একবিংশ শতাব্দীকে বলা হয়- সভ্যতার উৎকর্ষের যুগ। তার পরও বিশ্বজুড়েই কুসংস্কার মানবসভ্যতাকে প্রশ্নবিদ্ধ করে রেখেছে। মানুষ শিক্ষাদীক্ষায় এগিয়ে গেলেও তার হৃদয়ের অন্ধকারাচ্ছন্ন কোঠায় সেই আলো আদৌ পৌঁছাচ্ছে কিনা, তা একটি প্রশ্নবিদ্ধ বিষয়। এ একাবিংশ শতাব্দীতেও কুসংস্কারের বিরুদ্ধে সভ্য মানুষকে লড়তে হচ্ছে। সুদানের বিতর্কিত লেখিকা কোলা বুফ যাঁকে আফ্রিকার তসলিমা নাসরিন হিসেবে ভাবা হয়, তিনি তাঁর আত্মজীবনীমূলক বই ‘ডায়েরি অব এ লস্ট গার্ল’-এ খতনাপ্রথার বীভৎসতার চিত্র তুলে ধরেছেন। নারীবাদী এ লেখিকার দৃষ্টিভঙ্গির সঙ্গে যে কারোর দ্বিমত থাকতেই পারে। কিন্তু খতনাপ্রথার বিরুদ্ধে তাঁর ক্ষোভের প্রতি মনুষ্যচেতনাসম্পন্ন যে কেউ সহানুভূতিশীল হতে বাধ্য। সুদানের এ লেখিকাকেও তাঁর কিশোরী বয়সে খতনাপ্রথার শিকার হতে হয়েছিল। কুসংস্কারের কাছে তিনি নিজেকে বলি দিতে বাধ্য হয়েছিলেন।
শিক্ষাদীক্ষায় পৃথিবী অনেক এগিয়ে গেলেও কুসংস্কারের বোঝা এখনো সভ্য দুনিয়ার ঘাড়ে চেপে রয়েছে। সর্বত্রই এর শিকার মূলত নারীরাই। এমনকি নারী-পুরুষে বৈষম্য স্বীকার করে না যে পশ্চিমা বিশ্ব সেখানেও নারীরা প্রতি পদে পদে উপেক্ষিত। আজও একজন মহিলাকে দেশের প্রেসিডেন্ট হিসেবে মেনে নেওয়ার মানসিকতা বিকশিত হয়নি দুনিয়ার সবচেয়ে অগ্রসর দেশ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে। আফ্রিকা ও আরব দেশগুলোর নারীরা যেসব কুসংস্কারের শিকার তার অন্যতম হলো মেয়েদের খতনাপ্রথা। পুরুষদের খতনা কথাটি সবার জানা। পৃথিবীর তিনটি প্রধান ধর্মমত মুসলমান, খ্রিস্টান ও ইহুদি ধর্মের অনুসারীদের মধ্যে এটি ব্যাপকভাবে প্রচলিত। ধর্মীয় প্রথা শুধু নয়, আধুনিক বিজ্ঞানও পুরুষদের খতনার পক্ষে। কারণ এটি স্বাস্থ্যসম্মত। যে কারণে ধর্মীয় দিক থেকে যারা খতনাপ্রথায় অভ্যস্ত নন, তারাও অনেক সময় স্বাস্থ্যগত কারণে খতনা করান। খতনাপ্রথার প্রথম উদ্ভব ইহুদি সমাজে। ইহুদিরা এটিকে অবশ্যপালনীয় কর্তব্য হিসেবেই মনে করে। খ্রিস্টীয় বিধানে বাধ্যবাধকতা তেমন না থাকলেও এ ধর্মের সূতিকাগার ফিলিস্তিন ও ধারেকাছের আরব দেশগুলোতে খ্রিস্টানদের মধ্যে খতনাপ্রথার প্রচলন আছে।
আমাদের দেশের মুসলমান সম্প্রদায়ের মধ্যে খতনাকে অবশ্যপালনীয় কর্তব্য বলে ধরা হয়। সাধারণের ভাষায় যা ‘মুসলমানি’ হিসেবে পরিচিত। অনেকেরই ধারণা খতনা না দিলে মুসলমানিত্ব থাকে না। যদিও খতনার সঙ্গে মুসলমানিত্বের কোনো সম্পর্ক নেই। ইসলামের দৃষ্টিতে অবশ্যপালনীয় কর্তব্যগুলোকে ফরজ বলে অভিহিত করা হয়। সে অর্থে খতনা ফরজ নয়। অর্থাৎ এটি পালন না করলে ধর্মচ্যুতি বা পাপের কোনো সম্ভাবনা নেই। তবে এটি মুসলমানদের