জিয়াউর রহমান তাঁর পিতা-মাতা এবং অন্য সব পূর্বপুরুষের সঙ্গে সম্পর্কিত ‘জেনেটিক’ কারণেই দৃঢ় আত্মবিশ্বাস, খাঁটি দেশপ্রেম ও আত্মমর্যাদাবোধ আর তাঁর নিজ দেশবাসীর জন্য সর্বদা ন্যায়বিচার কায়েমের এবং আপন মাতৃভূমির হিমালয়সম সমৃদ্ধ প্রত্যাশী এক ব্যক্তিত্ব হয়ে গড়ে উঠছিলেন। তাঁর বড় পুঁজি ছিল অপরিসীম শ্রমদানের ক্ষমতা আর দেশ ও দেশবাসীকে ভালোবাসার অপরিমেয় ইচ্ছাশক্তি।
তাঁর ঘরোয়া নাম ‘কমল’, মানে পদ্ম ফুল, তাঁর জীবনটাও ছিল ফুলের মতো পবিত্র। সৎ সাহসের প্রতীক আর জীবনভর নির্লোভ এক কর্মবীর থাকার অঙ্গীকারের বিরল ব্যক্তিত্ব বলা যায় জিয়াকে। নিপীড়িত খেটে খাওয়া মানুষের তথা মধ্যবিত্ত ও নিম্ন-মধ্যবিত্তের জীবনসংগ্রামের এবং সার্বিক শোষণমুক্তির পথপ্রদর্শক ছিলেন তিনি।
আজ (১৯ জানুয়ারি) মহান নেতা জিয়াউর রহমানের ৯০তম জন্মদিন বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদের রাজনীতির স্থপতি জিয়াউর রহমান দুনিয়ার বুকে বাংলাদেশকে অনন্য উচ্চতায় নিয়ে যাওয়ার প্রথম কারিগর ছিলেন, তাই তিনি জাতীয় নেতা ও সফল রাষ্ট্রনায়ক। সাধারণ এক দেশপ্রেমিক নাগরিকের অবস্থান থেকে অনন্য মেধা ও পরিশ্রম বিনিয়োগে তিনি মুসলিম বিশ্বের নিপীড়িত মানুষের লড়াইয়ে নিজেকে ক্রমশ সবচেয়ে শক্তিশালী অবস্থানে নিয়ে গেছেন।
বগুড়ায় পূর্বপুরুষদের বাড়ি হলেও জিয়াউর রহমান, যাঁর জন্ম ১৯৩৬ সালে, রসায়নবিদ পিতার কর্মস্থলের সূত্রেই প্রথমে কলকাতা ও পরে করাচি নগরীতে উন্নতমানের স্কুলে শিক্ষা লাভের সুযোগ পেয়েছিলেন চল্লিশ ও পঞ্চাশের দশকে। করাচির মাধ্যমিক স্কুলে মেধার বিবেচনায় ও বিদ্যাচর্চায় সুনাম অর্জন করেন তাঁর শিক্ষকদের প্রিয় ছাত্র হিসেবে। ১৯৫৩ সালে তিনি করাচির বিখ্যাত ডি জে সায়েন্স কলেজে বিজ্ঞান শাখায় উচ্চমাধ্যমিক ক্লাসে অধ্যয়নের সময়েই পাকিস্তান সামরিক বাহিনীর কাকুল মিলিটারি একাডেমিতে অফিসার-ক্যাডেট (কমিশন্ড অফিসারের প্রশিক্ষণকালীন প্রাথমিক ধাপ) হিসেবে যোগ দেন।
এই সময়টাতে তিনি পাকিস্তান জাতীয় পরিষদের অধিবেশন দেখতে নিয়মিত সেখানে যেতেন। এসব কিছু জিয়াউর রহমানের পরবর্তী-জীবনে অসামান্য দেশপ্রেমিক নাগরিক রূপে বেড়ে ওঠার ক্ষেত্রে ভূমিকা রাখে। খুবই যৌক্তিক সেই সময়টাতেই তাঁর ভিতরে পূর্ব বাংলার বাঙালিদের প্রতি পশ্চিম পাকিস্তানি নয়া-উপনিবেশবাদী শাসক-শোষক গোষ্ঠীর নিপীড়নের প্রতি সামরিক অফিসার জিয়ার প্রতিবাদী-চেতনা গড়ে উঠতে থাকে।
