দেশপ্রেমিক নাগরিকেরা আবেগের বশে দেশকে মায়ের মর্যাদা দেয়। তখন দেশের নাম হয়ে যায় মাতৃভূমি, যার ইংরেজি রূপ ‘মাদারল্যান্ড’। বাংলাদেশ নামের আমাদের এ মাদারল্যান্ডে গত সপ্তাহে বারবার উচ্চারিত হয়েছে দক্ষিণের জেলা মাদারীপুরের নাম। তবে দুঃখের বিষয় এ নাম কোনো সুখবর বা কারও কোনো ইতিবাচক অর্জনের জন্য নয় বরং উচ্চারিত হয়েছে মর্মান্তিক, কলঙ্কজনক ও নেতিবাচক কিছু মর্মকথা নিয়ে।
৩০ জানুয়ারি ২০২৫ বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস) প্রকাশিত ‘বাংলাদেশের দারিদ্র্য মানচিত্র-২০২২’ প্রকাশিত হয়, যেখানে দেখা যায় দেশের ৬৪টি জেলার মধ্যে মাদারীপুরে দারিদ্র্যের হার সবচেয়ে বেশি। এ জেলার প্রতি ১০০ জনের মধ্যে ৫৪ দশমিক ৫ জন অর্থাৎ ৫৪ দশমিক ৪ শতাংশ মানুষ দারিদ্র্যসীমার নিচে বসবাস করে। এ জেলার ডাসা উপজেলার অবস্থা সবচেয়ে করুণ, যেখানে ৬৩ দশমিক ২১ শতাংশ মানুষ অর্থাৎ প্রতি তিনজনের মধ্যে প্রায় একজনই দারিদ্র্যসীমার নিচে বাস করে।
২ ফেব্রুয়ারি দেশের বিভিন্ন গণমাধ্যমের মূল খবরে দেখা যায়, সম্ভবত ২৫ জানুয়ারি লিবিয়া থেকে নৌযানে করে ভূমধ্যসাগর পাড়ি দিয়ে ইতালি যাওয়ার চেষ্টা করছিলেন ৫৬ জন আরোহী। এরপর ২৮ থেকে ৩১ জানুয়ারির মধ্যে ২৩টি মৃতদেহ লিবিয়ার সৈকতে ভেসে আসার পরিপ্রেক্ষিতে ওই নৌযানটি ডুবে যাওয়ার এবং অধিকাংশের করুণ মৃত্যুর আশঙ্কা করা হচ্ছে। লিবিয়ার দূতাবাসসূত্র মৃত ২৩ জনের দেহের সঙ্গে কোনো পাসপোর্ট বা পরিচয়পত্র বা অন্য কোনো ডকুমেন্ট না থাকায় অবয়ব (চেহারা) দেখে তাদের বাংলাদেশি হতে পারে বলে মন্তব্য করেছে।
বিভিন্ন টেলিভিশন চ্যানেল ও অনলাইন পোর্টালের অনুসন্ধানে দেখা যায়, এ নৌকাডুবির ঘটনার পর থেকে দেশের দরিদ্রতম জেলা মাদারীপুরের অনেক বাড়িতেই চলছে শোকের মাতম। যারা দুর্ঘটনার শিকার হয়েছেন তাদের অনেকেই নৌকায় ওঠার আগে শেষবারের মতো টেলিফোনে কথা বলেছিলেন আপনজনদের সঙ্গে। এরপর থেকেই সব যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন।
