গণতন্ত্র ও মানবাধিকারকেন্দ্রিক ভবিষ্যতের উদ্দেশ্যে বাংলাদেশের অন্তর্র্বর্তী সরকারের ভালো কিছু উদ্যোগের প্রশংসা করেছে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা হিউম্যান রাইটস ওয়াচ-এইচআরডব্লিউ। প্রশংসার সঙ্গে ‘কিন্তু’ যোগ করে বলেছে, ব্যাপক প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার ছাড়া ঐক্যের অগ্রগতি ম্লান হয়ে যেতে পারে। যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক আন্তর্জাতিক সংস্থাটি তাদের ২০২৪ সালের ৫৪৬ পৃষ্ঠার প্রতিবেদনে বাংলাদেশ অংশে বলেছে, আন্তর্জাতিক মানবাধিকার মানদণ্ড অনুযায়ী দেশের প্রতিষ্ঠানগুলোর সংস্কার করা উচিত। বিশ্ব স্বীকৃতির তাগিদও দেওয়া হয়েছে।
পুলিশ, প্রশাসনসহ প্রাতিষ্ঠানিক বেশ কিছু ক্ষেত্রে সংস্কারে ঘাটতি নিয়ে কথা হচ্ছে। এ বিষয়ে একটি অঘোষিত ঐক্য ও আকাক্সক্ষা জনগণের মধ্যে ব্যাপকভাবে লক্ষণীয়। সেই সঙ্গে তাদের মধ্যে আর চুপ না থেকে মুখ খুলে কথা বলার চর্চা শুরু হয়েছে। পদক্ষেপও নিয়ে ফেলছে। যার কিছু নমুনা গত কদিন দেখা যাচ্ছে বিভিন্ন সীমান্ত এলাকায়। যেখানে প্রতিবেশী দেশের কাঁটাতারের বেড়া বা কোনো ধরনের আগ্রাসন টের পাচ্ছে সেখানেই প্রতিরোধ গড়ে তুলছে। দাঁড়িয়ে যাচ্ছে বাংলাদেশের সীমান্তরক্ষী বাহিনী বিজিবির সঙ্গে। এ এক অন্যরকম আবহ। জাতীয় ঐক্যের এক বিস্ময়কর মহড়া।
লক্ষণীয় বিষয় হচ্ছে, সীমান্তে ভারত যত উত্তেজনা সৃষ্টি করছে বাংলাদেশের জনগণ নিজেদের ভূখণ্ড রক্ষায় তত বেশি ঐক্যবদ্ধ হচ্ছে। বিজিবি ও স্থানীয় বাসিন্দাদের শক্ত অবস্থানের কারণে ভারত সীমান্তের নানা জায়গায় কাঁটাতারের বেড়া নির্মাণকাজ বন্ধ রাখতে বাধ্য হয়েছে। চাঁপাইনবাবগঞ্জে যোগ হয়েছে বিজিবি এবং স্থানীয় নাগরিকদের এককাট্টায় দেশাত্মবোধের আরেক মাত্রা। ভারতের সঙ্গে ‘নতজানু’ পররাষ্ট্রনীতি নয়, বরং ‘সাম্যতার ভিত্তিতে’ সরকারকে তা ঠিক করতে প্রকাশ্যে আনুষ্ঠানিক আহ্বান জানিয়েছেন সশস্ত্র বাহিনীর সাবেক সদস্যরা। এর ফল মিলছে। সীমান্তে পিঠ দেখানোর দিন শেষ, বিএসএফকে বুক দেখানো শুরু হয়েছে। একটি অপশক্তির বিদায়ের পর স্বাধীন বাংলাদেশে তা বড় রকমের পাওয়া। সামরিক-বেসামরিক শক্তি এক হলে দেশি-বিদেশি কোনো অপশক্তি বাংলায় আর সুবিধা করতে পারবে না- জনতার এ বার্তা পরিষ্কার।
