দিনের পর দিন মানসিক রোগীর সংখ্যা বেড়েই চলেছে। বিভিন্ন ধরনের মানসিক সমস্যা তাদের। কেউ সারা দিনে একটি কথাও বলে না, কেউ অনর্গল কথা বলে, কেউ বাথরুমে ঘণ্টার পর ঘণ্টা বসে থাকে। কেউবা সারা দিন ঘর ঝাঁট দেয়, কেউ রাস্তায় ঘোরে, চিৎকার, মারামারি, ভাঙচুর করে। এমন হাজারো রকম সমস্যা। এসবই মানসিক বিকলন। এদের আমরা ‘পাগল’ আখ্যা দিয়েই নিশ্চিন্ত থাকি। কিন্তু কেন পাগল, কী ধরনের পাগল, এর প্রতিকার কী এসব নিয়ে খুব কমই ভাবি। বেশি বাড়াবাড়ি হলে পাগলাগারদে পাঠিয়ে ঘাড় থেকে বোঝা নামাই, বাড়িতে শান্তি ফিরিয়ে আনি। এরা কেউ আমাদের ভাই, কেউ চাচা, ফুফু, মামা বা অন্য কোনো আত্মীয় কিংবা নিকটজন।
আমরা জানি, স্বাস্থ্য শারীরিক আর মানসিক স্বাস্থ্যের সমন্বয়। শরীর সুস্থ কিন্তু মনে হাজারটা রোগ থাকলে তাকে আমরা কোনোক্রমেই স্বাস্থ্যবান বলতে পারি না। তেমনি যিনি মানসিকভাবে সুস্থ কিন্তু শরীরে অসংখ্য রোগ তিনিও স্বাস্থ্যবান নন। নিটোল স্বাস্থ্যের জন্য দরকার শরীর ও মন সমভাবে সুস্থ থাকা। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা এই দুই স্বাস্থ্যের সঙ্গে সামাজিক অবস্থাও যোগ করেছেন। অর্থাৎ স্বাস্থ্য এই তিনটির সুস্থ সমন্বয়।
একজন মানুষ তখনই স্বাস্থ্যবান যখন তার রোগবালাই থাকে না, সেই সঙ্গে ভয়, হতাশা, বিষণ্নতা, মানসিক চাপও থাকে না। মানসিক স্বাস্থ্যের প্রধান অনুষঙ্গ চিন্তা, আবেগ ও আচরণ। যার মানসিক স্বাস্থ্য ভালো তিনি দৈনন্দিন কাজকর্ম ঠিকমতো করেন। দৃঢ়তার সঙ্গে চ্যালেঞ্জ গ্রহণ করেন। পরিবার ও সমাজের সঙ্গে সংগতিপূর্ণ যথোচিত আচরণ করেন। দ্রুত সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে পারে। নিজের ও সমাজের উন্নয়নে কাজ করেন।
মানসিক সুস্থতার জন্য নিয়মিত নিজের যত্ন নেওয়া প্রয়োজন। কোনো কারণে মনে কোনো কষ্ট বা আবেগের জন্ম হলে তা প্রকাশ করে ফেলা দরকার। এতে মানসিক চাপ ও জটিলতা কমে যায়। নিজের জন্য কিছুটা সময় আলাদা রাখতে হয়, নিজের মন কী বলছে সেটা বুুঝতে চেষ্টা করা এবং সেই অনুযায়ী কাজ করা, বই পড়া, গান শোনা দরকার। দরকার অতীত ও ভবিষ্যৎ নিয়ে চিন্তা না করে বর্তমানকে গুরুত্ব দেওয়া। বিভিন্ন গবেষণায় দেখা গেছে, সুষম ও পুষ্টিকর খাবার শরীরকেই নয়, মনকেও ভালো রাখে। অন্যদিকে অস্বাস্থ্যকর ফ্যাটি খাবার বিষণ্নতা ও অবসাদের সৃষ্টি করে। ভিটামিন বি-১২, ওমেগা-৩ ফ্যাটি অ্যাসিডসমৃদ্ধ খাবার মস্তিষ্কের আবেগ নিয়ন্ত্রণকারী হরমোনগুলোকে চাঙা রাখতে সাহায্য করে। এ ছাড়া তাজা ফলমূল ও সবজির বড় ভূমিকা রয়েছে মানসিক স্বাস্থ্য রক্ষায়। পুষ্টিকর খাবার নিয়মিত খেলে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ে। শারীরিক