উমাইয়া খলিফা ইয়াজিদ ইবনে মুয়াবিয়াকে নৃশংসতার প্রতীক বলে ভাবা হয়। হজরত ইমাম হোসাইন (রা.)-সহ নবী (সা.) বংশের হত্যাকাণ্ডে তাঁর শাসনামল ব্যাপকভাবে সমালোচিত। কাবাঘরে আগুন লাগানো ও মদিনায় লুটপাট চালানোর ঘটনা উমাইয়া হুকুমতের একটি কলঙ্কিত অধ্যায়। বলা হয়ে থাকে, নৃশংসতার মনোভাব ইয়াজিদ পেয়েছেন উত্তরাধিকার সূত্রে। ওহুদের যুদ্ধে শহীদ হন রসুল (সা.)-এর চাচা মহাবীর হামজা (রা.)। তাঁর বুক চিরে কলিজা চাবিয়ে প্রতিহিংসা চরিতার্থ করেন যে হিন্দা, তিনি ইয়াজিদের দাদি। এই উমাইয়া শাসকের পোষা বানরের নাম ছিল আবু ক্বাইস। রাজধানী দামেস্কের দরবারে সিংহাসনের পাশে ছিল বানরের আসন। উমাইয়া আমির-উমরাহ ও দর্শনার্থীদের ইয়াজিদের পাশাপাশি তাঁর পোষা বানরকেও কুর্নিশ করতে হতো। বানরটি মারা গেলে তাকে দাফন করা হয় কাফন পরিয়ে। খলিফার নির্দেশে সিরিয়াবাসীকে শোক পালনে বাধ্য করা হয়। জানামতে, প্রায় ১৪০০ বছর আগে কোনো প্রাণীকে জাতীয় পশু হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়ার রেওয়াজ ছিল না। থাকলে হয়তো বানর উমাইয়া হুকুমতের জাতীয় পশুর স্বীকৃতি পেত।
বাংলাদেশের জাতীয় পশু বাঘ। যে সে বাঘ নয় রয়েল বেঙ্গল টাইগার। বলা হয়, বাঘের মাসি বিড়াল। সারা দুনিয়ায় বিড়ালপ্রেমী মানুষের সংখ্যা কম নয়। জানামতে, বিড়াল কোনো দেশের জাতীয় পশুর স্বীকৃতি পায়নি। দক্ষিণ এশিয়ায় জনসংখ্যা ও আয়তনে দ্বিতীয় বৃহত্তম দেশ পাকিস্তান। পাকিস্তানের জাতীয় পশু ছাগল। রয়েল বেঙ্গল টাইগারের বিচরণভূমি বাংলাদেশও একসময় ছিল পাকিস্তানের অংশ। ১৯৭১ সালে দীর্ঘ ৯ মাসের মুক্তিযুদ্ধ শেষে বাংলাদেশ স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে বিশ্বের মানচিত্রে ঠাঁই পায়। মুক্তিযুদ্ধে পাকিস্তানি দখলদারদের বিরুদ্ধে বাঙালিরা জিতেছে বাঘের মতো শৌর্যবীর্য দেখিয়ে! আমাদের ঘনিষ্ঠ প্রতিবেশী ভারত জনসংখ্যার দিক থেকে বিশ্বের সবচেয়ে বড় দেশ। সে দেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষ সনাতন ধর্মের অনুসারী। যাদের গো-প্রেমের কোনো তুলনা নেই। তারপরও গরু ভারতের জাতীয় পশুর স্বীকৃতি পায়নি। যে স্বীকৃতি দিয়েছে পাশের দেশ নেপাল। জাতীয় পশু হওয়া সত্ত্বেও নেপালে গো-রক্ষার নামে মানুষ হত্যা কেউ কখনো করেনি। ধর্মের নামে ভারতে সেটি অহরহই ঘটে। অথচ সনাতনী ধর্মগ্রন্থ বেদ-এ বিভিন্ন যজ্ঞে গো-বলীর তথ্য রয়েছে।
