‘কেন এই পাসপোর্ট পাসপোর্ট, কাঁটাতার কাঁটাতার খেলা/পৃথিবী আমার আমি হেঁটে যাব।’ কবি জাহাঙ্গীর ফিরোজ কোন বর্ডারে আটকে গিয়ে এই কবিতা লিখেছিলেন জানা নেই। তবে বিদেশ ভ্রমণে গিয়ে একবারই আমাকে সীমান্তে আটকে যেতে হয়েছিল। একমাত্র সন্তান পঞ্চম শ্রেণির শিশুপুত্র মুশফিক মাহমুদকে দার্জিলিংয়ে পড়তে পাঠিয়ে বুকের ভিতর হাহাকার চলছিল। তখন ভারতের ভিসা পাওয়া ছিল বেশ কঠিন। বর্ডারের লোকজন বলেছিল, ‘ভিসা না পাইলে শুধু পাসপোর্ট নিয়ে চইলা আসবেন। পার করে দেব। খরচ একটু বেশি হবে।’ এক ঈদে তো ভিসা ছাড়াই দার্জিলিং রওনা দিয়েছিলাম। শেষ পর্যন্ত অবশ্য যাওয়া হয়নি।
২০১৮ সালের আগস্টে ভুটান যাওয়ার পথে ভারতের চ্যাংড়াবান্ধা বর্ডারে গিয়ে পাওয়া গেল মনোজ কুমার কানুকে। তিনি শ্যামলী পরিবহনের যাত্রীদের পাসপোর্ট পরিষেবার কাজ করেন অনেক বছর ধরে। ইদানীং একটি মানি এক্সচেঞ্জের এজেন্সিও দিয়েছেন। ২০১৩ সালের নভেম্বরে এক শীতের রাতে বর্ডার পার করে দিয়েছিলেন ধান খেত দিয়ে। সেই দিনের ঘটনা মনে করিয়ে দিয়ে জড়িয়ে ধরলাম। একসঙ্গে ছবিও তুললাম। সন্তানকে দার্জিলিংয়ের স্কুলে পড়তে পাঠানোর কারণে বছরে কয়েকবার সেখানে যেতে হতো। সেদিন বর্ডার ক্লোজ করার এক ঘণ্টা পর মনোজের সহায়তায় দেশে ফিরতে পেরেছিলাম। মনোজ বললেন, ভুলেই গেছিলাম, আসলেই সেটি ছিল বড় ঘটনা।
২০১৩ সালের ৬ নভেম্বর। ছেলেকে স্কুলে রেখে ফিরে আসব। ফেরার সময় মনে হলো, হাতে অনেক সময়। ভাবলাম, একটু রয়েসয়ে যাই। দুপুরের বেশ আগেই দার্জিলিং থেকে জিপে উঠলাম। শিলিগুড়ি পৌঁছার সাত-আট কিলোমিটার আগে জিপের চাকা পাংচার হয়ে গেল। সেটি ঠিক করে আবার জিপ চালু হতে এক ঘণ্টা লেগে যায়। শিলিগুড়িতে জিপ থেকে নেমে ভাবলাম, এই পথে কখনো বাসে চড়া হয়নি। বাসে করে ফিরব চ্যাংড়াবান্ধা। চারপাশ দেখতে দেখতে যাওয়া যাবে। সে রকম ভাবনা থেকেই বাসে উঠলাম।