ও মানসিক সুস্থতার জন্য পর্যাপ্ত ঘুম দরকার। ঘুম ঠিকমতো না হলে মেজাজ তিরিক্ষি হয়ে ওঠে। ফলে মানুষ সহজেই ক্লান্তি বোধ করে, কর্মস্পৃহা কমে যায়। ঘুম শরীরের ক্ষতিগ্রস্ত কোষগুলো সারিয়ে তোলে। তাতে আমাদের মনমেজাজ চাঙা হয়। মানসিক স্বাস্থ্যের জন্য ব্যায়াম খুবই জরুরি। ব্যায়াম স্ট্রেস, বিষণ্নতা, ক্লান্তি ও মানসিক চাপ কমায়। যোগব্যায়াম এবং মেডিটেশনও কার্যকর হতে পারে।
মানসিক স্বাস্থ্য ভালো রাখতে নিজের শখের কাজ করা উচিত। যেমন বাগান করা, রান্না কিংবা সেলাই করা, নতুন কোনো কিছু শেখা ইত্যাদি। এতে মন ভালো থাকে, আত্মবিশ্বাস বাড়ে। দুশ্চিন্তা মাথায় আসে না। ফলে মস্তিষ্কের কর্মক্ষমতা ও দক্ষতা বৃদ্ধি পায়। নিজের দুর্বলতাগুলোর কথা দিনরাত না ভেবে কিসে তুমি ভালো, কোথায় তোমার ক্ষমতা তাতে বিশ্বাসী হলে জীবনে এগিয়ে চলার সাহস পাওয়া যায়। আমরা কেউই পূর্ণাঙ্গ নই। কেউ হয় না। তাই অন্যের সঙ্গে প্রতিযোগিতা করে নিজের দুর্বল দিকগুলো নিয়ে চিন্তা করা বোকামি। এতে হীনম্মন্যতা, হতাশা, বিষণ্নতা বাড়ে। সারা দিন কী কী পেয়েছেন তার একটা লিস্ট বানান আর কৃতজ্ঞ থাকুন। কী পাননি তা চিন্তা না করে কী পেয়েছেন সেটা নিয়ে খুশি থাকার চেষ্টা করলে ইতিবাচকতা মনোভাবের জন্ম হয়। নিজেকে বিচ্ছিন্ন না রেখে পরিবারের সঙ্গে, প্রিয়জনের সঙ্গে সময় কাটান। হতাশা ও দুশ্চিন্তা আপনার কাছে ঘেঁষবে না। প্রচুর হাসি আর আলিঙ্গন মনকে সুস্থ করে তুলতে দারুণ উপযোগী। সক্রিয় থাকা দরকার। অলস মানুষের মাথায় নানা দুশ্চিন্তা আসে। এ ছাড়াও কারও প্রতি রাগ থাকলে বা ক্ষোভ পুষে রাখলে মানসিক অসুস্থতার সূত্রপাত হতে পারে। তাই ক্ষমা করে দিন। ক্ষমা মানসিক প্রশান্তি দেয়।
এতক্ষণ ধরে যে কাজগুলোর কথা বললাম এগুলো আমরা চাইলেই করতে পারি। এর জন্য কারও কোনো সাহায্য বা সহযোগিতা লাগে না। কিন্তু এত কিছু করার পরও যদি মানসিক সমস্যার সৃষ্টি হয় তবে ডাক্তারের পরামর্শ নিতে হবে। জটিল সমস্যায় অতি দ্রুত এবং নিয়মিত ডাক্তারি পরামর্শ জরুরি। কারণ শারীরিক ক্ষতি ভালো হলেও মানসিক ক্ষতি সহজে কাটিয়ে ওঠা সম্ভব হয় না। আমাদের চারপাশে রোজ কিছু নৃশংস ঘটনা ঘটছে যা আমাদের হাতে নেই। যারা এসব নৃশংসতার ভুক্তভোগী তাদের মনে সাংঘাতিক চাপ, ভয়, বিষণ্নতা, হতাশাসহ নানা ধরনের মানসিক সমস্যার সৃষ্টি হতে পারে। আমাদের উচিত তাদের পাশে থাকা, সহায়তার হাত বাড়িয়ে দেওয়া। তাদের সুস্থ জীবনে ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করা।