নিরাপত্তার আধুনিক সংজ্ঞায় ক্ষুদ্র রাষ্ট্র বলতে কিছু নেই। প্রবল জনঐক্য, সশস্ত্র বাহিনীর প্রতি আস্থা ও ভূরাজনৈতিক প্রেক্ষাপটই আসল কথা। জরুরি প্রয়োজন এখন সামরিক এবং বেসামরিক শক্তির এ সেতুবন্ধন অটুট রাখা। ইতিহাসের কথা এখানে স্মরণ করতে হয়। ‘বাংলাদেশ রক্ষা করতে হলে বেসামরিক এবং সামরিক শক্তি একসঙ্গে কাজ করতে হবে’- মজলুম জননেতা মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী এ কথাগুলো বলেছিলেন ১৯৭৫ সালের ৭ নভেম্বরের সিপাহি- জনতার বিপ্লবের অব্যবহিত পরে সামরিক নেতা জেনারেল জিয়াউর রহমান এবং জননেতা মশিউর রহমান যাদু মিয়াকে উদ্দেশ করে। এ ফর্মুলার কারণে ভারতের আধিপত্যবাদী শক্তি সে সময় পরাজিত হয়েছিল। পরে রাজনৈতিক নেতারা সময়ে সময়ে সামরিক বাহিনীর গুরুত্ব বুঝতে অনীহা প্রকাশ করেছেন। যার পরিণতিতে আধিপত্যবাদী শক্তির সঙ্গে মিতালি হয়েছে ফ্যাসিবাদের। অবিরাম ভুগতে ভুগতে হুঁশ ফেরে চব্বিশে এসে। ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্ট মাসে অকুতোভয় ছাত্রদের নেতৃত্বে বিপ্লবে শরিক হলো জনতা। সমর্থন দিল সেনারাও। ম্যাজিকের মতো আধিপত্যবাদী শক্তি এবং ফ্যাসিবাদ কেবল হটেইনি, গোরমুখীও হলো। সেনাবাহিনীর সঙ্গে বাংলাদেশের জনগণের এ সম্পর্কটা টং দোকানের সম্পর্ক নয়। এর ভিত্তি তৈরি হয় একাত্তরে স্বাধীনতা যুদ্ধকালে। সময়ে সময়ে এ সম্পর্কে চিড় ধরিয়েছে দেশিবিদেশি অপশক্তি। চব্বিশের ঘটনা তাদের আবার এককাট্টা করেছে। ছাত্র-জনতা ও সেনাশক্তির শক্ত সেতুবন্ধনে আবার ফিরেছে বাংলাদেশ। সেই বার্তা সেনাপ্রধান জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামানের বয়ানেও মিলেছে। ঢাকা সেনানিবাসের আর্মি মাল্টিপারপাস কমপ্লেক্সে বীর মুক্তিযোদ্ধা সেনাসদস্যদের সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে তিনি বলেছেন, ‘দেশ ও জাতি গঠনের বিভিন্ন কাজে আমরা নিয়োজিত আছি। ইউএন মিশনে বিশ্ব শান্তিরক্ষায় আমরা কাজ করে যাচ্ছি। দুর্যোগে ত্রাণ বিতরণেও কাজ করছি এবং আমরা পারদর্শিতা অর্জন করেছি।’
সেনাপ্রধানের ওই বার্তার দিন তিনেকের মধ্যেই জাতীয় ঐক্যের ডাক প্রধান উপদেষ্টা ড. ইউনূসের। ঢাকার মিরপুর সেনানিবাসস্থ ডিফেন্স সার্ভিসেস কমান্ড অ্যান্ড স্টাফ কলেজ কমপ্লেক্সে ন্যাশনাল ডিফেন্স কোর্স ২০২৪ এবং আর্মড ফোর্সেস ওয়ার কোর্স ২০২৪-এর কোর্স সমাপনী অনুষ্ঠানে সার্টিফিকেট প্রদান শেষে তিনি বলেন, ‘বর্তমানে বাংলাদেশ কঠিন সময় পার করছে, অতীতের যে কোনো সময়ের চেয়ে সবাইকে ঐক্যবদ্ধ থাকা প্রয়োজন।’ এরপর তিনি সংলাপ শুরু করেন রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে। এর কয়েক দিন পর ঢাকার বাইরে রাজবাড়ীতে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর একটি পদাতিক ব্রিগেড গ্রুপের শীতকালীন ম্যানুভার অনুশীলন অনুষ্ঠানেও প্রধান উপদেষ্টার কয়েক লাইন বক্তৃতার মাঝেও ছিল স্পষ্ট ও সূক্ষ্ম বার্তা। সেখানে ড. মুহাম্মদ ইউনূস বলেছেন, দেশের সম্মান ও গৌরব রক্ষায় জনগণের পাশে থেকে কাজ করে যাচ্ছে সেনাবাহিনী।