জন্য একটি অনুসরণীয় স্বাস্থ্যবিধিবিশেষ। মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সা.) নিজে খতনা করেছেন। অন্যদেরও উৎসাহিত করেছেন। মুসলিম সমাজে পুরুষদের ত্বকচ্ছেদকে সুন্নতে খতনা হিসেবে অভিহিত করা হয়। ‘সুন্নত’ শব্দটির অর্থ ইসলাম ধর্মে বিশ্বাসী সবারই কমবেশি জানা। মহানবী যেসব অনুশাসন বা নিয়ম পালন করতেন সেগুলোকেই বলা হয় সুন্নত।
ইসলামের দৃষ্টিতে সুন্নত পালন করা উত্তম। এর মাধ্যমে মহানবীর জীবনাদর্শকে অনুসরণ করা হয়। সে হিসেবে এটি একটি পুণ্যের কাজ।
আধুনিক বিজ্ঞানের দৃষ্টিতে পুরুষদের খতনা স্বাস্থ্যসম্মত। কারণ খতনার মাধ্যমে বিভিন্ন ধরনের ছত্রাকজাতীয় রোগ থেকে রক্ষা পাওয়া যায়। যৌনবিজ্ঞান মতেও এটি একটি উপকারী প্রথা। পুরুষদের খতনা আমাদের দেশে ব্যাপকভাবে পরিচিত হলেও মেয়েদের খতনার বিষয়টি অজানা। জানামতে এ দেশে অথবা এ উপমহাদেশের কোথাও মেয়েদের খতনার প্রথা চালু নেই। আমাদের দেশে অপরিচিত হলেও দুনিয়ার বহু দেশে বিশেষত আফ্রিকা ও আরব দেশগুলোতে মেয়েদের খতনা ব্যাপকভাবে প্রচলিত। এ প্রথাটি ইতোমধ্যে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ও নারী অধিকারসংক্রান্ত আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর জন্য একটি মাথাব্যথার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
মেয়েদের খতনা এ দেশে অপ্রচলিত। স্বভাবতই অনেকের মধ্যে প্রশ্ন উঠতে পারে মেয়েদের খতনা আবার কী? পুরুষদের ক্ষেত্রে খতনা হলো, পুরুষাঙ্গের বাড়তি চামড়া কেটে ফেলে দেওয়া। আফ্রিকার বিস্তৃত অঞ্চল এবং কোনো কোনো আরব দেশে মেয়েদের যে খতনা চালু আছে তাতে ভগাঙ্কুরের বর্ধিত অংশটুকু কেটে ফেলা হয়। পুরুষ ও নারীর খতনার মধ্যে কিছু পার্থক্য রয়েছে। পুরুষদের যে অংশটি কেটে ফেলা হয় তা তেমন স্পর্শকাতর নয়। বরং এটি অনেক সময় স্বাস্থ্যের জন্য বিপজ্জনক হয়েও দেখা দেয়। মেয়েদের ভগাঙ্কুর শরীরের সবচেয়ে স্পর্শকাতর স্থান। এটি কেটে ফেললে রক্ত বন্ধ করা কঠিন হয়ে দাঁড়ায়। যন্ত্রণাদায়ক তো বটেই। বিশ্বে প্রতি বছর কোটি কোটি পুরুষের খতনা হলেও জীবনহানির ঘটনা নগণ্য। ভোগান্তির পরিমাণও একেবারে কম। পক্ষান্তরে মেয়েদের খতনার জন্য জীবনহানির ঘটনা অহরহ ঘটছে। ভগাঙ্কুরে সৃষ্ট ক্ষতের কারণে দীর্ঘস্থায়ী বিরূপ প্রতিক্রিয়ার শিকারও হয় হাজার হাজার মেয়ে।
