেন। নাসিমা ও ফাতেমা আমার দুই বছরের জুনিয়র ছিল। এসএসসি পাস করে দুবোন ভর্তি হয়ে গেছে ‘ইডেন গার্লস কলেজ’-এ। আমাদের পরিবারটির স্ট্রাগল তখনো সহনীয় পর্যায়ে আসেনি। টিউশনি করে পঞ্চাশ টাকা রোজগার করতাম, তা-ও নেই। বড় ভাইয়ের কন্ট্রাক্টরি ব্যবসা টুকটাক এগোচ্ছে। পুুঁজি কিছুটা বাড়াতে পারলে ভালো করা যেত। আমরা টাকা পাব কোথায়? তবু চেষ্টা করে যাচ্ছি। আম্মা চলে গেছেন মোহাম্মদপুরে। আগে যখন তখন তাঁর কাছে যেতাম। বেতনের বাইরেও পাঁচ-দশ টাকা চাইলেই তিনি আমাকে দিতেন। তিনি তো চলে গেছেন দূরে!
একদিনকার কথা মনে আছে। একটাও পয়সা নেই পকেটে। কার কাছে চাইব? আম্মার কথা মনে পড়ল। বাস ভাড়া দিয়ে যে মোহাম্মদপুরে যাব, ভাড়ার পয়সাও নেই। গেন্ডারিয়া থেকে হাঁটা ধরলাম। গরমের দিন। দুপুর নাগাদ মোহাম্মদপুরের বাড়িতে গিয়ে হাজির হয়েছি। সেই বাড়িতে বড় একটা টিনের ঘর। রান্নাঘর আলাদা। উত্তরমুখী বাড়িটায় এক টুকরো উঠোনও আছে। আম্মা আমাকে দেখেই দুহাতে জড়িয়ে ধরলেন। ঘামে-ক্লান্তিতে মুখটা শুকিয়ে গেছে। মা তো! যা বোঝার বুঝে গেলেন। দুুপুরের খাওয়া হয়ে গেছে। আম্মা আমাকে গোসল করতে পাঠিয়ে সেই ফাঁকে চট করে আমার জন্য রান্না করলেন। বাসায় বলে গিয়েছিলাম আম্মার কাছে যাচ্ছি। সুতরাং কেউ চিন্তা করবে না। আম্মা আমাকে তাঁর কাছে তিন-চার দিন রেখে দিলেন। এভাবে মাঝে মাঝে যেতাম তাঁর বাড়িতে। দু-চার দিন থাকতাম। তত দিনে লেখালেখি শুরু করেছি। কন্ট্রাক্টরিতে মোটামুটি একটা অবস্থান তৈরি হয়েছে। বাসা বদলে আমরা এসে উঠেছি শাজাহান সাহেবের বাড়ির কাঠের দোতলা ঘরটির দোতলায়। দিন বদলাতে শুরু করেছে। আম্মার সঙ্গে যোগাযোগ কমে গেল। কামাল এসএসসি পাস করে নটর ডেমে ভর্তি হয়েছে। আম্মার ভাইয়েরা ’৭৭ সালের দিকে একে একে জার্মানিতে চলে গেলেন। বন-এ থাকেন। আমি চলে গিয়েছিলাম ’৭৯ সালের অক্টোবরে। ’৮০ সালে কামালও চলে গেল মামাদের কাছে। কামাল থাকত ফিরোজ মামা ও লিটন মামার সঙ্গে। আমি বন থেকে চলে এসেছিলাম স্টুটগার্টে। সেখান থেকে বন-এ বেড়াতে গিয়ে কামালদের বাসায় একদিন গিয়েছিলাম। শেষ পর্যন্ত স্টুটগার্টের পাশের ছোট্ট শহর সিনডেলফিনগেনে থাকতাম আমি। বন থেকে কামাল একবার আমার ওখানে বেড়াতে এসেছিল। আমি ফিরে আসার কয়েক বছর পর কামালও ফিরে এলো। ‘ওয়েবস ব্যান্ড’ নামে গানের একটা দল করল। শিল্পকলা একাডেমিতে অনুষ্ঠানও করল। তত দিনে লেখক হিসেবে আমার কিছুটা নাম হয়েছে। কামালের ব্যান্ডের গান শুনতে গিয়েছিলাম। জার্মানদের মতো হাতকাটা একটা টি-শার্ট আর জিন্স পরে স্টেজ মাতিয়ে দিয়েছিল কামাল। সে দেখতে অত্যন্ত সুপুরুষ। তারুণ্যে ঝকঝক করছিল। কামালের সেদিনকার সেই চেহারা আজও আমার চোখে লেগে আছে।