ছাত্র-জনতা, সেনাবাহিনী এবং ড. ইউনূস একত্রে কাজ করলে দেশের ইমেজের সঙ্গে প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার যে হতে বাধ্য তা বুঝতে বিশাল বুদ্ধিজীবী হওয়া লাগে না। সেনানিবাস থেকে জাতীয় ঐক্যের ডাক আর যমুনা থেকে সংলাপের বিশেষ গুরুত্ব সচেতন মহল আঁচ করছে ভালোভাবে। আধিপত্যবাদী শক্তি ও তাদের খাস পছন্দের শক্তি তা বোঝে আরও আগে। জেনারেল ওয়াকার তো জানিয়েই দিয়েছেন, ‘২০২৫ সালে আমরা একটা দীর্ঘস্থায়ী শান্তির পথে যেতে চাই। সে জন্য সবাইকে একসঙ্গে চলতে হবে।’
এমন স্পষ্ট বার্তার পর বোঝার আর অবশিষ্ট থাকে না। জাতীয় স্বার্থে এমন ঐকমত্য থাকলে কেবল গণতন্ত্রই স্থায়ী নয়, সংস্কার প্রশ্নে হিউম্যান রাইটস ওয়াচের বিশ্ব স্বীকৃতির বিষয়েও নিশ্চিন্ত থাকা যাবে। তখন নিশ্চয়ই দেশে ফ্যাসিস্ট সৃষ্টির পথ বন্ধ হবে। জন্ম নেবে না আরেকটা শেখ হাসিনা, আজিজ, তারিক, বেনজীর, হারুন ইত্যাদি। ভোটবিহীন, নৈশ এবং ডামি নির্বাচনে আপ্লুত হওয়ার রোগ থাকবে না। এমপিদের শুল্কমুক্ত গাড়ির সিসি, রাজউকের প্লটের সাইজ বাড়বে না। অবসর থেকে ডেকে এনে গাড়িবাড়ি, বেতন-ভাতা দিয়ে চুক্তিতে কাউকে আনতে হবে না। ‘চোরের খনি’ খনন বন্ধ হবে। রসেবশে তেলেঝোলে পুষ্পদর্শনে লালায়িতদের যবনিকা ঘটবে। মোট কথা মানুষ যে কারণে অতিষ্ঠ হয়ে ছাত্রদের এক ডাকেই শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে রাস্তায় নেমেছিল, সেই কারণগুলো দূর হবে।
সামনে নির্বাচন অপেক্ষমাণ। নির্বাচন নিয়ে জনমনে আকাক্সক্ষার সঙ্গে উদ্বেগ রয়েছে। আশার আলোও ফুটে উঠছে। একটি অন্তর্র্বর্তী সরকারের অধীনে সেনাবাহিনীর সহায়তায় একটি সুষ্ঠু, অবাধ এবং নিরপেক্ষ নির্বাচন আদৌ সম্ভব কি না, তা নিয়ে আলোচনা ও তর্কবিতর্ক আছে। এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতা, সেনাবাহিনীর ভূমিকার যৌক্তিকতা এবং এর সম্ভাব্য ইতিবাচক ও নেতিবাচক প্রভাব। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে সেনা সহায়তায় সুষ্ঠু নির্বাচনের উদাহরণে মিসরের কথা আসে। ২০১৪ সালে দেশটিতে সাধারণ নির্বাচনে সেনাবাহিনী উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রাখে। ২০১৯ সালে থাইল্যান্ডে অন্তর্র্বর্তী সরকারের অধীনে সেনাবাহিনীর সহায়তায় শান্তিপূর্ণ নির্বাচন হয়।