১৯৫৪ সালের নির্বাচনে পূর্ব বাংলায় হক-ভাসানী-সোহরাওয়ার্দীর নেতৃত্বাধীন যুক্তফ্রন্ট বিপুলভাবে বিজয়ী হলে পশ্চিম পাকিস্তানের (তৎকালীন) অ্যাবোটাবাদের সেনা-ছাউনির একাডেমি ক্যাফেটেরিয়ায় জিয়া অন্য সব বাঙালি ক্যাডেটদের নিয়ে নির্বাচনি বিজয় উৎসব করেছিলেন। তাঁর নিজের লেখার ভাষায়- ‘এ ছিল আমাদের বাংলা ভাষার জয়, এ ছিল আমাদের অধিকারের জয়, এ ছিল আমাদের আশা-আকাঙ্ক্ষার জয়, এ ছিল আমাদের জনগণের, আমাদের দেশের এক বিরাট সাফল্য।’
জিয়া পাকিস্তান সামরিক বাহিনীতে যখন তরুণ-যুবা অফিসার (লেফটেন্যান্ট, ক্যাপ্টেন বা মেজর), যখন তিনি প্রশিক্ষক ছিলেন তিনি পূর্ব বাংলার বাঙালি ক্যাডেট-অফিসারদের, প্রায়ই বলতেন- ‘আমরা কোনো অংশেই পশ্চিম পাকিস্তানি ক্যাডেটদের চেয়ে অনগ্রসর নই, প্রকৃতপক্ষে আমরা তাদের চেয়েও ভালো করতে পারি, আমাদের প্রতিরক্ষার দায়িত্ব আমাদেরকেই নিতে হবে, পাকিস্তানিরা (তৎকালীন পশ্চিম পাকিস্তানিরা) কখনো আমাদের প্রতিরক্ষার জন্য এগিয়ে আসবে না।’ বাঙালি ক্যাডেটদের জন্য জিয়ার সেসব কথা ছিল অনেক বড় প্রেরণার উৎস।
ইতিহাসে অল্প কয়েকজন সামরিক অফিসার দেশের জন্য দু-দুটো যুদ্ধে অংশগ্রহণের ও পরে জেনারেল পদে উন্নীত হওয়ার সুযোগ পেয়েছেন- তাঁদের একজন জিয়াউর রহমান। ১৯৬৫ সালে জিয়াউর রহমান পাকিস্তান-ভারত যুদ্ধে এবং ১৯৭১ সালে মাতৃভূমি বাংলাদেশের স্বাধীনতাযুদ্ধে (মুক্তিযুদ্ধে) অংশগ্রহণের মাধ্যমে বিশাল ভূমিকা পালন করেন- যা বাঙালি সামরিক বাহিনীর ইতিহাসে স্বর্ণাক্ষরে লেখার মতো বিষয়।
একাত্তরের ২৫ মার্চ মধ্যরাতে পাক-দখলদার সেনারা যখন মুক্তিকামী নিরীহ বাঙালির ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে গণহত্যা ও ধ্বংসযজ্ঞ শুরু করে চরম নৃশংসতা ও বর্বরতার শক্তি দিয়ে, চট্টগ্রামে অষ্টম ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের সেকেন্ড-ইন-কমান্ড মেজর জিয়াউর রহমান তখন একমুহূর্ত দেরি না করে তাঁর সঙ্গী বাঙালি অফিসার ও সেনা-জওয়ানদের নিয়ে বিদ্রোহ করেন এবং হানাদার পাকিস্তানি সামরিক বাহিনীর বিরুদ্ধে প্রতিরোধযুদ্ধ শুরু করে দেন। সারা দেশের সংগ্রামী মানুষের দিশাহারা দশার মধ্যে প্রায় ৩০০ বাঙালি সেনা ও অফিসার নিয়ে প্রতিরোধযুদ্ধে প্রবল সক্রিয়তার মধ্যে মেজর জিয়া ২৭ মার্চ চট্টগ্রামের কালুরঘাট স্বাধীন বাংলা বিপ্লবী বেতার কেন্দ্র থেকে সেখানকার বেলাল মোহাম্মদসহ অন্যান্য লড়াকু বেতার কর্মকর্তাদের সহযোগিতায় স্বাধীনতার প্রথম ঘোষণাটি দেন।
