বিশ্ব ইজতেমায় পৃথিবীর বিভিন্ন দেশের অনেক মেহমান বাংলাদেশে আসেন নগদ ফায়দা তথা নেকির আশায়। বলা হয়, দুটি কারণে বাংলাদেশের পরিচিতি বিশ্বে গড়ে উঠেছে। এর একটি তাবলিগ জামাতের বিশ্ব ইজতেমা। দ্বিতীয়টি ক্রিকেট খেলা। ইজতেমা চলাকালীন এখানে কোনো মুসল্লি মারা গেলে এ মৃত্যুকে শহীদি মৃত্যু বলে। ধর্মের জন্য বের হয়েছেন, অধিকন্তু তার জানাজায় হাজারো মানুষ অংশ নিয়ে দোয়া করেন। যুগ যুগ ধরে তাবলিগ জামাতের এ পরিশ্রম মুসলিম সমাজে একটি প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো ধারণ করেছে। অনেক মতভেদ থাকা সত্ত্বেও ধর্মপ্রাণ সাধারণ মানুষ তাবলিগ জামাতকে পছন্দ করে। মূলত এখানে কালেমার দাওয়াত দেওয়া হয়। হাতেকলমে ইসলামের মৌলিক বিষয়ে চর্চা করা হয়। একত্ববাদের গভীরতা মানুষের মনে জাগিয়ে তোলার মেহনত করে তাবলিগ জামাত। মানুষের মনে একত্ববাদ, ইমান ও আকিদাকে আরও মজবুত করার একটি প্রক্রিয়া। ভালো কাজের পুরস্কার এবং মন্দ কাজের আজাব ও পরকালে বেহেশত-দোজখ সম্পর্কিত গভীর জ্ঞানবিশ্বাস শিক্ষা দেয় তারা। কয়েকটি মূল বিষয়ের ওপর পরিচালিত হয় এ দাওয়াতের কাজ। এগুলো হলো : ইমান, নামাজ, এলেম ও জিকির, ইকরামুল মুসলেমিন, সহি নিয়ত ও তাবলিগ। আল্লাহ প্রদত্ত কোরআনের আদেশ ও হজরত মুহাম্মদ (সা.)-এর জীবনদর্শন সঠিকভাবে পালন করা ও মেনে চলা। একজন মুসলিমের প্রতিদিনের নামাজ, রোজা, হজ, জাকাত পালনসহ জীবনে শুদ্ধভাবে ধর্মপালনের জন্য একসঙ্গে ৪০ দিন সময় ব্যয় করতে বলা হয়। বাৎসরিক কর্মপদ্ধতি স্থির করাসহ মুরুব্বিদের পরামর্শ মোতাবেক বিশ্ব ইজতেমা থেকে নতুন জামাতবন্দি হওয়া, দিন-সময় ঠিক করা। স্থান, মাঠ, তাঁবু, বাঁশ-খুঁটি ইত্যাদি স্বেচ্ছাশ্রম ও দানে পরিচালিত হয়। অপ্রয়োজনে কারও কাছে হাত পাতা এদের দর্শনের পরিপন্থি। ইজতেমা মাঠে স্বেচ্ছাসেবক যুব-বৃদ্ধ এক কথা, ‘জেকেরে-ফিকিরে চলুন’। তাদের ব্যবহৃত কয়েকটি প্রচলিত শব্দ যেমন আমির, রাহাবার, দাওয়াত, হেদায়েত ও দোয়া। দীন প্রচারে শহর-বন্দর-গ্রামজুড়ে মারকাজ মসজিদ প্রতিষ্ঠা আম মুসল্লিদের কাছে বেশ পরিচিত স্থান। যা এ কাজের পরিচালনা সহজ করে দেয়। সব স্তরে কেন্দ্রীয় মজলিসে সুরার পরামর্শ ও মতামতের ভিত্তিতে তাবলিগ জামাতের কাজ পরিচালিত হয়। মুরুব্বিদের পরামর্শের ভিত্তিতে একজন মুরুব্বি যে পরামর্শ ও ফয়সালা দেন সবাই