চলছি তো চলছি। সময় যেন আর ফুরায় না। বর্ডার ক্লোজ হয়ে যায় সন্ধ্যা ৬টায়। শীতের বিকাল। সাড়ে ৫টার দিকেই অন্ধকার ঘনিয়ে আসে। এ সময় যাত্রীও কমে আসে। ৪টার পর থেকে আমার টেনশন বাড়তে থাকে। বাসের সহযাত্রীদের জিজ্ঞেস করি, ভাই, ময়নাগুড়ি কত দূর? এদিকে মনোজকেও ফোন দিচ্ছি বারবার। তাকে আশ্বস্ত করছি, আমি আসছি। বর্ডার পেরোতেই হবে। যখন বাস থেকে নামি তখন সন্ধ্যা সোয়া ৬টা। তীরে এসে তরি ডুবল মনে হলো। সেদিনের জন্য বাংলাদেশে ঢোকার আশা প্রায় ছেড়েই দিয়েছি। কিন্তু থাকব কোথায়? মনোজ ফোনে বললেন, দাদা, আমি ইমিগ্রেশনের স্যারদের বসিয়ে রেখেছি। আসেন, দেখি কিছু করা যায় কিনা। মন আমার বুড়িমারীর ওপারে বাংলাদেশ ভূখণ্ডে পড়ে আছে। আমি ভারতের চ্যাংড়াবান্ধায়। ঠিক সাড়ে ৬টায় চেকপোস্টে পৌঁছলাম। মনোজ বললেন, দ্রুত পাসপোর্ট দেন। তিনি পাসপোর্টসহ আমাকে নিয়ে ইমিগ্রেশনের রুমে গেলেন। ইমিগ্রেশন অফিসার পাসপোর্টে সিল মারবেন। হঠাৎ আমার দিকে তাকালেন। সিল হাতে নিয়েই বললেন, আমি সিল দিয়ে দিলে কিন্তু আপনাকে ওপাড়ে চলে যেতেই হবে। এপাড়ে আপনি ‘অবৈধ’ হয়ে যাবেন। আমার মনে তখন ভয় ধরে গেল। পাসপোর্টে ‘ডিপারচার’ সিল মারলে আমি এপাড়ে কোথাও থাকতে পারব না। শুনেছি, বর্ডারে সরকারের অনেক এজেন্সি কাজ করে। এক গ্রুপের সঙ্গে অন্য গ্রুপের সাধারণত সদ্ভাব থাকে না। সুযোগ পেলেই একে অন্যকে ফাঁসাতে চায়। সিল দিয়ে ‘অবৈধ’ হয়ে গেলে ধরা পড়ে জেলেও যেতে হতে পারে। ইমিগ্রেশন অফিসার বললেন, আমরা ছেড়ে দেব। বিএসএফ (বর্ডার সিকিউরিটি ফোর্স) ছাড়বে কি না, জেনে আসুন। ততক্ষণে পৌনে ৭টা বেজে গেছে। বিএসএফ তাদের ডিউটি ক্লোজ করে পথে ব্যারিকেড দিয়ে চলে গেছে। মনোজ আমাকে অদূরে বিএসএফ কমান্ডারের কাছে নিয়ে গেলেন। তিনি দেরি হওয়ার কারণ জানতে চাইলেন। পেশা জানতে চাইলেন। বললাম, সাংবাদিক। পুত্রকে দার্জিলিং রেখে আসতে গিয়েছিলাম। তিনি স্কুলের নাম জানতে চাইলেন। সব শুনে তার যেন দয়া হলো। হিন্দিতে মনোজকে বললেন, ইমিগ্রেশনের লোকজন আছে? হ্যাঁ-সূচক জবাব পেয়ে বললেন, রাস্তায় তো ব্যারিকেড। ইমিগ্রেশন ছাড়লে ধান খেত দিয়ে পার করে দাও। বিএসএফ কমান্ডারের সম্মতি পেয়ে দৌড়ে ইমিগ্রেশনে গেলাম। তারা সিল মেরে দিল। অবশ্য কাস্টমসের লোকজন সন্ধ্যা ৬টার পরপরই চলে গেছেন। মনোজ বললেন, দাদা, ধান খেত দিয়ে পার হয়ে চলে যান। রাস্তা দেখিয়ে দিলেন। উত্তেজনায় আমার কথা বেরোচ্ছে না। মনোজকে টাকা দিতে চাইলাম। মনে হলো, তিনি যা চাইবেন তাই দেব। মনোজ বললেন, টাকা লাগবে না দাদা। আপনাকে পাঠাতে পারছি, এতেই খুশি।
