রাজশাহী মহানগরীর সবচেয়ে প্রাচীন দালান পদ্মাপাড়ের বড় কুঠি। এই কুঠিকে কেন্দ্র করে ওই এলাকার নামকরণ হয়েছে বড়কুঠি। ব্রিটিশ শাসনামলের পূর্ব থেকেই ব্যবসাবাণিজ্যকে কেন্দ্র করে বাংলাদেশের বিভিন্ন জায়গায় ইউরোপীয়রা এ ধরনের কুঠি তৈরি করেছিল।
রাজশাহী মহানগরীর বড়কুঠি তৈরি করেছিল ওলন্দাজ বা ডাচরা। কুঠিটি নির্মাণের তারিখ জানা যায় না। তবে অষ্টম শতকের প্রথম ভাগে বড়কুঠি ওলন্দাজদের এ অঞ্চলে বাণিজ্যের কেন্দ্র হিসেবে ব্যবহৃত হতো। ১৭৫৭ সালে ইংরেজরা বাংলার ক্ষমতা দখল করলে ওলন্দাজরা মিরজাফরের সঙ্গে ষড়যন্ত্র করে ইংরেজদের ক্ষমতা খর্ব করতে চাইলে ইংরেজদের হাতে তাদের পরাজয় ঘটে। এরপরও তারা রাজশাহী অঞ্চলে কিছু দিন রেশম ব্যবসা করেছিল। রাজশাহীতে ওলন্দাজদের বড়কুঠি কেনে ইংরেজ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি। কোম্পানির একজন প্রতিনিধি বসবাস করতে আরম্ভ করেন বড়কুঠিতে। ১৮৩৩ সালে ওলন্দাজরা চলে গেলে বড়কুঠি ইংরেজদের মালিকানায় চলে আসে। ১৮৩৫ সালে বড়কুঠি মেসার্স রবার্ট ওয়াটশন কোম্পানির হাতে যায়। রবার্ট ওয়াটসন কোম্পানি রাজশাহী ও সরদহের কুঠিবাড়ি কিনে নেয়। রেশম ও নীল ব্যবসা নির্ভর করে রাজশাহী হয়ে ওঠে একটা সমৃদ্ধ নদীবন্দর। এখান থেকে প্রচুর রেশম ও নীল বিদেশে চালান হতে থাকে।
ইউরোপীয় বাজারে বাংলার রেশম বিদেশি রেশমের সঙ্গে প্রতিযোগিতায় পরাজিত হয় এবং ১৮৫৯-৬০ সালে নীল বিদ্রোহ সংঘটিত হওয়ার কারণে বাণিজ্যিক শহর হিসেবে রাজশাহীর অবনতি ঘটে। ১৮৯০ সালে জার্মানিতে হিউম্যান খুব সস্তায় কয়লা থেকে নীল তৈরির কৌশল আবিষ্কার করে। এর ফলে নীলগাছের পাতা থেকে নীল রং তৈরি আর লাভজনক থাকে না।
রবার্ট ওয়াটসন কোম্পানির কাছ থেকে বড়কুঠি ও তার সংলগ্ন সম্পত্তি মেদিনীপুর জমিদারি কোম্পানি কিনে নেয়। এই জমিদারি কোম্পানিও ছিল ইংরেজদের। এই কোম্পানি রাজশাহী মহানগরীর যে স্থানে বিভিন্ন পণ্যসামগ্রীর বাজার বসাত তা এখনো সাহেববাজার নামে পরিচিত। ভারতবর্ষ ব্রিটিশ উপনিবেশের থাবামুক্ত হয়ে পাকিস্তানের জন্ম হওয়ার পর ১৯৫১ সালে তৎকালীন সরকার বড়কুঠি অধিগ্রহণ করে। ১৯৫৩ সালে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত হলে বড়কুঠি উপাচার্যের অফিস ও বাসভবনে পরিণত হয়। নিচতলা অফিস ও ওপরতলা বাসভবন। একটা সময় বড়কুঠির নিচতলা রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের সহায়ক কর্মচারী ইউনিয়নের অফিস ও ওপরতলা টিচার্স ক্লাব হিসেবে ব্যবহৃত হতো।
১৮৯৭ সালের প্রবল ভূমিকম্পে বড়কুঠির বেশ ক্ষতি হয়েছিল। রাজশাহী মহানগরীর সবচেয়ে পুরনো দালান হয়েও অনেকবার সংস্কারের কারণে আজও টিকে আছে। এর মূল কুঠির দৈর্ঘ্য ৮২ ফুট ও প্রস্থ ৬৭ ফুট, মোট কক্ষের সংখ্যা ১২টি, একটি সভাকক্ষসহ ওপরে ৬টি কক্ষ আছে। বাড়িটির দুই পাশে আছে দোতলার ছাদে যাওয়ার ঘোরানো সিঁড়ি। সিঁড়িঘরের দেওয়ালে নিদির্ষ্ট দূরে দূরে ফোকর আছে। যার মধ্যে দিয়ে গুলি ছোড়া সম্ভব। সে সময় নিচের কক্ষগুলো রেশমের গুদাম ও ওপরের কক্ষগুলো আবাসিক কাজে ব্যবহৃত হতো। ওলন্দাজদের আমলে কুঠিটি ছিল বেশ সুরক্ষিত। ছাদের ওপরে বিশেষ ধরনের কামান স্থাপন করা ছিল নিরাপত্তার জন্য। নিচের ঘরগুলোয় গোলাবারুদ রাখা হতো। আঙিনাতেও বসানো ছিল ছোট ছোট কামান। পরে এগুলো সরিয়ে নেওয়া হয়েছিল। ওয়াটসন কোম্পানির আমলে নিচের ঘরগুলোকে বন্দিশালা হিসেবে ব্যবহার করা হতো। বহু মানুষকে ধরে এনে এখানে খুন ও বহু নারীকে ধষর্ণ করা হয়েছে। নীল চাষে অবাধ্য কৃষকদের পেটানো হতো চামড়া মোড়ানো বেতের লাঠি শ্যামাচাঁদ দিয়ে। ১৮৫৭ সালে সিপাহি বিপ্লবের সময় বড়কুঠি ইংরেজদের স্বেচ্ছাসেবক বাহিনীর বিশেষ হেড কোয়ার্টার হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছিল।
২০১৮ সালের মে মাসে বড়কুঠিকে সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের আওতাধীন সংরক্ষিত পুরাকীর্তি হিসেবে প্রজ্ঞাপন জারি করে সরকার। ২০২১ সালে বড়কুঠি নিজেদের তত্ত্বাবধানে নেয় প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তর। সে সময় কিছু সংস্কারকাজও করা হয়। কথা ছিল এটি জাদুঘর হবে। সেখানে থাকবে ওলন্দাজদের (ডাচ) ব্যবহৃত জিনিসপত্র ও তথ্য-উপাত্ত। কিন্তু আজও সেই জাদুঘর হয়নি। ক্ষয়িষ্ণু হয়ে আসছে বড়কুঠি।
লেখক : গণমাধ্যমকর্মী