খাদ্য-বাসস্থানের কারণেই যে বন্যপ্রাণী হারিয়ে যাচ্ছে, তা সঠিক নয়। নানা কারণেই দেশ থেকে বন্যপ্রাণী হারাচ্ছে। প্রধান কারণগুলো হচ্ছে- ১. বন্যপ্রাণীদের আবাসস্থল ধ্বংস করে দেওয়া। ২. অবাধে বৃক্ষনিধন। ৩. খাদ্যসংকট। ৪. জলাশয় ভরাট। ৫. পাখিদের বিচরণক্ষেত্র হাওর-বাঁওড়সহ অন্যান্য জলাশয়ে অতিরিক্ত মাছ শিকার। ৬. চরাঞ্চলে জেলেদের উৎপাতে মৎস্যভুক পাখিরা বিপাকে পড়ছে। ৭. বন্যপ্রাণী শিকার ও পাচারের ফলে আশঙ্কাজনক হারে এদের সংখ্যা হ্রাস পাচ্ছে। এ ছাড়া কবিরাজরা গ্রামীণ হাটবাজারে বিভিন্ন পশুপাখির মাংস বিক্রি করায় বন্যপ্রাণী হুমকির মুখে পড়েছে। বিশেষ করে কবিরাজরা ধনেশ পাখি, বনরুই কিংবা শিয়ালের মাংস বাতব্যথার ওষুধ বলে চালিয়ে দিচ্ছে। এরই ধারাবাহিকতায় কয়েক বছর আগে প্রথম চট্টগ্রাম অঞ্চলে ‘তক্ষক’ শিকার শুরু হয়েছিল। তখন দেশের সর্বত্রই তক্ষক শিকারির সংখ্যা বেড়ে যায়। সেই ধারাবাহিকতায় আজও তক্ষক শিকার করছে যুবকরা।
এ ধরনের ন্যক্কারজনক ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে বন্যপ্রাণীর বেশ কিছু প্রজাতি হারিয়ে গেছে। কিছু প্রজাতি বিপন্ন হারানোর পথে। যেমন- পাখিদের মধ্যে হারিয়েছে, ফ্লোরিকান ময়ূর, পিংক মাথা হাঁস ও রাজ শকুন। হারিয়ে যেতে বসেছে বাদিহাঁস, বালিহাঁস, দিগহাঁস, কালো তিতির, চন্দনা, বাংলা শকুনসহ নানান প্রজাতির পাখি। উল্লিখিত প্রজাতির মধ্যে বাংলা শকুনদের তো গলা টিপেই হত্যা করা হয়েছে। গবাদিপশুর ব্যথানাশক চিকিৎসায় ব্যবহৃত ‘ডাইক্লোফেনাক’ ওষুধের প্রভাবে প্রচুর বাংলা শকুন মারা গেছে। যে কারণে ডাইক্লোফেনাক বাংলাদেশ, ভারত, পাকিস্তান ও নেপালে নিষিদ্ধ ঘোষিত হয়েছিল। শকুন রক্ষায় দেশে বিশেষ পদক্ষেপ নিলেও বছর বছর এদের সংখ্যা হ্রাস পাচ্ছে। এমনিই তো এদের সংখ্যা বর্তমানে হাতে গোনা বলা যায়। বিবিসি বাংলার জরিপ অনুযায়ী, বাংলাদেশে ২০১৪ সাল পর্যন্ত ২৬০টি বাংলা শকুন থাকলেও সেই সংখ্যা কমতে কমতে বাংলা শকুন বর্তমানে মহাবিপন্নের তালিকায়। বাংলা শকুন ছাড়াও দেশে আরও পাঁচ প্রজাতির শকুন রয়েছে। সেই প্রজাতির শকুনরাও ভালো নেই। নিয়মিত ওদের দেখাও যায় না এখন আর। ফলে আইইউসিএন শকুনদের লাল তালিকাভুক্তি করেছে।
