সুন্দর এ পৃথিবীতে আরও কিছুদিন বেঁচে থাকা প্রায় সব মানুষের কামনা। অনন্তকাল বাঁচার বাসনাও পোষণ করেন কেউ কেউ। ‘মরিতে চাহি না আমি সুন্দর ভুবনে, মানবের মাঝে আমি বাঁচিবার চাই’- কবিগুরু রবীন্দ্রনাথের মতো এমন ইচ্ছা পোষণ সহজ। কিন্তু বাস্তবতা ভিন্ন। বিজ্ঞান অনেক অসম্ভবকে সম্ভব করলেও মানুষের মৃত্যুঞ্জয়ী হওয়ার পথ বের করতে পারেনি। তাই বলে বিজ্ঞানীরা যে সে চেষ্টা বিসর্জন দিয়েছেন, তা-ও নয়। মধ্যযুগের খ্রিস্টধর্মের মূলকথা ছিল, ‘মরিয়া অমর হও’। পুরোহিতদের বিশ্বাস ছিল, দেহের বিনাশ সাধন করে আত্মময় জীবনযাপনই মানুষের কর্তব্য হওয়া উচিত। তাদের বিশ্বাস ছিল, দেহ ও আত্মা পরস্পরবিরোধী। কাজেই দেহের ধ্বংসসাধন করেই আত্মাকে মুক্তি দেওয়া সম্ভব। প্রবৃত্তির কবলমুক্ত জীবনকেই তারা কাক্সিক্ষত বলে মনে করতেন। ইসলামের সুফিবাদীরা ইহকালকে দুদিনের মুসাফিরখানা হিসেবে ভাবেন। তাদের মতে, পরকালই আসল জীবন। যে জীবনে রয়েছে অমরতা। ইহকালে পুণ্যের কাজ করলে পরজীবনে জান্নাতে ঠাঁই পাওয়া যায়। অর্জন করা যায় অমরতা। পাপীদের জীবনও অমরতায় ভরা। তবে তা যেমন ভীতিকর তেমন গ্লানিময়। যা কারও কাম্য হতে পারে না।
মানুষমাত্রই মরণশীল এ ধারণা এখনো সুপ্রতিষ্ঠিত। মানুষ দৈহিক মৃত্যুকে মেনে নিলেও সেটি নাকি শেষ কথা নয়। পৃথিবীর সব ধর্মে আত্মার অমরতার কথা বলা হয়েছে। মরণশীল মানুষের জন্য এ এক সান্ত্বনা। বলা হয়, মৃত্যুর মধ্য দিয়ে জড়দেহের পতন ঘটে। আত্মা দেহত্যাগ করলে আসে মৃত্যু। মুসলমান, খ্রিস্টান ও ইহুদিরা মৃত ব্যক্তির সৎকারে কবর দেওয়ার পদ্ধতি অনুসরণ করে। বলা হয়, কবর দেওয়ার পদ্ধতি মানুষ শিখেছে কাকের কাছ থেকে। এ তিনটি ধর্ম অনুসারে দুনিয়ার প্রথম মানবমানবী আদম-হাওয়া। তাদের পুত্র হাবিল ও কাবিল। প্রেমঘটিত ঈর্ষায় কাবিল হত্যা করেন হাবিলকে। ভাইয়ের মৃতদেহ নিয়ে তিনি মহা সমস্যায় পড়েন। এমন সময় দুটি কাকের মধ্যে ঝগড়া বাঁধে। সংঘর্ষে মারা যায় একটি। জীবিত কাকটি ঠোঁট দিয়ে মাটি খুঁড়ে তার সাথিকে মাটিচাপা দেয়। কাবিলও অনুসরণ করেন একই পদ্ধতি।
মুসলমান, খ্রিস্টান, ইহুদিরা মৃত ব্যক্তিকে কবর দেন বিশেষ সম্মানের সঙ্গে। মৃত ব্যক্তিকে সসম্মানে কবর দেওয়ার পদ্ধতি চালু ছিল প্রাচীন মিসরেও। ফেরাউন বা রাজ পরিবারের সদস্যদের কবর দেওয়ার পদ্ধতি ছিল অন্যরকম। মিসরের শাসক ফেরাউন বা ফারাওরা নিজেদের দেবতা বলে দাবি করতেন। মিসরীয়দের বিশ্বাস ছিল, দেবতারা অবিনশ্বর। মৃত্যুর দ্বারা লোকান্তরিত হলেও তা শুধু এ জগৎ থেকে পরজগতে যাওয়া। পরজগতে ফারাওদের প্রভাব-প্রতিপত্তি নিশ্চিত করতে তাদের লাশ দাফনকে কেন্দ্র করে চলত হরেক আনুষ্ঠানিকতা। লাশে যাতে পচন না ধরে সে জন্য রাসায়নিক পদ্ধতি প্রয়োগ করে বানানো হতো মমি। যে মমি রাখা হতো পিরামিডের ভিতর।