সমস্যা হচ্ছে, আমাদের দেশে শরীরের পরিচর্যা যতটা করা হয় মনের পরিচর্যা তার শত ভাগের এক ভাগও করা হয় না। অসুখ হলে আমরা ডাক্তারের কাছে যাই, কিন্তু মনের অসুখ হলে মানসিক ডাক্তারের কাছে যেতে আমাদের নিজের এবং পরিবারের যথেষ্ট আপত্তি আছে। সমাজে একটা ধারণা প্রচলিত আছে মানসিক ডাক্তারের কাছে গেলে সবাই ভাববে পাগল হয়ে গেছে। আর এ সমাজে পাগল হওয়াকে ব্যক্তি এবং পরিবারের দোষের চোখে দেখা হয়। বাংলাদেশে মানসিক সমস্যা দিন দিন বাড়ছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মতে, দেশের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ বিভিন্ন মানসিক রোগে আক্রান্ত। ডিপ্রেশন, অ্যানজাইটি, স্কিজোফ্রেনিয়া এবং বাইপোলার ডিজঅর্ডারের মতো সমস্যাগুলো ঘরে ঘরে বেড়ে চলেছে।
আমাদের জীবন খুব মসৃণ নয়। নানান চড়াই-উতরাই পেরিয়ে চলতে হয়। প্রতিদিন নানা রকম ঘটনার মুখোমুখি হই আমরা। এর কোনো কোনোটি আমাদের জন্য আনন্দের, আবার কোনোটি বিষাদ বা হতাশার। কোনোটি আবার এমন প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করে যাতে আমরা প্রচণ্ডভাবে মুষড়ে পড়ি, দুঃখ-ক্ষোভে জর্জরিত হই। অনেকে উচ্চশিক্ষা নেওয়ার পরও বেকার আছেন। সামাজিকভাবে মর্যাদা পান না, পরিবার অবহেলা করে, কথা শোনায়। তিনি মুষড়ে পড়েন। অনেককে লেখাপড়ার জন্য পরিবার থেকে এতটাই চাপ দেওয়া হয়, তিনিও ভেঙে পড়েন। অনেকের টাকা নেই, সংসারের ব্যয় নির্বাহ করতে হিমশিম খান, বউয়ের কথা শুনতে হয়, ছেলেমেয়ের চাহিদা পূরণ করতে পারেন না, অনেকের বিয়ে হয় না, কারও সন্তান হয় না এমন অসংখ্য হতাশা আর বেদনা রয়েছে মানুষের। আছে পারিবারিক কলহ, বিচ্ছেদ এবং অসন্তোষ। এই চাপটাও আমাদের মনের ওপর পড়ে। কিন্তু জীবনে কোনো দুুঃখদুর্দশা হতাশা চিরস্থায়ী নয়। আঁধারের পর আলো আসে এটাই চিরন্তন সত্য। এই কথাটা মনে রেখে সমস্যার মোকাবিলা করলে কোনো পরিস্থিতিতেই কেউ ভেঙে পড়ে না। বরং আত্মবিশ্বাস বাড়িয়ে দেয়। মানসিক রোগীর জন্য মানসিক চিকিৎসা আছে। এই চিকিৎসাপদ্ধতিতে কেন মানসিক সমস্যা হচ্ছে সে কারণ নির্ধারণ করে নিরাময়ের চেষ্টা করা হয়। সাধারণত কাউন্সেলিং, থেরাপি, ওষুধ প্রদান এবং মনোরোগ বিশেষজ্ঞের পর্যবেক্ষণ এই চিকিৎসার পদ্ধতি।
দেশে পর্যাপ্ত মানসিক চিকিৎসার সুবিধা নেই। দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে মানসিক স্বাস্থ্যসেবা সীমিত এবং মানসম্পন্ন বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের অভাব রয়েছে। রাজধানী ঢাকায় জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউট রয়েছে, যেখানে ৪০০ শয্যার ব্যবস্থা আছে। এ ছাড়া পাবনায় ৫০০ শয্যার মানসিক হাসপাতাল রয়েছে। কিছু মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে মানসিক রোগের চিকিৎসা দেওয়া হয়। তবে জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে মানসিক স্বাস্থ্যসেবার ব্যবস্থা প্রায় নেই বললেই চলে। দেশে মানসিক রোগ বিশেষজ্ঞের সংখ্যা প্রায় ২২০ জন বলে জানা যায়, যার মধ্যে অধিকাংশই রাজধানীতে অবস্থান করেন। জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে বিশেষজ্ঞের অভাব রয়েছে।