এমন করুণ মৃত্যু আমাদের অনেক প্রশ্নের সম্মুখীন করেছে। উন্নয়নের জোয়ার, ঘরে ঘরে চাকরি, দারিদ্র্যবিষয়ক নিম্নমুখী সূচক, ১০০টি শিল্পাঞ্চলে ব্যাপক চাকরির সুযোগ, পদ্মা সেতুর ম্যাজিকে দক্ষিণাঞ্চলের ব্যবসাবাণিজ্য ও শিল্পকারখানার বাম্পার ইত্যাদিই ছিল বিগত বছরগুলোতে দিনে-রাতে হাজারবার শোনা শব্দ, বাক্য, সুর, এমনকি ওয়াজ মাহফিলের হেদায়েতের বাণী। এর বিপরীতে মাদারীপুর জেলার সিংহভাগ মানুষের গরিব থাকা ও জীবনের ঝুঁকি নিয়ে ২০ থেকে ৩০ বছরের যুবকদের স্বাচ্ছন্দ্যের আশায় নৌকায় সাগর পাড়ি দেওয়ার আপ্রাণ প্রচেষ্টা এ উন্নয়নগুলোকে অসার গণ্য করে। দেশে যদি উন্নয়নের এত জোয়ার সত্যি হতো তবে ইউরোপ থেকে ঝুঁকি নিয়ে মানুষ বাংলাদেশে আসত। বাস্তবে ঘটছে উল্টো ঘটনা।
বরিশাল, গোপালগঞ্জ, ফরিদপুর ও শরীয়তপুর জেলা চারদিক থেকে ঘিরে রেখেছে মাদারীপুর জেলাকে। তাই অন্য চারটি জেলার মতো মাদারীপুরেও ছিল আওয়ামী লীগের নিরঙ্কুশ দখলে। মাদারীপুরের মোট তিনটি নির্বাচনি এলাকার মধ্যে মাদারীপুর-১ আসনে ১৯৯১ থেকে ২০২৪ পর্যন্ত ৩৩ বছর সংসদ সদস্য ছিলেন আওয়ামী লীগের নূর-ই-আলম চৌধুরী লিটন। এর আগে এখানে সংসদ সদস্য ছিলেন তারই বাবা ইলিয়াস আহমেদ চৌধুরী।
এই ইলিয়াস আহমেদের মা চৌধুরী ফাতেমা বেগম ছিলেন শেখ মুজিবুর রহমানের বড় বোন। ফলে শেখ হাসিনার ফুফাতো ভাইয়ের ছেলে (ভাতিজা) হিসেবে লিটন ছিলেন শেখ হাসিনার কাছের মানুষ এবং মহান সংসদের দীর্ঘদিনের চিফ হুইপ। এত সুযোগ থাকার পরও ৩৩ বছরে তিনি এলাকার মানুষকে কেন সবচেয়ে দরিদ্র বানিয়ে ছাড়লেন তার জবাব খুঁজে পাওয়া যাবে না। তবে যা পাওয়া যাবে তা হলো, তার ৩৩ বছর এবং তার আগে তার বাবা ও দাদার আমলে হওয়া এলাকার উন্নতির ফিরিস্তি। তবে ক্ষমতার পট পরিবর্তনের পর জানা যায়, লিটনের সাজানো প্রকল্পের প্রস্তাব পরিবর্তন করে চর এলাকার খাসজমি ব্যক্তিমালিকানাধীন দেখিয়ে ৯০০ কোটি টাকায় ক্রয় করে তৎকালীন সরকার। (সূত্র : ডেইলি খবর ২৪ জানুয়ারি ২০২৫)। এখন সেই চর পদ্মায় বিলীন হয়েছে এবং চরের জমি বিক্রি করা সাজানো ভূমিমালিকরা লাপাত্তা। আর দুদক লিটনকে জিজ্ঞাসা করছে ৯০০ কোটি টাকা হিসাবের ব্যাপারে। শুধু এ ৯০০ কোটি টাকাই যদি মাদারীপুরের সাধারণ মানুষ পেত তবে দারিদ্র্যের হার ৫০ দশমিক ৪ শতাংশ থেকে একটু হলেও কমত।