পিরামিড তৈরি হতো বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে। মিসরীয়রা রাজা বা রাজপরিবারের সদস্যদের লাশ মমি করে তাদের দেহের অমরত্ব নিশ্চিত করত। পরজীবনে তাদের সেবার জন্য শত শত দাসদাসীকে হত্যা করে একই সঙ্গে কবর দিত। জৈবিক প্রয়োজন মেটাতে দেওয়া হতো সুন্দরী নারী। হতভাগীদের হত্যা করে তাদের লাশ দাফন করা হতো। কবরে দেওয়া হতো খাদ্যদ্রব্য, কাপড়চোপড়, মণিমুক্তা, ধনসম্পদ। এমনকি অস্ত্রশস্ত্র। ১৯৯৭ সালে চীনে আবিষ্কৃত একটি প্রাচীন কবরস্থান প্রমাণ করেছে মৃত্যু-পরবর্তী জীবন সম্পর্কে প্রাচীনকালের মিসরীয় বিশ্বাসের সঙ্গে চীনাদের ধ্যানধারণার মিল ছিল। মিসরীয়দের মতো চীনারাও বিশ্বাস করত কবর দেওয়ার পর দেহ ছেড়ে যাওয়া আত্মারা যদি ফিরে আসে, তখন জীবিত লোকদের মতো মরদেহেরও ভোগবিলাসের চাহিদা থাকবে। চীনের হুনান প্রদেশে খ্রিস্টপূর্ব ৪০০ বছর আগের একটি কবরস্থান আবিষ্কৃত হয়েছে। যেখানে অন্তত ১ হাজার কবর ছিল। এর প্রতিটি কবরে অস্ত্র, গহনাসহ অন্যান্য জিনিসপত্রও পাওয়া গেছে।
মানুষ মৃত্যুর পর জাগতিক বিতর্কের ঊর্ধ্বে চলে যায়। মৃতের প্রতি সম্মান দেখানো ইসলামে অলঙ্ঘনীয় প্রথা। কিন্তু কখনো কখনো এ নিয়মেরও ব্যতিক্রম ঘটে। শিয়ারা হজ পালনকালে একসময় খলিফা হজরত ওমর (রা.) ও হজরত ওসমান (রা.) প্রমুখের কবরের ওপর আবর্জনা ফেলার চেষ্টা করত। তাদের দৃষ্টিতে এটি নাকি মহাপুণ্যের কাজ। উগ্রবাদী সুন্নিরা এখনো হজরত আলী (রা.)-এর মাজারে হামলা চালানোকে পুণ্যের কাজ মনে করে। ধর্ম যখন ধর্মান্ধতার কাছে জিম্মি হয়ে পড়ে তখন এমন অনাচারেরই চর্চা হয়। মমি করার পদ্ধতি চালু হয় আড়াই থেকে ৫ হাজার বছর আগে। মিসরীয়দের মমিপ্রথা এখনো কালের সাক্ষী। লাতিন আমেরিকার ইনকা সভ্যতায়ও লাশ মমি করে রাখার রেওয়াজ ছিল। আধুনিক এ যুগেও লাশ মমি করে রাখার ঘটনা খুব একটা কম নয়। রাশিয়ার অক্টোবর বিপ্লবের নায়ক ভøাদিমির ইলিচ লেনিন। লেনিন মারা যান ১৯২৪ সালে। তাঁর লাশ মস্কোর রেড স্কয়ারে কাচের এক বাক্সে মমি করে রাখা হয়। লাশ রাখা হয় এমনভাবে যা দেখলে মনে হবে হয়তো এই মাত্র লেনিন ঘুমিয়ে পড়েছেন। ঘুমিয়ে আছেন কোট-প্যান্ট পরা অবস্থায়। সোভিয়েত আমলে রেড স্কয়ারের লেনিন মিউজিয়াম