দেশে প্রাপ্তবয়স্কদের মধ্যে ১৮.৭% এবং শিশুদের মধ্যে ১২.৬% মানসিক সমস্যায় ভুগছেন। তবে মানসিক রোগীর মধ্যে প্রায় ৯১% কোনো চিকিৎসা পান না। কিন্তু উন্নত দেশগুলোর অবস্থা একেবারে বিপরীত। তারা শারীরিক চিকিৎসায় যতটা গুরুত্ব দেন ঠিক ততটাই গুরুত্ব দেন মানসিক চিকিৎসায়। সেসব দেশে মানসিক চিকিৎসার ক্ষেত্রে বাজেট বেশি। সেবাও অনেক বেশি। মানসিক চিকিৎসায় আক্রান্ত না হলেও তারা নিয়মিত চিকিৎসকের কাছে যায়। উচ্চ আয়ের দেশগুলোতে প্রতি লাখ মানুষের জন্য মানসিক স্বাস্থ্যকর্মীর সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি। সেসব দেশে মানসিক স্বাস্থ্যসচেতনতা ও গ্রহণযোগ্যতা বেশি। সচেতনতার কারণে রোগীরা নিজেই চিকিৎসা গ্রহণ করে। এ দেশে একদিকে মানসিক চিকিৎসার পর্যাপ্ত ব্যবস্থা নেই, অন্যদিকে রয়েছে সচেতনতার অভাব। আছে নানান সামাজিক কুসংস্কারের স্টিগমা বা নেতিবাচক মনোভাব, যার কিছুটা আগে বলেছি। অনেকে মানসিক সমস্যাকে লজ্জার বিষয় বলে মনে করেন। দেশে মানসিক স্বাস্থ্যসেবার অবকাঠামো ও বিশেষজ্ঞের সংখ্যা বৃদ্ধি করা দরকার। বাজেট বরাদ্দ ও সেবার পরিধি বাড়ানো প্রয়োজন। প্রতিটি জেলা-উপজেলায় মানসিক স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্র স্থাপন করা প্রয়োজন। সেখানে প্রশিক্ষিত মনোরোগ বিশেষজ্ঞ এবং পরামর্শদাতার ব্যবস্থা রাখতে হবে। যাতে মানসিক রোগীরা প্রয়োজনীয় সেবা পেতে পারেন।
একই সঙ্গে মানসিক স্বাস্থ্য সম্পর্কে জনগণের সচেতনতা বাড়াতে গণমাধ্যম, সামাজিক মাধ্যম এবং স্থানীয় প্রচারণা চালানো জরুরি। মানসিক সমস্যাকে আর দশটা স্বাভাবিক রোগ হিসেবে গণ্য করার জন্য মানুষকে উৎসাহিত করতে হবে। চিকিৎসকদের পাশাপাশি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে মানসিক স্বাস্থ্যবিষয়ক কোর্স চালু করা উচিত। শিক্ষার্থীদের মানসিক চাপ মোকাবিলার কৌশল শেখানো দরকার। পাশাপাশি মানসিক রোগীদের পুনর্বাসনের দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা নেওয়া উচিত। সবশেষ কথা, মানসিক সমস্যা দূর করতে সবচেয়ে বড় ভূমিকা পরিবারের। মানসিক সমস্যাকে সহানুভূতির চোখে দেখা দরকার। পরিবারের সদস্যদের উচিত মানসিক সমস্যা নিয়ে খোলামেলা আলোচনা করা। খোলামেলা আলোচনা হলেই কেবল সহযোগিতা করা সম্ভব।
লেখক : কথাশিল্পী, গবেষক