দুনিয়ায় কুকুরপ্রেমী লোকের সংখ্যা অগুনতি। তবে একমাত্র মেক্সিকোয় কুকুর জাতীয় পশুর স্বীকৃতি পেয়েছে। সে দেশের প্রাচীন সভ্যতার সঙ্গে রয়েছে এ প্রাণীটির সম্পর্ক। গ্রিনল্যান্ডে যাতায়াতের জনপ্রিয় মাধ্যম সেøজ গাড়ি। বরফের ওপর দিয়ে যে গাড়ি টেনে নিয়ে যায় পোষা কুকুরের দল। বিশ্বনেতাদের মধ্যে একমাত্র কানাডার প্রধানমন্ত্রী জাস্টিন ট্রুডো সেøজ গাড়িতে চড়েছেন। ২০২৪ সালের ২০ জানুয়ারি জলবায়ু পরিবর্তন সম্পর্কে জনসচেতনতা বৃদ্ধির এক প্রচার অভিযানে। জাস্টিন ট্রুডোর বাবা পিয়েরে ট্রুডোও ছিলেন কানাডার প্রধানমন্ত্রী। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের বন্ধু। ১৯৮৩ সালে বাবার সফরসঙ্গী হয়ে জাস্টিন ১২ বছর বয়সে বাংলাদেশ সফর করেন। এ লেখা যখন লিখছি তখন খবর পেলাম জাস্টিন ট্রুডো প্রধানমন্ত্রীর পদ ছাড়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন।
ইসলামে কুকুর নাপাক জীব হিসেবে বিবেচিত। তবে নিরাপত্তার কাজে কুকুর পোষা নিষিদ্ধ নয়। ইসরায়েলের সঙ্গে ইউরোপ-আমেরিকার হরিহর আত্মার সম্পর্ক সবার জানা। তবে কুকুর নামের প্রাণীটির ক্ষেত্রে তাদের দৃষ্টিভঙ্গি একেবারে বিপরীত। ইহুদিরা ধর্মীয়ভাবে কুকুরবিদ্বেষী। খ্রিস্টানদের মধ্যে তা একেবারেই অনুপস্থিত। ইসরায়েলের ধর্মীয় আদালতে কুকুরকে মৃত্যুদণ্ডে দণ্ডিত করার একাধিক নজির রয়েছে। ইসরায়েলের বাইরে একমাত্র তানজেনিয়ায় একবার এক কুকুরকে আদালতে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়েছিল।
কানাডার সাবেক প্রধানমন্ত্রী স্টিফেন হারপারের শখ ছিল বিড়াল পোষা। ২০১১ সালে তাঁর সরকারি বাসভবনে নতুন অতিথি হিসেবে যোগ দেয় একটি বিড়াল। হারপার ফেসবুকে তাঁর নতুন বিড়ালের জন্য একটি পছন্দনীয় নাম চান দেশবাসীর কাছে। তাঁর আহ্বানে বেশ সাড়াও পড়ে। অনেকেই প্রধানমন্ত্রীর বিড়ালের জন্য নাম পাঠান। সেসব নামের একটি হলো ‘মেজরিটি’। হারপারের রক্ষণশীল দল নির্বাচনে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে ক্ষমতায় আসার সুযোগ পেয়েছিল। সে অভাবনীয় সাফল্যকে স্মরণ করে এক কানাডীয় বিড়ালটির নাম ‘মেজরিটি’ রাখার প্রস্তাব করেন।
বাংলাদেশের একসময়ের দাপুটে মন্ত্রী প্রয়াত মতিয়া চৌধুরী পরিচিত ছিলেন বিড়ালপ্রেমী হিসেবে। নিঃসন্তান এই রাজনৈতিক নেত্রী শতব্যস্ততার মধ্যেও পোষা বিড়ালের যত্ন নিতে ভুলতেন না। এমনকি বাইরে কোথাও বিড়াল নামের নিরীহ প্রাণী দেখলে তাঁর স্নেহাতুর মনোভাব উথলে উঠত। বিষয়টি কখনো কখনো পত্রপত্রিকায় খবর হিসেবেও ছাপা হয়েছে। মার্কিন ও ব্রিটিশ নেতাদের প্রায় সবাই কুকুরপ্রেমী হিসেবে পরিচিত। আমেরিকা যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক প্রেসিডেন্ট ওবামা তাঁর দুই কন্যাকে নিয়ে পোষা কুকুরের সঙ্গে খেলা করছেন এমন চিত্রও দেশবিদেশের পত্রপত্রিকায় ছাপা হয়েছে। সে দেশের আরেক সাবেক প্রেসিডেন্ট সিনিয়র বুশও ছিলেন কুকুরপ্রেমী। ১৯৯২ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে তিনি ক্লিনটনের কাছে