ছিল প্রকৃত অর্থে কমিউনিস্টদের এক তীর্থকেন্দ্র। প্রতিদিন দেশবিদেশের হাজার হাজার লোক লেনিনের লাশ দর্শন করত। রাশিয়ায় কমিউনিজমের পতনের পরও লেনিন মিউজিয়াম দেখতে আসা লোকের সংখ্যা খুব একটা কমেনি। লেনিন ছিলেন মননে-মগজে নিরীশ্বরবাদী। সোভিয়েত ইউনিয়ন টিকে থাকা অবস্থায় সমাধিস্থলে তাঁকে শ্রদ্ধা জানানো হতো সমাজতন্ত্রের প্রবক্তা হিসেবে। তবে এখন পারলৌকিকতায় বিশ্বাসী অনেকেই সমাধিস্থলে গিয়ে তাঁর বিদেহী আত্মার শান্তি কামনায় প্রার্থনা করেন। চীনা নেতা মাও সে তুংয়ের লাশও রাখা হয়েছে মমি করে। চীন মাওয়ের কট্টর সমাজতন্ত্রী পথ থেকে সরে এলেও তাঁর প্রতি তাদের শ্রদ্ধাবোধের অবসান ঘটেনি। যে কারণে প্রতিদিনই মাও সে তুংয়ের মমি দেখতে হাজারও লোকের ভিড় জমে।
বিশ্বের এ যাবৎকালের সবচেয়ে দুর্ধর্ষ বীর হিসেবে ধরা হয় চেঙ্গিস খানকে। ১২১৭ সালে ৬৫ বছর বয়সে প্রাণ হারান এ মোঙ্গল বীর। প্রতিপক্ষের হাতে চেঙ্গিসের সমাধির অবমাননা হতে পারে এ ভয়ে তাঁকে কবর দেওয়া হয় গোপনীয়ভাবে। তাঁর লাশের সঙ্গে ব্যক্তিগত জিনিসপত্র, রাষ্ট্রীয় দলিলের পাণ্ডুলিপি, বিভিন্ন শিল্পকর্ম ও সোনার তৈরি জিনিসপত্রও কবর দেওয়া হয়। বলা হয়, চেঙ্গিস খানের সঙ্গে ৪০ জন সুন্দরী রমণী এবং তাঁর পছন্দের ঘোড়াগুলো কবর দেওয়া হয়। পশ্চিম চীনের জিজিয়া প্রদেশ অবরোধের সময় তিনি ঘোড়ার পিঠে থাকা অবস্থায় মারা যান। গোপনীয়তার জন্য তাঁর লাশের শেষকৃত্য শোভাযাত্রার সামনে যাকে পাওয়া গেছে তাকেই হত্যা করা হয়। তবে চেঙ্গিসের এক উত্তরাধিকারী মোঙ্গল শাসক মংকের রেকর্ড আরও জাঁকালো; যার শবযাত্রায় ২০ হাজার লোককে প্রাণ হারাতে হয়। মোঙ্গলদের বিশ্বাস ছিল, এসব লোক এবং জ্যান্ত কবর দেওয়া প্রাণীগুলো পরজীবনে সম্রাটের সেবা করবে। চেঙ্গিস খানের সমাধি আবিষ্কারের চেষ্টা কম হয়নি। এ প্রচেষ্টায় এ যাবৎ শত শত কোটি টাকা ব্যয় হয়েছে। ব্যবহৃত হয়েছে বিমান, হেলিকপ্টারসহ আধুনিক যন্ত্রপাতি। প্রত্নতাত্ত্বিকরা এ জন্য যে কসরত করেছেন তার তুলনা নেই। মজার ব্যাপার হলো, মোঙ্গলরা চেঙ্গিস খানের সমাধিস্থল আবিষ্কারের চেষ্টা কখনো ভালো চোখে দেখেনি। এ ব্যাপারে তাদের কাছ থেকে বিদেশিরা কার্যত কোনো সহযোগিতা পায়নি। মোঙ্গলদের বিশ্বাস, চেঙ্গিসের সমাধিস্থল আবিষ্কৃত হলে তাদের ওপর মহাদুর্যোগ নেমে আসবে। তাদের আস্থা, যত চেষ্টা চলুক কারও পক্ষে গ্রেট খানের সমাধি আবিষ্কার করা সম্ভব হবে না। মিসরীয়দেরও বিশ্বাস ছিল ফেরাউনদের কবর বা মমি নিয়ে ঘাঁটাঘাঁটি একটি অভিশপ্ত কাজ। ফারাওয়ের অভিশাপে অনেক আবিষ্কারক জীবন হারিয়েছেন, এমন কুসংস্কারও রয়েছে।