স্পষ্টভাবে বলা যায়, মেয়েদের খতনা একটি বর্বর প্রথা। এটি আমাদের এ উপমহাদেশের সনাতন ধর্মাবলম্বীদের মধ্যে প্রচলিত সতীদাহের মতোই অমানবিক ও বীভৎস। আফ্রিকার কোনো কোনো দেশে গোত্রের বিশেষ বয়সের সব কিশোরীকে একসঙ্গে বীভৎস উৎসবের মাধ্যমে খতনা দেওয়া হয়। খতনার নামে ভগাঙ্কুর কাটতে যে অস্ত্র ব্যবহার করা হয় তা অনেক সময় দূষণমুক্ত থাকে না। কুসংস্কারের বশে খতনা দেওয়ার ক্ষেত্রে এমন সব পদ্ধতির আশ্রয় নেওয়া হয়, তা একদিকে যেমন যন্ত্রণাদায়ক অন্যদিকে স্বাস্থ্যের জন্য হুমকি। গত শতাব্দীর শেষ দিকে আফ্রিকার সিয়েরা লিওনে এমন ধরনের এক গণখতনার ঘটনা ঘটে। ঘটা করে একটি গোত্রের সব কুমারী মেয়ের ভগাঙ্কুরের অংশবিশেষ কেটে ফেলা হয়। যার সংখ্যা ছিল ৬০০। খতনায় যৌনাঙ্গে ক্ষত সৃষ্টি হওয়ায় তাদের অন্তত ১০ জনের জীবন হুমকির সম্মুখীন হয়। যাদের হাসপাতালের ইনটেনসিভ কেয়ার ইউনিটে ভর্তি করে জরুরি চিকিৎসা দিতে হয়। আরও অনেক মেয়েকে এ কারণে হাসপাতালে ভর্তি হতে হয়েছে। কুসংস্কারবশে যারা হাসপাতালে যায়নি তার সংখ্যাও অনেক।
সিয়েরা লিওনে মেয়েদের খতনা রাষ্ট্রীয়ভাবে বৈধ। গণখতনার বিষয়টি বাইরের দুনিয়ায় প্রকাশিত হলে সে দেশের সরকার বিব্রত অবস্থায় পড়ে। সিয়েরা লিওনের তৎকালীন ফার্স্টলেডি মরিয়ম কোব্বাহ সেই লজ্জা লুকাতে এক বিবৃতিতে শাক দিয়ে মাছ ঢাকার চেষ্টা করেন। তিনি বলেন, খতনার বিষয়টি তাঁর জানা ছিল না। তিনি এ প্রথার সঙ্গে একমত নন।
সিয়েরা লিওনের ফার্স্টলেডি গণখতনা সম্পর্কে অজ্ঞতা প্রকাশ করলেও এর নিন্দা জানাননি। এ অমানবিক প্রথা বন্ধে সরকার উদ্যোগ নেবে এমন কোনো প্রতিশ্রুতিও দেননি। মেয়েদের খতনা নামের কুসংস্কারটি সে দেশের জনমনে যেভাবে গেঁথে আছে, তার বিরুদ্ধাচরণ করার সৎ সাহস দেখাতে পারেননি তিনি। শুধু সিয়েরা লিওন নয়, আফ্রিকার অনেক দেশে মেয়েদের খতনা একটি অবশ্যপালনীয় প্রথা। এটিকে তারা পুণ্যের কাজ মনে করে। যে কুসংস্কারের শিকার আফ্রিকার লাখ লাখ মেয়ে। জাতিসংঘের বিভিন্ন সংস্থা এ প্রথার বিরুদ্ধে শত নিন্দাবাদ জানালেও অবস্থার খুব বেশি উন্নতি হয়নি। কৃষ্ণ আফ্রিকা অর্থাৎ এ মহাদেশের যে অংশটি মাত্র দু-এক শতাব্দী আগেও সভ্য বিশ্ব থেকে দূরে ছিল তাদের মধ্যে এ কুসংস্কার টিকে থাকার বিষয়টি হয়তো ক্ষমা করা যায়। কিন্তু যে দেশটি বিশ্ব সভ্যতার সূতিকাগার হিসেবে পরিচিত আফ্রিকার সেই মিসরেও মেয়েদের খতনা বর্বরতার যুগকে এখনো লালন করে আছে। মিসরে আইনগতভাবে এ প্রথা নিষিদ্ধ। এটিকে নিরুৎসাহিত করতে প্রচার-প্রচারণারও অভাব নেই। কিন্তু মিসরীয় সমাজেও প্রতি বছর হাজার হাজার মেয়েকে খতনা দেওয়া হয়। একইভাবে নীল নদের দেশ মিসরে চালু রয়েছে কনট্রাক্ট ম্যারেজ নামের জঘন্য প্রথা। যা কার্যত পতিতাবৃত্তি। নারীরা এক দিনের জন্য কিংবা এক সপ্তাহ বা এক মাসের জন্য বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন দেশিবিদেশি পুরুষের সঙ্গে। এ জন্য পান নির্দিষ্ট অঙ্কের টাকা। বিয়ে পড়ান যে মোল্লারা, তারা দেশিবিদেশি পুরুষদের জন্য নারী খুঁজে দেওয়ার কাজও করেন।