১৯৯১ থেকে ২০১৪- এই ৩৩ বছর মাদারীপুর-২ আসনের সংসদ সদস্য ছিলেন শাজাহান খান। তার বড় পরিচয় তিনি ছিলেন পরিবহন খাতের ‘সম্রাট শাজাহান’। পরিবহন শ্রমিক নামে খানসেনারা সড়কে যা চাইতেন তাই হতো। এ খাতে চাঁদার বিশাল সংগ্রহ নিয়ন্ত্রণ করতেন শাজাহান খান। চাঁদার এ টাকা কোথায় যায়, এমন প্রশ্ন যাদের মনে ছিল তাদের প্রশ্নের উত্তর জানিয়ে দৈনিক কালবেলা ২ ফেব্রুয়ারি লিখেছে যে ‘জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদ অর্জনের অভিযোগে শাজাহান, তার স্ত্রী রোকেয়া ও ছেলে আসিবুরের বিরুদ্ধে মামলা করেছে দুদক। আর মেয়ে ঐশীকে দিয়েছে সম্পদ বিবরণী দাখিলের নোটিস। দুদকের দাবি, শাজাহান খান ১১ কোটি ৩৬ লাখ ৫১ হাজার ৫৫৫ টাকা, স্ত্রী রোকেয়া ৪ কোটি ৪৭ লাখ ১৯ হাজার ৮৪৬ টাকা, ছেলে আসিবুর ৯ কোটি ৮৯ লাখ ৬ হাজার ৬৫ টাকা ও মেয়ে ঐশী ১ কেটি ৭১ লাখ ১৮ হাজার ৯২ টাকা জ্ঞাত আয়বহির্ভূত থেকে অর্জন করেছেন। আর শাজাহানের ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে সন্দেহজনকভাবে লেনদেন হয়েছে ৮৬ কোটি ৬৯ লাখ ৩২ হাজার ৭৬৯ টাকা। সব মিলিয়ে দেখা যায়, দেশের সবচেয়ে গরিব জেলার একটি নির্বাচনি এলাকার সংসদ সদস্যের পরিবারের চারজনের প্রকাশিত বা সূত্র মূলে খুঁজে পাওয়া সন্দেহজনক সম্পদের মূল্য ১১৪ কোটি টাকার বেশি।
গরিব জেলা মাদারীপুরের সংসদীয় আসন-৩-এ সাবেক যোগাযোগমন্ত্রী ও ‘প্রুভেন অনেস্ট ম্যান’ খ্যাত সৈয়দ আবুল হোসেন তিনবার, আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক বাহাউদ্দিন নাছিম একবার এবং শেখ হাসিনার বিশেষ সহকারী ও আওয়ামী লীগের দপ্তর সম্পাদক মো. আবদুস সোবহান গোলাপ একবার নির্বাচিত হন। এর মধ্যে সৈয়দ আবুল হোসেন পদ্মা সেতু নির্মাণের সময় দুর্নীতির প্রশ্ন ওঠায় দায়িত্ব থেকে আদেশক্রমে অব্যাহতি নেন। আজ তিনি আর আমাদের মাঝে নেই।
আ ফ ম বাহাউদ্দিন নাছিম ও তার স্ত্রীর কেবল নগদ টাকাই ১০ বছরে বেড়েছে ১৬ থেকে ১৭ গুণ। বাহাউদ্দিন নাছিমের টাকা ৪৪ লাখ ৪৫ হাজার থেকে বেড়ে হয় ৭ কোটি ৬৯ লাখ টাকা। অন্যদিকে তার স্ত্রীর টাকা ১৮ লাখ ৯৬ হাজার থেকে বেড়ে হয় ৩ কোটি ৪ লাখ। গরিব জেলার এ আসনের অপর সংসদ সদস্য আবদুস সোবহান মিয়ার অন্তত ৯টি বাড়ি রয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্কে। দেশেও নানা নামে অঢেল সম্পত্তির মালিক হয়েছিল তার পরিবার, যা তদন্ত করছে দুদক।