কুয়াশা ভেজা ধান খেত পেরিয়ে যখন এপাড়ে আসব, হঠাৎ মনে পড়ল, ধান খেত দিয়ে রাতের বেলা সীমান্ত পার হচ্ছি, যদি বিএসএফ গুলি করে দেয়। এ ভাবনাতেই যেন শিরদাঁড়া বেয়ে ঘাম ঝরে গেল। শীতের রাতেও অজানা ভয়ে আমি ঘামতে শুরু করলাম। দ্রুত পায়ে ধান খেত পেরিয়ে এপাড়ে এলাম। তখন ৭টা পেরিয়ে গেছে। সূর্য ডোবার পর প্রায় পৌনে দুই ঘণ্টা। বুকভরে নিঃশ্বাস নিলাম, বাংলাদেশের মুক্ত বাতাসে। এপাড়ে বুড়িমারীতে ঢাকায় ফেরার শেষ বাসটিও যেন শুধু আমার জন্য অপেক্ষা করছিল। এই অভিজ্ঞতা গত এক দশকেও স্মৃতিতে অমøান। বাকি জীবনেও ভোলার নয়। যে ছেলেকে দার্জিলিংয়ের স্কুলে রেখে আসতে গিয়ে এত বিপত্তি, সে এখন জার্মানির এক বিশ্ববিদ্যালয়ে মাস্টার্সের শিক্ষার্থী।
২. বলা হয়ে থাকে, ভারত ঘুরে দেখলে সারা বিশ্ব দেখা হয়ে যায়। ভারত ছিল আমাদের বাড়ির কাছের বিদেশ। আমাদের বিদেশযাত্রার প্রথম পছন্দ। ‘ছিল’ বলছি এই কারণে যে সেই ভারতের সঙ্গে সম্পর্কের তিক্ততা চলছে এখন। আস্থার সংকটে দুই দেশের সম্পর্ক এখন তলানিতে। ঢাকা থেকে ভারতীয় ভিসা দেওয়া প্রায় বন্ধ। এতে ভারতেরই বেশি ক্ষতি মনে করা হচ্ছে। তাদের পর্যটন ও চিকিৎসা খাত ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। কলকাতার শত শত ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান বাংলাদেশি ক্রেতার অভাবে ধুঁকছে। দিল্লি, কলকাতা, মুম্বাই, চেন্নাই, ভেলরের হাসপাতালগুলো বাংলাদেশের রোগী পাচ্ছে না। তবে বাংলাদেশের লোকজন তো বসে নেই। তারা ব্যাংকক, সিঙ্গাপুর যাচ্ছে বেড়াতে, ডাক্তার দেখাতে। চিকিৎসা নিতে। খরচ একটু বেড়ে গেলেও ভারতমুখিতা বন্ধ হয়েছে। পর্যটন ভিসা বন্ধ হলেও দুই দেশের আমদানি-রপ্তানি বাণিজ্য তো বন্ধ নেই। ভারত থেকে নিত্যপণ্য আসছে বিভিন্ন স্থলবন্দর দিয়ে। বাংলাদেশ থেকেও যাচ্ছে নির্দিষ্ট কিছু পণ্য। বাংলাদেশের জন্য ভারত এবং ভারতের জন্য বাংলাদেশ অনেক বড় বাজার। কিন্তু বাংলাদেশ সারা বিশ্বে অসংখ্য পণ্য রপ্তানি করলেও ভারতের বাজারে সুবিধা পায়নি অশুল্ক বাধার কারণে। ফলে বাংলাদেশ থেকে ভারত যে সুবিধা পাচ্ছে সে তুলনায় বাংলাদেশের প্রাপ্ত সুবিধা অনুল্লেখ্য। শেখ হাসিনার সরকারের শেষ ১০ বছরে ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্ক ছিল সবচেয়ে ঘনিষ্ঠ। এই সময়ে ভারত তাদের স্বার্থের অনুকূলে অনেক সুবিধা নিয়ে গেছে।