তা মেনে চলেন। এভাবে জামাতবন্দি মানুষ দেশবিদেশের বিভিন্ন স্থানে, মসজিদে গমন করেন। জেলা-উপজেলায় মারকাজ মসজিদগুলো যোগাযোগে বিশেষ ভূমিকা পালন করে। গায়ে পড়ে ঝগড়া না করা তাদের অন্যতম বৈশিষ্ট্য। পথে কোনো বাধা এলে তারা পারস্পরিক আলোচনা করে সমাধা করেন। এটি নিজের শ্রম, সময় ও অর্থ দ্বারা হাতেকলমে জ্ঞান অর্জন ও নিজেকে পরিশুদ্ধ করার একটি অন্যতম পন্থা। বিশ্ব ইজতেমার আখেরি মোনাজাত ঢাকায় ধনী-গরিব, অভিজাত-শ্রমিক, ছাত্র-যুব সব মানুষের মহামিলন। কাঠামোগত দিক থেকে তাবলিগ জামাত আজ একটি সুসংগঠিত ও সুশৃঙ্খল দল। গ্রামের সাধারণ খেটে খাওয়া মানুষ কিছু সময়ের জন্য হাতেকলমে শিক্ষা নিয়ে শুদ্ধভাবে নামাজ-রোজা করার প্রক্রিয়া রপ্ত করেন। বিপথগামী ছাত্র-যুবক জামাতভুক্ত হয়ে মন্দ কাজ পরিত্যাগ করেছে, সমাজে এ রকম অনেক উদাহরণ রয়েছে। শুনেছি, টুইন টাওয়ার ধ্বংসের পর তাবলিগ জামাতের লোক আমেরিকায় দাওয়াতের কাজে ভ্রমণ করেছিলেন। আমেরিকার কাস্টম কর্তৃপক্ষ তাদের দাড়ি-টুপি দেখে সতর্ক হন। তাদের ব্যাগ স্ক্যান করে তাতে লাঠির মতো দণ্ড দেখতে পান। পর্যবেক্ষণ করে দেখা হয়, এটি কাঠের তৈরি দাঁতের ব্রাশ। প্রমাণ হয় যে তারা কোনো বিপথগামী উগ্রপন্থি গ্রুপ নয়।
বর্তমানে এই তাবলিগ জামাতে দেখা দিয়েছে গ্রুপিং, সংকট। কথিত দুটি উপদল ভারতের দিল্লি থেকে মাওলানা সাদ এবং মাওলানা জুবায়েরপন্থি হিসেবে বিভক্ত হয়েছে। দুজনই বিজ্ঞ আলেম। পূর্বে দেখা যেত, জুবায়ের সাহেব সাদ সাহেবসহ বিদেশি মেহমানদের বিভিন্ন ভাষায় প্রদান করা বয়ান বাংলায় অনুবাদ করতেন। তাঁদের মধ্যে সংযোগ ও শিক্ষণ সুযোগ দেখা যেত। আজ সে সুযোগ বন্ধের দ্বারপ্রান্তে। বাদ সাধে দর্শনগত মতভেদ। যেমন কোনো ব্যক্তি এলেম বিক্রি করতে পারবে না। মজলিশে শুরার সিদ্ধান্ত অমান্য করতে পারবে না। কোনো পক্ষ বেশ কঠোর ফতোয়া দিয়ে মানুষের মধ্যে বিভেদ তৈরি করছে ইত্যাদি। আলেম-ওলামারা এই পথ বেছে নিতে চান না। এটি ইসলামের পরিপন্থি। ফলে দ্বন্দ্ব-সংঘাত ও রক্তপাত ঘটছে। কাকরাইল মসজিদ, জেলার মারকাজ মসজিদ, ইজতেমার মাঠ দখলসহ কয়েকটি অঘটন ও রক্তপাত সংঘটিত হয়েছে। দুই পক্ষের মুরুব্বিদের মধ্যে বিভেদের কারণে তাবলিগ জামাতের সবাইকে ভাবনায় ফেলেছে। বর্তমান সরকার এ দ্বন্দ্ব মেটানোর চেষ্টা অব্যাহত রেখেছে, যা বেশ ইতিবাচক।
লেখক : ইসলামবিষয়ক গবেষক