মেয়েদের খতনার জন্য পুরুষশাসিত সমাজের কুৎসিত ধারণা সম্ভবত বেশি দায়ী। মনে করা হয়, খতনা দেওয়া হলে মেয়েদের স্পর্শকাতরতা হ্রাস পাবে। দৈহিক ক্ষেত্রে পুরুষদের আধিপত্য বজায় থাকবে। এ মানসিকতার জন্যই যুগ যুগ ধরে কুপ্রথাটি বৈধ হয়ে বিরাজ করছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থাসহ সভ্য সমাজের চাপে কোনো কোনো দেশে এ কুপ্রথা নিষিদ্ধ ঘোষিত হলেও কার্যক্ষেত্রে এটি টিকে আছে বহাল তবিয়তে। সংশ্লিষ্ট অনেক দেশে শিক্ষাদীক্ষার ব্যাপক বিস্তার ঘটলেও মেয়েদের খতনা নামের বর্বর প্রথার অবসান ঘটেনি। এসব দেশের অনেক পরিবার ইউরোপ-আমেরিকায় বসবাস করছে। পশ্চিমা দুনিয়ার অগ্রসর মানুষের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে তারা জীবনধারণও করছে। কিন্তু তাদের মধ্যেও টিকে রয়েছে কুসংস্কার। ফ্রান্সে মেয়েদের খতনা মারাত্মক অপরাধ হিসেবে বিবেচিত। এ জন্য কঠোর শাস্তির ব্যবস্থাও রয়েছে। কিন্তু তারপরও সে দেশের সরকার আফ্রিকীয় প্রবাসীদের খতনাপ্রথা নিরুৎসাহিত করতে পারেনি।
আফ্রিকায় এইডস রোগ ভয়াবহভাবে বিস্তার লাভ করার পেছনেও দায়ী কুসংস্কার। উগান্ডা ও পার্শ্ববর্তী দেশগুলোতে বিশ্বাস করা হয় এইডস তেমন কোনো রোগই নয়। তাদের বিশ্বাস কুমারীদের সঙ্গে দৈহিক সম্পর্ক পাতালে এ রোগ থেকে রক্ষা পাওয়া যায়। এ কুসংস্কার বা অন্ধবিশ্বাস প্রতি বছর হাজার হাজার কুমারীকে এইডসের শিকার হতে বাধ্য করছে। মেয়েদের খতনার মতোই আরেকটি ঘৃণিত পদ্ধতি কুমারীত্ব পরীক্ষা। আফ্রিকার বহু দেশে বিভিন্ন উপজাতির মধ্যে ঘটা করে কুমারীত্ব পরীক্ষা করা হয়। সে পরীক্ষায় উত্তীর্ণদের সার্টিফিকেটও দেওয়া হয়।
দক্ষিণ আফ্রিকার ডারবান শহরে ১৯৯৮ সালে প্রতি বছরের মতো কুমারীত্ব পরীক্ষার নামে উৎসবের আয়োজন করা হয়। এতে কোরামান্ড উপজাতির ৩০০ মেয়ে অংশ নেয়। তাদের পরনে ছিল পুঁতির মালা দিয়ে তৈরি মিনি স্কার্ট। ৩০০ মেয়েকে মাটিতে শুয়ে পড়তে বলা হয়। শত শত লোকের সামনে পরীক্ষক প্রতিটি মেয়েকে পরীক্ষা করে জানান দেন সে কুমারী আছে কিনা। বুড়ো আঙুল উঁচিয়ে কুমারীত্বের খবর জানাতেই সমবেতরা হাততালি দিয়ে উল্লাসের প্রকাশ ঘটায়। কুমারীত্ব পরীক্ষায় উত্তীর্ণদের বিয়ের বাজারে নাকি যথেষ্ট দাম দেওয়া হয়। শ্বশুর-শাশুড়ির কাছ থেকে যৌতুক আদায়ে এটি একটি মূল্যবান উপাদান হিসেবে কাজ করে। নারীত্বের জন্য অবমাননাকর হলেও অনেক আফ্রিকান মেয়ের ধারণা, এটি একটি ভালো প্রথা। কুসংস্কার আর কাকে বলে।
লেখক : সিনিয়র সহকারী সম্পাদক, বাংলাদেশ প্রতিদিন
ইমেইল : [email protected]