রাস্তার পাশে একটি পুরনো বাড়ি। দেয়াল হেলে পড়েছে। রং মরে গেছে। ছাদ থেকে পলেস্তারা খসে খসে পড়ছে। রাস্তা দিয়ে কত মানুষ আসে যায়। কারও চোখে পড়ে না। চোখে পড়লেও কারও মনে দাগ কাটে না। দাগ কেটেছে এক ভিখারির। বাড়ির সামনে এসে দাঁড়ালো সে। ভাঙা দেয়াল, খসে পড়া সিমেন্ট দেখে বুকটা হু হু করে উঠল। কোথায় বাড়িওয়ালা। কোথায় ঘরের বাসিন্দারা। এ বাড়িতে এক দিন হাসির উচ্ছ্বাস ছিল। ভাইয়ে ভাইয়ে মিল ছিল। বোনে বোনে ভাব ছিল। স্বামী-স্ত্রীর প্রেম ছিল। বাবা-মায়ের দোয়া ছিল। এখন বাড়িটি খাঁ খাঁ করছে। মনে হয়, ভাইয়ে ভাইয়ে ঝগড়া করে দূরে চলে গেছে। বাড়িতে এখন কেউ আসে না। কখনো যদি আসে ঝগড়া করে ভাঙা ঘরখানি আরও ভেঙে দিয়ে যায়। ভিখারির শূন্য থালার মতো প্রেমহীন বাড়িটি কী যেন খোঁজে। কাকে যেন ডাকে। বাড়ির মুখ নেই। তাই সে বলতে পারে না। তার দেয়াল আছে। তাই দেয়াল হেলিয়ে, ছাদ ধসিয়ে সে বলতে চায়, প্রেমের বন্ধন না থাকলে ঘর থাকারও প্রয়োজন নেই। প্রেমহীন ঘর কবরের মতো।
সত্যি কিছু কিছু কবর ভাঙা ঘরের চেয়েও একা। বিশেষ করে দুনিয়ায় যদি কেউ প্রেমের মেলা সাজিয়ে যায়, আর মৃত্যুর পর সে মেলা ভেঙে বিভেদের খেলায় জড়িয়ে পড়ে তার সন্তানরা, তখন ওই কবরওয়ালার অন্তর কাচের মতো ভেঙে চৌচির হয়ে যায়। হজরতজি মাওলানা ইলিয়াস কান্ধলভির (রহ.) দিলের অবস্থাও এখন ফেটে যাওয়া ডালিমের মতো রক্তাক্ত। রশিদ আহমদ গাঙ্গোহী, আশরাফ আলী থানবীর মতো শায়েখদের সোহবতে থেকে দীনের প্রতি তার যে দরদ জেগেছে, তাবলিগের মেহনতের মাধ্যমে সে দরদের ফুল ফুটিয়েছেন ভারতের মেওয়াতের জমিনে। মালির দরদ আর মালিকের রহমত যখন ফুলের ওপর পড়ে, সে ফুল তখন আর সাধারণ ফুল থাকে না। তা হয়ে যায় বিশ্ব ফুল। তার সৌরভ ছড়িয়ে পড়ে বিশ্বময়। সাধারণ ফুল সময়ের ব্যবধানে মরে যায়। পচে যায়। মিশে যায়। এ ফুল যতই সময় গড়ায় ততই তাজা হয়, বড় হয়, রং ছড়ায়, রং লাগায়। আজ থেকে ১০৪ বছর আগে হজরতজি ইলিয়াস কান্ধলভি মেওয়াতের জমিনে তাবলিগ নামক যে প্রেমের ফুল ফুটিয়েছিলেন, সে ফুলের সৌরভে এখন বিশ্ব মাতোয়ারা। দুনিয়ার যেখানেই ইসলাম আছে, কোরআন আছে, নবী আছে, সেখানেই হজরতজির তাবলিগ আছে। প্রেম আছে। ভ্রাতৃত্ব আছে। জিকির আছে। ফিকির আছে।
