দেশ তথ্যপ্রযুক্তিতে দ্রুত এগিয়ে যাচ্ছে। তথ্যপ্রযুক্তি আমাদের জীবনযাপনকে সহজলভ্য করে তুলেছে। মানুষ ঘরে বসেই ইন্টারনেট ব্যাংকিংসুবিধা পাচ্ছে। ফ্রিল্যান্সিংয়ের মাধ্যমে বিপুল বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করা যাচ্ছে। ই-কমার্সের সুবিধা ঘরে ঘরে পৌঁছে গেছে। প্রযুক্তি ছাড়া জীবন এখন অচল। তথ্যপ্রযুক্তি হাতের মুঠোয় এনে দিয়েছে গোটা বিশ্বকে। তথ্যপ্রযুক্তি আমাদের জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে যেমন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে, তেমনি আবার আমাদের ধ্বংসের দিকে নিয়ে যাচ্ছে। বিপুল সুবিধার পাশাপাশি কিছু সমস্যাও তৈরি হচ্ছে। প্রযুক্তি ব্যবহারের মাধ্যমে আমরা অনেক কিছু জানতে ও শিখতে পেরেছি কিন্তু তার সঙ্গে সঙ্গে আমাদের নৈতিক মূল্যবোধ হারিয়ে ফেলেছি। প্রযুক্তি ব্যবহারের ফলে দেশ তথা বিশ্ব উন্নতির পাশাপাশি সভ্যতার কিছু লোপ পাচ্ছে। বর্তমান সময়ের সব থেকে জনপ্রিয় যোগাযোগমাধ্যম হলো কতগুলো সামাজিক যোগযোগমাধ্যম, যার মাধ্যমে খুব অল্প বয়সেই কিশোররা অপরাধের সঙ্গে জড়িয়ে পড়ে। ক্রমেই সাইবার ক্রাইম বা তথ্যপ্রযুক্তিনির্ভর অপরাধ বেড়ে চলেছে। ইন্টারনেটে আপত্তিকর ছবি প্রচার, ব্ল্যাকমেল ও প্রতারণার ফাঁদ পাতার মতো সামাজিক অপরাধ থেকে শুরু করে মানব পাচার, মাদক বেচাকেনা, উগ্র সাম্প্রদায়িকতা, জঙ্গি কর্মকাণ্ডের মতো অনেক অপরাধই ঘটে থাকে তথ্যপ্রযুক্তির মাধ্যমে।
দেশে তথ্যপ্রযুক্তি ব্যবহারের সঙ্গে সমান্তরাল হারে বেড়েছে সাইবার অপরাধ। ফেসবুক, ইউটিউব, লাইকি, টিকটক, বিগো লাইভের মতো সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহার করে দ্রুত বেড়ে চলেছে সাইবার অপরাধ। এসব অপরাধের মধ্যে আছে যৌন হয়রানিমূলক একান্ত ব্যক্তিগত মুহূর্তের ছবি বা ভিডিও (পর্নোগ্রাফি) ব্যবহার করে হয়রানি, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমসহ অন্যান্য অনলাইন অ্যাকাউন্ট হ্যাকিংয়ের ঘটনা, এটিএম হ্যাকিং ও ই-কমার্সের নামে প্রতারণা।
করোনাকালে এমন কিছু ঘটনা ঘটেছে, যা আমাদের পুরো সমাজব্যবস্থাকে প্রশ্নের সম্মুখীন করে। রাজধানীর কদমতলীতে মা-বাবা ও ছোট বোনকে খুনের পর জাতীয় জরুরি সেবার হটলাইন নম্বরে ফোন করে নিজেই পুলিশকে খবর দিয়েছেন এক তরুণী। রাজধানীতে অনৈতিক সম্পর্কের জের ধরে স্ত্রীর প্ররোচনায় স্বামীকে হত্যা ও লাশ টুকরো করে লুকিয়ে রেখেছিলেন মসজিদের ইমাম। সাম্প্রতিক এসব ঘটনা তো পারিবারিক