সেনাবাহিনীর সহায়তায় সুষ্ঠু-গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের দৃষ্টান্ত বাংলাদেশেও রয়েছে। সেনাবাহিনী সব সময় একটি শক্তিশালী ও নিরপেক্ষ প্রতিষ্ঠান হিসেবে পরিচিত। ভোটার তালিকা হালনাগাদ, নির্বাচনি সামগ্রী পরিবহন এবং ভোটকেন্দ্রের নিরাপত্তা নিশ্চিতে তাদের প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা প্রমাণিত। জনগণের পাশাপাশি রাজনৈতিক দলগুলো নির্বাচনে সহযোগিতা করলে সেনাবাহিনীর সহায়ক ভূমিকা গণতন্ত্রের জন্যও সহায়ক হয়।
এখানে ভূরাজনীতি ও বিশ্ববাস্তবতাও একটা ফ্যাক্টর। এর বাইরে বাংলাদেশে ফ্যাসিস্ট শাসক নানা ক্রিয়াকর্মে নিজেও তার নিজের পতন দ্রুত নিশ্চিত করেছে। যা প্রকারান্তরে গণতন্ত্রসহ বিভিন্ন সূচকে বাংলাদেশকে এগিয়ে যাওয়ার সময় ও পথ রচনা করে দিয়েছে। প্রতিবেশী দেশ ভারতে উগ্র হিন্দুত্ববাদের থাবা ছড়িয়ে পড়েছে। সেখানকার শাসক গোষ্ঠী রাজনৈতিক কারণে এ অবস্থায় এনে ছেড়েছে দেশটিকে। এখন এর জের ভুগতে হচ্ছে গোটা ভারতকে। বলিউড অভিনেতা সাইফ আলী খানকে অজ্ঞাত এক যুবকের ছুরিকাঘাতে রক্তাক্ত অবস্থায় মুম্বাইয়ের লীলাবতী হাসপাতালে ভর্তি করানো হয়েছে। এ ঘটনায় ভারতের নিরাপত্তা বাহিনী, হিন্দুত্ববাদী উগ্র সংগঠন লরেন্স বিশ্নোই গ্যাংয়ের যোগসূত্রসহ অনেক বিষয় সামনে আসছে। হামলার টার্গেটে হয়ে আছেন শাহরুখ খানও। এর আগে সালমান খানকে গুলি, পাঞ্জাবি গায়ককে হত্যাসহ বেশ কিছু ঘটনার পেছনে উগ্র হিন্দুত্ববাদী ও মাফিয়া গ্যাংয়ের সম্পৃক্ততার জেরে ভারতে শোরগোল পড়ে যায়। ভারত বাংলাদেশেও এ রকম একটা অবস্থা করার হেন চেষ্টা নেই, যা না করেছে। তাদের এই অপচেষ্টা চরমভাবে ভন্ডুল হয়েছে।
এখানে উগ্র মৌলবাদী শক্তির উত্থানের তকমা লাগিয়ে অপপ্রচারে লিপ্তরা এখন এসব ঘটনায় নিশ্চুপ। এ পথে ব্যর্থ হয়ে তারা এখন অপেক্ষমাণ সীমান্তে খোঁচাখুঁচির। সেখানেও সীমান্তবাসীসহ বাংলাদেশের মানুষের অনন্য উচ্চতার সতর্কতা ও ভূমিকা ইতিহাস হয়ে থাকবে। জানুয়ারি বিশে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প শপথ নিলে ভারতের সমর্থনে ফ্যাসিস্টরা মাঠে নেমে অন্তর্বর্তী সরকারের গদি উল্টে দেবে, অনেক রক্তে অর্জিত অভ্যুত্থান বুমেরাং করে দেবে, সেই আশায় অপেক্ষমাণরাও চুপসে গেছে। এ পরিস্থিতিতে সেনা-জনতা-ছাত্রসহ সব মহলের জাতীয় ঐক্য ও বাংলাদেশের এগিয়ে যাওয়ার এক সোনালি সময়।
লেখক : সাংবাদিক-কলামিস্ট