পাখিদের মধ্যে চন্দনাও সংকটাপন্ন। কয়েক দশক আগেও এদের দেশের বিভিন্ন স্থানে দেখা যেত। হালে তেমন একটা নজরে পড়ে না। খাঁচায় বন্দি এবং উঁচু গাছগাছালি সংকটের কারণে এদের প্রজননে বিঘ্ন ঘটছে। প্রজাতিটি মহাবিপন্ন হয়ে পড়েছে। বাদিহাঁস, দিগহাঁস, কালো তিতির এখন তো দেখাই যায় না। ওরাও মহাবিপন্নের তালিকায়। এ ছাড়াও আরও ১৯ প্রজাতির পাখি মহাবিপন্নের তালিকায় স্থান পেয়েছে।
প্রাণীদের মধ্যে মহাবিপন্নের তালিকায় স্থান পেয়েছে ‘লজ্জাবতী বানর’। প্রাণিবিজ্ঞানীদের আশঙ্কা এটিও দ্রুত হারিয়ে যাবে। ফলে লজ্জাবতী বানর ‘রেড সিগন্যাল’-এর আওতায় রয়েছে। এর অন্যতম কারণ অবাধে বনভূমি উজাড়। লজ্জাবতী বানরের বাসযোগ্য স্থান পার্বত্য চট্টগ্রাম ও লাউয়াছড়ার গভীর জঙ্গলে। উঁচু গাছের মগডালে থাকতে এরা পছন্দ করে। জনমানবের পদচিহ্ন নেই যেখানে, সেখানেই ওদের বাস। বছরে মাত্র একটি বাচ্চা প্রসব করে মেয়ে বানর। আবার এদের গড় আয়ুও সন্তোষজনক নয়। মাত্র ১০-১২ বছর বাঁচে, তা-ও যদি অনুকূল পরিবেশ পায়।
বন্যপ্রাণীদের করুণ পরিণতির কথা ব্যক্ত করলে আফসোস করা ছাড়া আর কোনো উপায় থাকে না। কারণে-অকারণে বলির পাঁঠা হচ্ছে জন্তু-জানোয়ারগুলো। বাঘের বাচ্চা মনে করে কত মেছো বিড়ালকে যে লোকজন পিটিয়ে মেরেছে তার কোনো হিসাব নেই। হিসাব নেই গুইসাপের করুণ মৃত্যুরও। শুধু ওদের চামড়ার লোভে দুষ্কৃতকারীরা জ্যান্ত গুইসাপের চামড়া তুলে নিত নব্বই দশকের দিকেও। অজগর সাপের ক্ষেত্রেও তেমনই। শুধু চামড়ার লোভে অসংখ্য অজগরের প্রাণ হারাতে হয়েছে দেশে। পাহাড়ি অঞ্চল তথা চা-বাগান আর সুন্দরবনে সামান্য অজগর রয়েছে। ওরা খাদ্যসংকটে অনেক সময় লোকালয়ে এসে মারা পড়ে।
এভাবে অনেক বন্যপ্রাণী হারিয়ে গেছে। তার মধ্যে সম্বর হরিণ, হগ হরিণ ও প্যার্যাইল্ল্যাবানর উল্লেখযোগ্য। হনুমানের অবস্থাও করুণ। লাউয়াছড়া, যশোরের কেশবপুরে কোনো রকম বেঁচে আছে। হাতিদের অবস্থাও ভালো নয়। খাদ্যের অভাবে ওরা মিয়ানমার ও ভারতে পাড়ি জমাচ্ছে। মারাও যাচ্ছে দুর্ঘটনার কবলে পড়ে। আর যে প্রাণীটা এখন বাংলাদেশে নজরেই পড়ছে না, সেটি হচ্ছে নীলগাই; অথচ গত চার দশক আগেও প্রাণীটা উত্তরাঞ্চলের জেলাগুলোতে চষে বেড়াত। দুষ্কৃতকারীদের নিষ্ঠুরতার বলি হয়ে ওরা এখন আর মানুষের ধারেকাছেও ঘেঁষছে না। এ ধরনের জঘন্য কর্মকাণ্ড বন্ধ না হলে অদূরভবিষ্যতে কুকুর-বিড়াল দেখতে হলেও চিড়িয়াখানায় যেতে হবে নতুন প্রজন্মকে। এদের রক্ষায় কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে।
লেখক : কথাসাহিত্যিক, বন্যপ্রাণী ও জলবায়ুবিষয়ক লেখক