কলহের ভয়াবহ চিত্র সামনে নিয়ে এসেছে। সামাজিক পরিবর্তন, পারিবারিক মূল্যবোধ ও বন্ধন অনেকটা ভেঙে গেছে। আর মহামারির কারণে এটা আরও প্রবল আকার ধারণ করেছে। মানবিক মূল্যবোধের চরম অবক্ষয়ের প্রভাব পড়ছে সমাজে। সমাজ যেন ক্রমেই বর্বরতার চরমে চলে যাচ্ছে। ব্যক্তি সম্পর্কে পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ ও সহনশীলতা হ্রাস পেয়েছে। সামাজিক অপরাধের পাশাপাশি পারিবারিক অপরাধের মাত্রাও বৃদ্ধি পেতে শুরু করেছে। কোনোভাবেই সমাজকে অপরাধমুক্ত করা যাচ্ছে না।
আমাদের সমাজজীবন থেকে সামাজিক বন্ধনগুলো ক্রমেই আলগা হয়ে যাওয়ার পাশাপাশি পারিবারিক বন্ধন শিথিল হচ্ছে। ক্ষয়ে যাচ্ছে সব ধরনের মূল্যবোধও। এরই কুফল পড়তে শুরু করেছে সমাজের সর্বত্র। ফলে সামান্য কারণেই ঘটে যাচ্ছে খুনাখুনি। সমাজে পরিবর্তনের এক অসুস্থ ধারা তৈরি হচ্ছে। সামাজিক অবক্ষয়ের কারণেই মূলত এ রকম নানা ঘটনা ঘটছে। পারিবারিক ও সামাজিক বন্ধন দুর্বল হয়ে যাওয়ার কারণে নিষ্ঠুরতা ও নৃশংসতা বাড়ছে। স্বল্প সময়ের মধ্যে দেশে অনেক পারিবারিক নিষ্ঠুরতার ঘটনা ঘটেছে।
‘বিগো লাইভ’, ‘টিকটক’, ‘লাইকি’ নামক সর্বনাশা সব মোবাইল ফোন অ্যাপ ব্যবহার তরুণ প্রজন্মকে করছে বিপথগামী। এসব অ্যাপ ব্যবহারে নষ্ট হয়ে যাচ্ছে নৈতিকতা, সামাজিক মূল্যবোধ ও পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ। তরুণরা কিশোর গ্যাংয়ে জড়িয়ে অপরাধমূলক কার্যক্রমে অংশ নিচ্ছে, হয়ে উঠছে সহিংস। ‘টিকটক’ নামক চীনা ভিডিও শেয়ারিং সোশ্যাল নেটওয়ার্কিং সার্ভিসটি বর্তমানে বাংলাদেশের তরুণ প্রজন্মের কাছে খুব জনপ্রিয় একটি মোবাইল অ্যাপ। এ অ্যাপের মাধ্যমে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভিডিও তৈরির ক্ষেত্রে পিছিয়ে নেই কিশোরী ও তরুণীরা। স্বল্পবসনা তরুণীরা টিকটকের অশ্লীল ভিডিওতে নাচগান ও অভিনয়ের পাশাপাশি নিজেদের ধূমপান ও সিসা গ্রহণ করার ভিডিও আপলোড করছেন। উদ্বেগজনক যে এ টিকটক ভিডিওগুলোতে নেই কোনো শিক্ষণীয় বার্তা। উল্টো এসব ভিডিওর মাধ্যমে তরুণ প্রজন্মের কাছে ভুল বার্তা চলে যাচ্ছে। বিশ্বব্যাপী জনপ্রিয় এ অ্যাপটির অপব্যবহারের কারণে এরই মধ্যে বিভিন্ন দেশে এর ব্যবহার নিষিদ্ধ করা হয়েছে। আবার বিব্রতকর, অনৈতিক ও অশ্লীল ভিডিও, যা পর্নোগ্রাফিকে উৎসাহিত করে, তা প্রচার করায় বিভিন্ন দেশে এর ব্যবহার নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। ভারত, ইন্দোনেশিয়া, পাকিস্তানে এরই মধ্যে নিষিদ্ধ হয়েছে টিকটক। ঢাকার কিশোর গ্যাংয়ের সদস্যরাও টিকটক অ্যাপ ব্যবহার করে। তারা সেখানে গ্রুপ করে যুক্ত করে অন্য সদস্যদের।
বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ রেগুলেটরি কমিশনের সর্বশেষ প্রতিবেদন অনুযায়ী দেশে এখন ব্রডব্যান্ড ইন্টারনেটের সংযোগ সংখ্যা প্রায় ১ কোটি। মোবাইল অপারেটরদের তারহীন ইন্টারনেট ব্যবহারকারীর সংখ্যা ১১ কোটি ৭৩ লাখ ১০ হাজার। দেশে দিন দিন ইন্টারনেট ব্যবহারকারীর সংখ্যা যেমন বাড়ছে তেমনি বাড়ছে অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড। নেতিবাচক ও অপরাধমূলক কাজে ুুড়বেশি ব্যবহার হওয়ায় সোশ্যাল মিডিয়া নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে। কাজেই এ ধরনের অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড নিয়ন্ত্রণে আইন থাকা দরকার।
টিকটক মডেল করার লোভ দেখিয়ে সুসম্পর্ক গড়ে তুলে দেশ থেকে কয়েক শ তরুণীকে পাচার করা হয়েছে বিভিন্ন দেশে। টিকটকের ফাঁদে পড়ে ভারতে পাচার হওয়া তরুণীদের কয়েকজন দেশে ফিরে তাঁদের ওপর নির্যাতনের যে বর্ণনা দিয়েছেন, তা ভয়াবহ। দেশে ফেরা তরুণীরা মানব পাচার ও পর্নোগ্রাফি আইনে পাঁচটি মামলা করার পর এসব মামলায় এ পর্যন্ত ২০ জনকে গ্রেপ্তার করে রিমান্ডে নিয়েছে পুলিশ। তাদের কাছ থেকে পুলিশ জানতে পেরেছে এ পাচারকারী চক্রে দেশবিদেশের কয়েক শ সদস্য যুক্ত। শুধু ভারতে নয়, মালয়েশিয়া ও সংযুক্ত আরব আমিরাতেও তারা দীর্ঘদিন ধরে নারী পাচার করেছে। এদিকে রাজধানীতে সক্রিয় আরেক অপরাধী চক্র কিশোর গ্যাং। সম্প্রতি আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর তৎপরতায় গ্রেপ্তার বাড়লেও গ্যাং সদস্যদের অপরাধ নিয়ন্ত্রণে আনা যাচ্ছে না। প্রতিদিনই সামনে আসছে নতুন নতুন গ্যাংয়ের নাম। আধিপত্য বিস্তার, পথচারীদের হঠাৎ ঘিরে ধরে অস্ত্রের ভয় দেখিয়ে টাকাপয়সা কেড়ে নিয়ে দ্রুত পালিয়ে যাওয়া, রাস্তায় পরিকল্পিত সংঘাত তৈরির মাধ্যমে ভীতিকর পরিস্থিতি সৃষ্টি করে চাঁদাবাজির মতো অপরাধে জড়িয়ে পড়ছে কিশোর গ্যাংয়ের সদস্যরা। তাই বলছি, সমাজকে অধঃপতন থেকে রক্ষা করতে এসব অপরাধপ্রবণতা যেকোনো মূল্যে বন্ধ করতে হবে।
জনগণের ডিজিটাল দক্ষতা, উদ্যোগের ঝুঁঁঁকিবিষয়ক দৃষ্টিভঙ্গি, শ্রমশক্তির বহুমুখিনতা, মোবাইল ব্রডব্যান্ড সাবস্ক্রিপশন এবং কোম্পানির উদ্ভাবনী আইডিয়া গ্রহণ। ইকোসিস্টেমে দক্ষিণ এশিয়ায় বাংলাদেশ চতুর্থ হলেও মাইন্ডসেটে বাংলাদেশের অবস্থান তৃতীয়। ভিত্তি বিবেচনায় বাংলাদেশের এ অগ্রগতি কম নয়। কিন্তু এখানেই থামলে চলবে না। মনে রাখতে হবে, বর্তমান বিশ্ব এগিয়ে যাচ্ছে প্রযুক্তির সক্ষমতায়। আমাদেরও সেই সক্ষমতা থাকতে হবে। এ জন্য আমাদের করণীয় নির্ধারণ করতে হবে এবং দ্রুত এগিয়ে যেতে হবে।