তারপর দীর্ঘ বিরতি। আম্মার ছোট ছেলে সায়েম কবে জন্মাল তা আমার মনেই নেই। দেশে ফিরে চাকরি করল কামাল। ব্যবসা শুরু করল। চাচাতো বোন নীলুকে বিয়ে করল। সবই শুনতাম কিন্তু ওদের সঙ্গে দেখা হতো না। যোগাযোগ একেবারেই বিচ্ছিন্ন। গেন্ডারিয়া থেকে মগবাজারে চলে এলাম ’৯৮ সালে। তার দুই-তিন বছর পর হঠাৎ এক বিকেলে নীলুকে নিয়ে কামাল এসে হাজির আমার ফ্ল্যাটে। আনন্দে ঝলমল করছে দুজনার মুখ। দামি সুন্দর গাড়ি ড্রাইভ করে এসেছে কামাল। জানলাম সে খুব ভালো ব্যবসা করে। মোহাম্মদপুরের পুরোনো বাড়ির সঙ্গে আরও কিছুটা জমি কিনে পাঁচতলা বাড়ি করা হয়েছে। আম্মা সেই বাড়িতে থাকেন। কামাল ফ্ল্যাট কিনে চলে গেছে ধানমন্ডিতে। নীলু একটা কলেজে সাইকোলজি পড়ায়। সবাই খুব ভালো আছে। তারও কয়েক বছর পর আমেরিকার ডালাসে গিয়েছি, ‘ফোবানা সম্মেলন’-এ। সেই সম্মেলনে দেখা হলো সায়েমের সঙ্গে। কামালের ছোট ভাই। তার আগে ওকে আমি দেখিইনি। ভার্জিনিয়া থেকে সায়েম এসেছে সম্মেলনে। সঙ্গে চাচাতো ভাই রুবল আর তার স্ত্রী আইভি। রুবলের ভালো নাম মাসুদ। আইভিকে আমি ও আমার শিল্পসাহিত্যের বন্ধুরা বিশেষভাবে চিনতাম। আইভি ছিল বিটিভির এনাউন্সার। বান্ধবীদের নিয়ে ফরিদুর রেজা সাগর ও শাইখ সিরাজের ‘খাবারদাবার’-এ আসত মাঝে মাঝে। ‘খাবারদাবার’ ছিল আমাদের প্রধান আড্ডার জায়গা।
আম্মার কাছে ফিরে যাওয়া হলো বাবুলদার কারণে। কামালের চাচাতো ভাই। অত্যন্ত সুপুরুষ ও মেধাবী। ’৭৩ সালে বাংলাদেশ এয়ারফোর্সে ঢুকেছিলেন ‘ফার্স্ট জিডিপি পাইলট’ হিসেবে। রাশিয়াতে চলে গিয়েছিলেন ট্রেনিংয়ে। ’৮০ সালের দিকে রাশিয়া থেকে জার্মানিতে চলে যান। তাঁর ছোট আজাদদা মুক্তিযোদ্ধা ছিলেন। আমার বড় ভাইয়ের বন্ধু। আমার ভাইয়ের নামও আজাদ। সেই আজাদদা আমাকে বিশেষ স্নেহের চোখে দেখতেন। তিনি চলে গিয়েছিলেন কানাডায়। ২০১৫-১৬ সালের দিকে কামাল হঠাৎ আমার সঙ্গে যোগাযোগ করল। বাবুলদা জার্মানিতে বসে একটা বই লিখেছেন। বইটির নাম ‘বদলে যান এখনই’। সেই বই প্রকাশ করতে হবে। ‘অনন্যা’ প্রকাশনী থেকে সে বছর বইমেলায় বইটি প্রকাশিত হলো। বাবুলদা দেশে এলেন। তাঁর বইয়ের প্রকাশ উপলক্ষে কামালদের পরিবারের সবাই, বাবুলদাদের পরিবারের সবাই বইমেলায় এলো। বহু বছর পর সবার সঙ্গে আমার দেখা হলো। তত দিনে খালুজান পরলোকগত। সবার সঙ্গেই দেখা হলো, শুধু আম্মার সঙ্গেই দেখা হচ্ছে না। একদিন গেলাম তাঁর সঙ্গে দেখা করতে। কামালরা সবাই সে দিন মোহাম্মদপুরের বাড়িতে। আমি বেল বাজাবার পর গেট খুলে দেওয়া হলো। সোয়েবের সঙ্গে আম্মা থাকেন তিনতলার ফ্ল্যাটে। আমি ধীরে ধীরে সিঁড়ি ভাঙছি। তিনতলার ফ্ল্যাটের সামনে সিঁড়ির মুখে দাঁড়িয়ে আছেন আম্মা। আমাকে দেখে দুটো হাত বাড়িয়ে দিলেন এমন ভঙ্গিতে যেন তাঁর হারিয়ে যাওয়া শিশুটি বহু পথ অতিক্রম করে তাঁর কাছে ফিরে এসেছে। দুহাতে আমাকে জড়িয়ে ধরলেন। আমিও ধরলাম তাঁর গলা। আম্মা তখন ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদছেন আর বলছেন, ‘আমাকে তুই এভাবে ভুলে থাকতে পারলি? এতগুলো বছর কেটে গেল, আমার কথা তোর একবারও মনে হলো না?’ আমি কোনো কথা বলতে পারি না। চোখের জলে গাল ভেসে যাচ্ছে। যেন মায়ের কোলে ফিরে আসা শিশুটি গভীর কোনো আনন্দ কিংবা বেদনায় কাঁদছে। (বাকি অংশ আগামী সংখ্যায়)
লেখক : কথাসাহিত্যিক