ছোট প্রতিবেশী হিসেবে বাংলাদেশের প্রতি ভারতের আচরণ কখনোই ইতিবাচক ছিল না। মুক্তিযুদ্ধের সহায়তাকারী হিসেবে ভারত বাংলাদেশের আনুগত্য প্রত্যাশা করে। কিন্তু একতরফা সীমান্ত হত্যা বাংলাদেশের প্রতি তাদের সীমাহীন বৈরিতার প্রকাশ। বারবার সিদ্ধান্ত হয়েছে, সীমান্তে কখনো প্রাণঘাতী অস্ত্র ব্যবহার করবে না ভারত। কিন্তু তারা সেই প্রতিশ্রুতি রক্ষা করে না। সীমান্তের বিভিন্ন অংশে প্রতি বছর অসংখ্য বাংলাদেশি খুন হন ভারতীয় রাষ্ট্রীয় বাহিনীর গুলিতে। বাংলাদেশে ভারতবিদ্বেষী মানুষের সংখ্যা বেড়ে যাওয়ার কারণ তাদের আচরণ। সর্বশেষ নিজেদের ৯৫ জেলেকে মুক্ত করতে তারা বাংলাদেশের ভূখণ্ডের অনেক ভিতরে ঢুকে আমাদের ৭৮ জেলেকে ধরে নিয়ে যায়। সেখানে আগে থেকে বন্দি ছিলেন আরও ১২ জেলে। সম্প্রতি ভারতের ৯৫ জেলের বিনিময়ে বাংলাদেশের ৯০ জেলেকে মুক্তি দেয় ভারত।
একটা সময় ছিল ভারতের গরু ছাড়া কোরবানি হতো না বাংলাদেশে। সেই নির্ভরতা কাটিয়ে উঠেছে বাংলাদেশ। ১৮ কোটি মানুষের এই দেশ চাইলে অনেক কিছুই করতে পারে। সামাজিক ও অর্থনৈতিক অনেক সূচকে বাংলাদেশ ভারতের চেয়ে এগিয়ে আছে। ভারতকে তার কট্টর হিন্দুত্ববাদ, চরম সাম্প্রদায়িকতা, সামাজিক বৈষম্য ও জাতপাত ভেদাভেদ নিয়ে এগোতে হয়। বাংলাদেশের সে রকম কোনো সমস্যা নেই। এ দেশে সব ধর্ম, বর্ণ, সম্প্রদায়ের মানুষ মর্যাদাপূর্ণ জীবনযাপন করে। আমাদের নেতৃত্ব যদি ঠিক হয়, তাহলে পরবর্তী ২০ বছরে ভারতকে অনেক পেছনে ফেলে এগিয়ে যাবে বাংলাদেশ। তখন হয়তো সীমান্তের চিত্রটা আরও ভিন্নতর হবে। সীমান্তে হয়তো আমাদেরই কাঁটাতারের বেষ্টনী দিয়ে অনুপ্রবেশ ঠেকাতে হবে। বাংলাদেশ তো আর ভুটান, মালদ্বীপ নয়। নেপালও নয়। রক্ত দিয়ে মাতৃভাষা অর্জনের দেশ বাংলাদেশ। যুদ্ধ করে হানাদার হটিয়ে স্বাধীনতা অর্জনের দেশ বাংলাদেশ। বাংলাদেশকে দাবিয়ে রাখার চিন্তা করাই বোকামি। প্রিয় প্রতিবেশী ভারতকে সেই বাস্তবতা বুঝতে হবে।
লেখক : সাংবাদিক
ইমেইল : [email protected]