পারলৌকিকতায় যাদের আস্থা নেই, তারা মৃত্যুর পর লাশ সৎকারের গরজ অনুভব করেন না। ভারতের পশ্চিমবঙ্গের জনপ্রিয় কমিউনিস্ট নেতা কমরেড জ্যোতি বসু ছিলেন তাঁদেরই একজন। তিনি মৃত্যুর আগে উইল করে যান তাঁর লাশ যেন গবেষণার কাজে চিকিৎসাবিজ্ঞানীদের দান করা হয়। জ্যোতি বসু নাস্তিকতায় বিশ্বাসী হলেও তাঁর ব্যবসায়ী পুত্রের আস্থা আস্তিকতায়। তবে বাবার ইচ্ছাকে মূল্য দিতে তাঁর লাশ হাসপাতালে দান করেন। বাংলাদেশের কোনো কোনো ইহলৌকিকবাদীও মৃত্যুর পর তাঁদের লাশ হাসপাতালে দান করার নজির রেখেছেন। তাঁদেরই একজন ড. আহমদ শরীফ। গবেষক হিসেবে যার তুলনা তিনি নিজেই। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এ অধ্যাপক সারা জীবন প্রাচীন পুথিসাহিত্য নিয়ে গবেষণা করেছেন। অন্ধকার থেকে পাদপ্রদীপের নিচে এনেছেন মধ্যযুগের মহামূল্যবান মুসলিম সাহিত্য। ড. আহমদ শরীফ মৃত্যুর পর তাঁর লাশ চিকিৎসকদের গবেষণার জন্য দান করার সিদ্ধান্ত নেন। মৃত্যুর আগপর্যন্ত তিনি ঘনিষ্ঠজনদের মজা করে বলতেন, ধর্মান্ধদের ভয়ে তিনি এমন সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য হয়েছেন। তাঁর ভয়, মৃত্যুর পর গবেষণাধর্মী লেখা পড়ে মোল্লারা হয়তো তাঁকে বড় কোনো পীর ভেবে বসবেন। হয়তো তাঁর কবরকে ওরা মাজার বানিয়ে ব্যবসাও ফাঁদবেন। সে দুর্গতি থেকে রেহাই পেতেই মৃত্যুর পর লাশ যাতে দাফন করা না হয় সেই উইল নাকি করে যান।
হিন্দুধর্মে লাশ সৎকারে দাহ করা হয়। বৌদ্ধ ও শিখদের মধ্যেও চালু রয়েছে অভিন্ন রীতি। পারসিকদের লাশের সৎকারে রয়েছে বিচিত্র নিয়ম। উঁচু টাওয়ার অথবা পাহাড়ের ওপর তারা রেখে দেয় মৃতদেহ। শেষ পর্যন্ত তা শকুনের খাদ্যে পরিণত হয়। মৃতদেহ সৎকারে কবর দেওয়া, শ্মশানে নিয়ে পোড়ানো কিংবা টাওয়ারে রেখে শকুন দিয়ে খাওয়ানো যে পদ্ধতিই অবলম্বন করা হোক, আসল উদ্দেশ্য একটাই। জীবিতের দৃষ্টি থেকে মৃতকে আড়াল করা।
আমরা কেউ মরতে চাই না। তবু মৃত্যু এক অনিবার্য সত্য। মৃত্যুর মধ্য দিয়ে মানবদেহ বিলীন হয়। ধর্মীয় বিশ্বাসমতে, দেহ বিলীন হলেও আত্মার মৃত্যু হয় না। মানুষের মানবিক অবদানেরও রয়েছে অবিনশ্বর সত্তা। জীবদ্দশায় যারা মানুষের কল্যাণে নিজেদের উৎসর্গ করেন, তারা লাভ করেন অমরতা। মৃত্যুর পরও তাদের উপস্থিতি অনুভব করে প্রতিটি মানুষ। মানবজীবনের অমরতা সেখানেই।
লেখক : সিনিয়র সহকারী সম্পাদক, বাংলাদেশ প্রতিদিন