ভাইয়ে ভাইয়ে দ্বন্দ্ব। স্ত্রীর সঙ্গে দুর্ব্যবহার। মায়ের সেবা করে না। বাবার কথা শুনে না। সুদ-ঘুষের সঙ্গে জড়িত। জেনা-ব্যভিচার-মদের আড্ডা সবকিছুতেই ডুবে থাকে-এমন যুবকও তাবলিগের ছোঁয়ায় আমূল বদলে যায়। মুখে দাঁড়ি, মাথায় টুপি, মিষ্টি ব্যবহার, হালাল কামাই, আত্মীয়তা রক্ষা সবদিকেই তার ফুলের সৌরভ। হজরতজির সাজানো বাগানের এই তো সফলতা। হায়! আজ আমাদের দেশে কী হলো! হজরতজির বাগানে কীভাবে পেঁচা ঢুকল। একে একে সব ফুল ঝরে গেল। কমে গেল। শেষ হয়ে গেল। প্রেম মরে গেল। দীন হারিয়ে গেল। হিংসা বাসা বাঁধল। হানাহানি এসে জড়ো হলো। মারামারি সব শেষ করে দিল।
হজরতজির জীবনী আলোচনা করতে গিয়ে আলী নদভী লিখেছেন, সর্বক্ষণ দীনের ফিকিরে থাকতেন তিনি। যারা মাদরাসায় পড়ে না, আলেমদের সোহবতে আসার সুযোগ হয় না, এমন মানুষগুলোর দিলে কীভাবে আল্লাহ ঢোকানো যায়, নবীর ইশক জাগানো যায়, সে ফিকির করতেন তিনি। অনেক ভেবেচিন্তে নূর নবীজির নির্দেশ পেয়ে ১৯২০ সালে মেওয়াতে শুরু করেন তিনি তাবলিগের মেহনত। তার মেহনতের উদ্দেশই ছিল আলেম ও সাধারণ মানুষের মাঝে দূরত্ব ঘুচিয়ে দেওয়া। এজন্য মাদরাসার আলেমকে নিয়ে গেছেন খেতের মানুষের কাছে। আর খেতের মানুষকে নিয়ে এসেছেন আলেমের কদমে। প্রশ্ন উঠেছিল, সাধারণ মানুষ কি দাওয়াতের মেহনতের উপযোগী? জবাবে বলা হয়েছে, এ লোকগুলো ধর্মের জটিল মাসয়ালা নিয়ে মানুষের দুয়ারে যাবে না। তারা দীনের মৌলিক দাওয়াত নিয়ে মানুষের দুয়ারে যাবে। ইমান, নামাজ, রোজা, জিকির, ইকরামুল মুসলিমিন এ মৌলিক বিষয়গুলোই তাবলিগের আলো। সে আলো হাতে আলেম-সাধারণ মানুষ সবাইকে ছুটতে হবে অন্যের কাছে। ভাইয়ের কাছে। বোনের কাছে। মুসলমানের কাছে। অমুসলমানের কাছে। সবার কাছে। শুরু করেছিলাম পুরনো ঘরের গল্প দিয়ে। ঘরটি আসলে তাবলিগ জামাত। ঘরটি আসলে তুরাগতীরের প্রেমের ইজতেমা। যে ঘরে একসময় আলো ছিল। প্রেম ছিল। ভাইয়ে ভাইয়ে দরদ ছিল। এখন সেখানে আলো নেই। প্রেম নেই। দরদ নেই। প্রেমহীন তাবলিগের এ ভাইদের দেখে কবরে ফুঁপিয়ে কাঁদছেন মেওয়াতের মাওলানা ইলিয়াস কান্ধলভি (রহ.)। হে তাবলিগের কাণ্ডারিরা! আর মানুষ হাসাবেন না। আর হজরতজিকে কাঁদাবেন না। নবীজিকে কষ্ট দেবেন না। আসুন দীনের স্বার্থে সবাই এক হই। নেক হই। তাবলিগের ভাঙা ঘরটি আবার মেরামত করি। হজরতির বাগানে আবার চোখের পানি ঢেলে নেকের ফুল ফোটাই। ইজতেমার প্রেম, তাবলিগের সৌরভ আবার বিশ্বের আনাচে-কানাচে ছড়িয়ে দিই। আল্লাহ আমাদের কবুল করুন। আমিন।
লেখক : প্রতিষ্ঠাতা প্রিন্সিপাল, সেইফ এডুকেশন ইনস্টিটিউট, পীরসাহেব, আউলিয়ানগর
www.selimazadi.com