জাতিসংঘের ২০১৮ সালের ই-গভর্ন্যান্স সূচকে ৯ ধাপ এগিয়ে ১৯৩টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান হয়েছিল ১১৫। এ ক্ষেত্রে দক্ষিণ এশিয়ায় বাংলাদেশের আগে ছিল শ্রীলঙ্কা, ভারত ও মালদ্বীপ। একই সঙ্গে ই-পার্টিসিপেশন সূচকে ৩৩ ধাপ এগিয়ে বাংলাদেশ হয়েছিল ৫১তম দেশ। ই-পার্টিসিপেশন সূচকে দক্ষিণ এশিয়ায় বাংলাদেশের আগে ছিল কেবল ভারত। সাম্প্রতিক ডিজিটাল রাইজার প্রতিবেদনে দক্ষিণ এশিয়ায় বাংলাদেশের অবস্থান কিছুটা পিছিয়ে যাওয়ার কারণগুলো অনুসন্ধান করতে হবে এবং সে অনুযায়ী ব্যবস্থা নিতে হবে।
তথ্যপ্রযুক্তির ক্ষেত্রে এগিয়ে চলার কোনো বিকল্প নেই। দ্রুত সক্ষম জনবল ও পরিবেশ সৃষ্টি করতে হবে। বৈশ্বিক প্রতিযোগিতায় আরও বেশি করে নিজেদের সক্ষমতা তুলে ধরতে হবে। পাশাপাশি লক্ষ রাখতে হবে, এ ক্ষেত্রের কোনো দুর্বলতা বা অপব্যবহার যেন জনজীবনকে ক্ষতিগ্রস্ত না করে। আমার চাওয়া, দু-এক দশকের মধ্যে তথ্যপ্রযুক্তি ক্ষেত্রে শুধু দক্ষিণ এশিয়ায় নয়, বিশ্বেই বাংলাদেশ একটি অনন্য নাম হয়ে উঠুক। তথ্যপ্রযুক্তি যত এগোবে, এর অপব্যবহার কিংবা প্রযুক্তিকেন্দ্রিক অপরাধ ততই বাড়বে। তাই তথ্যপ্রযুক্তির সুবিধা সম্প্রসারণের পাশাপাশি সাইবার অপরাধ দমনে আমাদের আরও বেশি সক্রিয় হতে হবে। অপরাধ নিয়ন্ত্রণে শক্তিশালী সাইবার স্কোয়াড গড়ে তুলতে হবে। তথ্যপ্রযুক্তির সুবিধা যেহেতু গ্রামাঞ্চলেও ছড়িয়ে যাচ্ছে, তাই সারা দেশের থানা পর্যায়ে প্রযুক্তিনির্ভর অপরাধ দমনের সক্ষমতা গড়ে তুলতে হবে।
একই সঙ্গে এ বিষয়ে জনসচেতনতা বাড়ানোরও উদ্যোগ নিতে হবে। তথ্যপ্রযুক্তি একদিকে যেমন আমাদের জন্য অবারিত সুযোগের দ্বার উন্মোচিত করেছে, তেমনি এর অপব্যবহার ও জালিয়াতির কারণে অনেক চ্যালেঞ্জেরও জন্ম দিয়েছে। আমাদের এগিয়ে যেতে হলে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির ব্যবহার করতেই হবে। যারা তথ্যপ্রযুক্তির অপব্যবহার করছে তাদের রোধ করতে হবে। আমাদের সামাজিকভাবে, শিক্ষাব্যবস্থায়, রাজনীতিসহ সব ক্ষেত্রে সচেতনতা গড়ে তুলতে হবে। আমাদের নতুন প্রজন্ম যেন তথ্যপ্রযুক্তি, বিজ্ঞানের সঠিক ব্যবহার করে, অপব্যবহার না করে।
লেখক : সাবেক সংসদ সদস্য