হেরে যান। নির্বাচনি প্রচারণায় আত্মগর্বী বুশ বলেছিলেন, ক্লিনটনের চেয়ে তাঁর পোষা কুকুরও পররাষ্ট্রনীতি সম্পর্কে বেশি অভিজ্ঞ। ভাসানী ন্যাপ নেতা মসিয়ুর রহমান যাদু মিয়ার পুত্র সাবেক মন্ত্রী শফিকুল গাণি স্বপনের শখ ছিল কুকুর পোষা। আশির দশকে তিনি তাঁর শারমেয়র পেছনে মাসে ১০ হাজার টাকারও বেশি ব্যয় করতেন। তাঁর এক ঘনিষ্ঠজনের কাছ থেকে শোনা গল্প। স্বপন সাহেব একবার গিয়েছেন গ্রামের বাড়িতে। কুকুরের পেছনে তাঁর এই বিপুল ব্যয়ের বিষয়টি কেমন করে যেন রটে যায়। পরিণতিতে এলাকায় দেখা দেয় গুঞ্জন। পরিণতিতে দুর্জনরা বিষপ্রয়োগে হত্যা করে কুকুরটিকে। নিরপরাধ একটি পশুকে প্রাণ দিতে হয় এভাবে।
লাইবেরিয়ার ক্ষমতাচ্যুত প্রেসিডেন্ট স্যামুয়েল ডো নিজেকে সিংহের মতো ক্ষমতাধর বলে ভাবতেন। তিনি তাঁর বাসভবনে সিংহ পুষতেন। সিংহের খাঁচায় বিরোধী মতের লোকদের নিক্ষেপ করার অভিযোগ রয়েছে তাঁর বিরুদ্ধে। ক্ষুধাতুর সিংহ অসহায় মানুষকে যখন ছিন্নভিন্ন করে ভক্ষণ করত স্যামুয়েল ডো তা দেখে উল্লাস করতেন। সঙ্গীদের নিয়ে তিনি মেতে উঠতেন আদিম আনন্দে। ইথিওপিয়ার শেষ সম্রাট হাইলে সেলাসি। ইহুদিদের ধর্মগ্রন্থ তাওরাত বা বাইবেলের ওল্ড টেস্টামেন্টে উল্লেখিত সলোমন ও সেবা বংশের শেষ উত্তরসূরি তিনি। সামরিক অভ্যুত্থানে ক্ষমতা হারান এই সম্রাট। ১৯৭৪ সালের ফেব্রুয়ারিতে ইথিওপিয়ার রাজধানী আদ্দিস আবাবা উত্তাল হয়ে ওঠে ছাত্র-জনতার বিক্ষোভে। সে সময় রাজপ্রাসাদে এক সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করেন সম্রাট। সে সংবাদ সম্মেলনে যোগ দেন এক ইতালীয় সাংবাদিক। অধুনালুপ্ত বাংলাদেশ টাইমস-এর সম্পাদক মরহুম আলহাজ শামসুল হুদার সঙ্গে তাঁর বন্ধুত্ব ছিল। হুদা ভাই এক আড্ডায় বলেছেন, ওই সংবাদ সম্মেলনের সময় রাজপ্রাসাদে সিংহের গর্জন শুনেছেন ইতালীয় সাংবাদিক। সংবাদ সম্মেলনে উপস্থিত সাংবাদিকরা যখন বৃদ্ধ সম্রাটের ভাষণ শুনছিলেন তখন তাঁর কণ্ঠ মাঝেমধ্যে ঢাকা পড়ছিল সিংহের গর্জনে।
উগান্ডার ক্ষমতাচ্যুত স্বৈরশাসক ইদি আমিনও ছিলেন পশুপ্রেমী। দেশের মানুষের প্রতি তাঁর ভালোবাসা নিয়ে সংশয় থাকলেও পশুপাখি ও সামুদ্রিক জীবের প্রতি তাঁর মমত্ব ছিল নিখাঁদ। ইদি আমিন ছিলেন সেনাবাহিনীর একজন সামান্য করপোরাল। উগান্ডা স্বাধীন হওয়ার পর ইদির ভাগ্য খুলে যায়। রাতারাতি জেনারেল বনে যান। তারপর সুযোগ বুঝে মিল্টন ওবাটেকে হটিয়ে নিজেকে উগান্ডার প্রেসিডেন্ট ঘোষণা করেন। পাকিস্তানের একসময়ের সেনাশাসক আইয়ুব খানের মতো ফিল্ড মার্শাল সাজেন তিনি। অনেকের মতে, মধ্য আফ্রিকা প্রজাতন্ত্রের প্রেসিডেন্ট বোকাসোকে অনুসরণ করে উগান্ডার সম্রাট হতে চেয়েছিলেন ইদি। তবে শেষ পর্যন্ত সাহস পাননি বিরূপ প্রতিক্রিয়ার