সৈয়দ নজরুল-তাজউদ্দীনের অস্থায়ী বাংলাদেশ সরকারের অধীনে মেজর জিয়া প্রথমে মুক্তিযুদ্ধের সেক্টর কমান্ডার ও পরে লে. কর্নেল জিয়া ব্রিগেড কমান্ডার (‘জেড’ ফোর্স) হয়ে স্বাধীনতাযুদ্ধের অন্যতম সেরা বীর কমান্ডাররূপে পরিগণিত হন। পরবর্তীকালে স্বাধীন বাংলাদেশে সেনাবাহিনীর পর্যায়ক্রমিক বিভিন্ন দায়িত্ব পালনের পরে সেনাপ্রধান হন। এবং তারও পরে ১৯৭৫ সালের ৭ নভেম্বর সিপাহি-জনতার অভ্যুত্থানে রাষ্ট্রক্ষমতায় অভিষেক ঘটে। এবং একপর্যায়ে ১৯৭৭ সালে প্রেসিডেন্ট হন, আরও পরে সরাসরি জনভোটে নির্বাচিত প্রেসিডেন্ট পদে দায়িত্ব লাভ করেন। জিয়া ১৯ দফা কর্মসূচি দিয়ে বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদের রাজনীতির উদ্বোধন ঘটান এবং তার মাধ্যমে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) প্রতিষ্ঠা করেন। ১৯৭৯ সালে জাতীয় নির্বাচনের মাধ্যমে একটি জাতীয় সংসদ প্রতিষ্ঠার সঙ্গে সঙ্গে সামরিক শাসন প্রত্যাহার করে পরিপূর্ণ গণতন্ত্র কায়েম করেন।
জিয়াউর রহমান স্বেচ্ছাশ্রমে খালকাটা কর্মসূচি চালু করে সেচব্যবস্থা ও নৌপথের উন্নয়নে অসামান্য উদ্যোগ নেন, আলস্যপ্রিয় মানুষকে কর্ম-উদ্দীপনায় উদ্বুদ্ধ করেন। প্রেসিডেন্ট জিয়া চীন ও মধ্যপ্রাচ্যের মুসলিম রাষ্ট্রগুলোর সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্ক দৃঢ়তর অবস্থানে নিয়ে গিয়েছিলেন- তাঁর মেধা ও বুদ্ধিমত্তা প্রয়োগ করে। তিনি ওআইসি শক্তিশালী করতে ভূমিকা রাখেন, সারা দুনিয়ায় কূটনৈতিক অবস্থান শক্তিময় করেন। জিয়ার বিশেষ উদ্যোগেই দেশের কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধি পায়, রপ্তানিমুখী তৈরি পোশাক শিল্পসহ সব ধরনের শিল্প-কারখানা গড়ার ক্ষেত্রে দ্রুত অগ্রগতি হয় এবং মধ্যপ্রাচ্যসহ বিভিন্ন সম্পদশালী রাষ্ট্রে বাংলাদেশের মানবসম্পদ রপ্তানির ব্যাপক সুযোগ সৃষ্টি হয়। জিয়া রাষ্ট্রনায়ক হতে পেরেছিলেন, তাই তিনি দক্ষিণ এশিয়ায় সার্ক প্রতিষ্ঠার স্বপ্নদ্রষ্টা ছিলেন এবং ইরান-ইরাক যুদ্ধ বন্ধে বিশাল কূটনৈতিক উদ্যোগে এগিয়ে গিয়েছিলেন। তাই তো প্রেসিডেন্ট জিয়া বাংলাদেশের ইতিহাসে হাজার হাজার বছর ধরে অমর নায়ক হয়ে থাকবেন।
লেখক : বিএনপির সাবেক তথ্য ও গবেষণা সম্পাদক