দুর্নীতির কশাঘাতে একটি জনপদের মানুষের কী হাল হতে পারে, তার নজির হয়ে থাকবে মাদারীপুর। ৩৩ বছর এ এলাকা একটি দলের এবং প্রায় ক্ষেত্রে একই সংসদ সদস্যের ছায়াতলে থেকে একটা বড় সময় দেশশাসনের দায়িত্বে থাকা দলের আশীর্বাদপুষ্ট হয়েও দেশের সবচেয়ে দরিদ্র জেলা হওয়ার কোনো কারণ থাকতে পারে না। যদি এ এলাকাটি খরাপীড়িত, লবণাক্ত বা অনাবাদি জনপদ হতো বা যুদ্ধে জর্জরিত থাকত তাহলে হয়তো এমনটা মানা যেত। একটি সম্ভাবনাময় জেলার এমন করুণ দৃশ্য ক্ষমার অযোগ্য।
মাদারীপুরের ঘরে ঘরে যখন শোকের মাতম তখনো অজ্ঞাত স্থান থেকে আসা অপ্রত্যাশিত ভাষণ শুনতে হয় মাদারীপুরবাসীকে। এর আগে তাদের এলাকার সংসদ সদস্য বাহাউদ্দিন নাছিম একটি টেলিভিশন সাক্ষাৎকার ও ভেরিফায়েড ফেসবুকে জানিয়েছিলেন, ‘প্রকৃতপক্ষেই আমরা যদি ভুল বা অন্যায় করে থাকি তবে সেই অন্যায়ের জন্য জাতির কাছে ক্ষমা চাইতে আমাদের কোনো আপত্তি অথবা আমরা ক্ষমা চাইব না- এ ধরনের গোঁড়ামি আমাদের ভিতরে কাজ করে না।’
এখানে লক্ষণীয় সবচেয়ে দরিদ্র জেলার এই সংসদ সদস্য এখনো ‘যদি ভুল করে থাকি’-জাতীয় ভুলের বৃত্ত থেকে বের হতে পারছেন না। নিজ জেলাকে সবচেয়ে গরিব দেখে তিনি হয়তো ভাবছেন :
“হে দারিদ্র্য, তুমি মোরে করেছ মহান।
তুমি মোরে দানিয়াছ খ্রিস্টের সম্মান
কণ্টক-মুকুট শোভা। -দিয়াছ, তাপস,
অসঙ্কোচ প্রকাশের দুরন্ত সাহস;
উদ্ধত উলঙ্গ দৃষ্টি, বাণী ক্ষুরধার,
বীণা মোর শাপে তব হল তরবার!”
তবে এ কথাও সত্য, এ মাদারীপুরেরই কৃতী সন্তান ফরায়েজি আন্দোলনের অগ্নিপুরুষ মুহাম্মাদ মহসিন উদ্দিন দুদু মিয়া, প্রথম শহীদ মিনারের রূপকার ও ভাষাসৈনিক ডাক্তার গোলাম মাওলা, বাংলা ভাষার অহংকার কবি, সাহিত্যিক ও উপন্যাস রচয়িতা সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় (ভারত), বিজ্ঞানলেখক ও বর্তমান বিশ্বের সুপরিচিত পদার্থবিজ্ঞানী স্বপন কুমার গায়েন (আমেরিকা) এবং জগৎখ্যাত প্রকৌশলী এফ আর খান (আমেরিকা) প্রমুখ। মাদারীপুরের ভবিষ্যৎ নেতারা জেলাটিকে ‘মাদারল্যান্ড’ ভেবে শাজাহান খানের বদলে এফ আর খান, লিটনের বদলে স্বপন, বাহাউদ্দিনের বদলে মহসিন উদ্দিনের জন্ম ও বেড়ে ওঠার সুযোগ করে দেবেন- এটাই প্রত্যাশা। আবদুস সোবহান গোলাপ নয়, সত্যিকারের গোলাপ ফুটুক মাদারল্যান্ড মাদারীপুরের ঘরে ঘরে।
লেখক : গবেষক, বিশ্লেষক ও কলামিস্ট
ইমেইল : [email protected]