ভয়ে। দুধের স্বাদ ঘোল দিয়ে মেটাতে প্রেসিডেন্ট ইদি আমিন রাষ্ট্রীয় ফরমান জারি করে নিজেকে পৃথিবীর সব পশুপাখি, সাগরের মাছ ও অন্যান্য প্রাণীর সম্রাট ঘোষণা করেন। সংযুক্ত আরব আমিরাতের শাহি পরিবারের ঈগল পোষার কাহিনি জগৎবাসীর জানা। ঈগলের পেছনে তারা যে অর্থ ব্যয় করেন তা শুনলে ভিরমি খেতে হবে। ভারতের রাষ্ট্রপিতা মহাত্মা গান্ধী ছাগল পুষতেন। ছাগীর দুধ ছিল তাঁর নিত্যদিনের খাদ্যতালিকার অপরিহার্য উপাদান। ব্যক্তিগত জীবনে মহাত্মা গান্ধী ছিলেন চরম সংযমী। কোনো কোনো সময় শুধু দুধ পান করেই দিন কাটাতেন।
রাষ্ট্রনেতা, মন্ত্রী বা রাজনীতিকরা পশুপ্রেমী হবেন এতে আপত্তির কিছু নেই। ধর্ম বিশ্লেষকদের মতে, সব জীবই যেহেতু উপরওয়ালার সৃষ্টি, সেহেতু সৃষ্ট জীবের প্রতি ভালোবাসা স্রষ্টার সৃষ্টির প্রতি ভালোবাসার অংশ। তবে মানুষের প্রতি ভালোবাসা ও দায়বোধকে উপেক্ষা করে যারা পশুপ্রেমের পরকাষ্ঠা দেখান, তাদের মানসিক সুস্থতা নিয়ে প্রশ্ন উঠতেই পারে। সৃষ্টির সেরা জীব হিসেবে মানুষের প্রতি মানুষের মমত্ববোধ থাকতেই হবে। যারা রাষ্ট্রনেতা, সমাজনেতা, মন্ত্রী কিংবা রাজনীতিক তাঁদের সে দায়বোধ বেশি থাকাই উচিত।
পাদটীকা : বাংলাদেশের এক সাবেক শাসক (?) জেনারেল মইন উ আহমেদ পশুপ্রেমী ছিলেন কি না, জানি না। তবে তিনি ভারত সফরকালে তাঁকে ঘোড়া উপহার দেওয়া হয়। এ সফরের সময় ভারতের ‘ঘোড়া কূটনীতি’ নিয়ে দুর্জনরা অনেক কথাই বলেছেন। বলা হয়, ২০০৭ সালে ফখরুদ্দীন-মইন উদ্দিনের নেতৃত্বে জাতির ঘাড়ে যে ওয়ান-ইলেভেনের মসিবত নেমে আসে তার পেছনে প্রতিবেশী দেশেরও ইন্ধন ছিল। ভারতীয়রা ওই জেনারেলকে তাদের ঘোড়ার সহিস হিসেবেই ভেবেছে। ঘোড়া উপহার দেওয়ার পেছনে সে মনস্তত্ত্ব কাজ করেছে এমন ধারণা অনেকের।
তবে ভাগ্য ভালো, জেনারেল মইন ভারতীয়দের কাছ থেকে উপহার হিসেবে পাওয়া ঘোড়ার জন্য পিএইচডির আবদার করেননি। টাকা দিয়ে পিএইচডি ডিগ্রি কেনাসংক্রান্ত অতি বিখ্যাত কৌতুকটি এ প্রসঙ্গে স্মর্তব্য। এক লোক কোথাও যাচ্ছিল ঘোড়ায় চড়ে। যাওয়ার পথে জানতে পারল ধারেকাছে একটা ইউনিভার্সিটি আছে। সেখানে টাকার বিনিময়ে পিএইচডি ডিগ্রি দেওয়া হয়। লোকটি ছিল বেশ ধনী। সে ইউনিভার্সিটিতে গিয়ে বলল তার একটা পিএইচডি ডিগ্রি চাই। টাকার বিনিময়ে সে সহজেই ডিগ্রি পেয়ে গেল। খুশিতে বাকবাকুম লোকটি ঘোড়ায় চড়ে বসল। হঠাৎ মনে হলো, প্রিয় ঘোড়াটার জন্যও একটা ডিগ্রি নিই না কেন। লোকটা আবার গেল ইউনিভার্সিটিতে। বলল, এই নিন টাকা, আমার ঘোড়ার জন্য একটা পিএইচডি ডিগ্রি দিন।
ইউনিভার্সিটি কর্তৃপক্ষের জবাব, দুঃখিত, আমরা শুধু গাধাদের ডিগ্রি দিই, ঘোড়াদের না।
লেখক : সিনিয়র সহকারী সম্পাদক, বাংলাদেশ প্রতিদিন
ইমেইল : [email protected]