প্রকৃতির অপার সৌন্দর্যের রূপ পরিবর্তনের জন্য আসে শীত। তীব্র শীতে কাঁপছে দেশ; নেই সূর্যালোক। বিপর্যস্ত জনজীবন। শীত যেমন তার লাবণ্যে অমোঘ রূপ নেয়, তেমনি শীতের আগমনে জীবনের এক কঠিন চ্যালেঞ্জ নিয়ে আসে তাদের জন্য, যারা সমাজের প্রান্তিক জনগণ। কুয়াশা আর হাড়কাঁপানো শীতে মানুষের কাজের গতিও কমে গেছে। কমে গেছে আয়। সন্ধ্যার আগেই বেশির ভাগ মানুষ ঘরে ঢুকে যাচ্ছে। কাজের অভাবে খাদ্য জোটানো দায়, এ অবস্থায় শীতবস্ত্র কিনবে কী করে? এ মানুষগুলো দেশের অবস্থাসম্পন্ন মানুষ কী করে সেদিকেই চেয়ে আছে। এবারের শীতের তীব্রতার একটু বর্ণনা দিতেই হয়। পঞ্চগড়ে ৩ জানুয়ারি সর্বনিম্ন তাপমাত্রা ৮ দশমিক ৩ রেকর্ড করা হয়েছে। এদিকে শীতের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে শীতজনিত রোগ বাড়ছে। মৃত্যুর খবরও মিলছে। সর্দি-কাশি, জ্বর, নিউমোনিয়া, টনসিলাইটিস, ব্রংকিউলাইটিস, সাইনোসাইটিস, অ্যাজমা, চর্মরোগ, হাঁপানি, শ্বাসকষ্ট, ডায়রিয়াসহ শীতজনিত নানা রোগে আক্রান্ত হচ্ছে শিশু থেকে বয়স্ক সব বয়সের মানুষ। হাসপাতাল ও চিকিৎসকদের ব্যক্তিগত চেম্বারে শীতজনিত রোগীর চাপ বাড়ছে। শীতের কুয়াশা যেমন শহর থেকে গ্রামের প্রত্যন্ত অঞ্চলে আঘাত হানে, তেমনি তা দরিদ্র, গৃহহীন ও অসহায় মানুষের জীবনে এক অন্ধকারাচ্ছন্ন অধ্যায় রচনা করে।
শীতকাল এসে পৌঁছানোর সঙ্গে সঙ্গে দেশের অনেক অঞ্চলে শুরু হয় তীব্র শীতের প্রকোপ। বিশেষ করে শহর ও গ্রামের গরিব, ছিন্নমূল এবং গৃহহীন মানুষের জন্য শীতের সময়টা অত্যন্ত কঠিন। এসব মানুষের কাছে শীত একটি বড় বিপদ, কারণ তাদের কাছে শীতবস্ত্র, গরম কাপড় এবং আশ্রয়ের অভাব থাকে। তারা খোলা আকাশের নিচে রাত কাটাতে বাধ্য হয়, যা তাদের স্বাস্থ্য ও জীবনের জন্য হুমকিস্বরূপ।
এমন পরিস্থিতিতে আমাদের সবার উচিত তাদের পাশে দাঁড়ানো। শীতবস্ত্র বিতরণ, গরম কাপড়ের ব্যবস্থা এবং আশ্রয়ের জন্য উদ্যোগ গ্রহণ করা অত্যন্ত জরুরি। এ ছাড়া স্বাস্থ্যসেবা প্রদান, খাবার সহায়তা এবং শীতকালীন রোগের প্রতিরোধে সচেতনতা সৃষ্টির মাধ্যমে এ শীতে তাদের কষ্ট কিছুটা হলেও লাঘব করা সম্ভব। এটা আমাদের মানবিক দায়িত্ব যে শীতের এ কঠিন সময়ে দরিদ্র, অসহায় এবং শীতার্ত মানুষের পাশে দাঁড়াব। একত্র হয়ে যদি আমরা সবাই একটু সহানুভূতি এবং সাহায্যের হাত বাড়াই, তাহলে আমরা একটি শক্তিশালী এবং মানবিক সমাজ গড়ে তুলতে পারব।
শৈত্যপ্রবাহে এদেশে মানুষ মারা যায় প্রতি বছরই। তবে এ-সম্পর্কিত মৃত্যুর কোনো সঠিক পরিসংখ্যান নেই। গবেষকরা ২০০০ থেকে ২০২৩ সাল পর্যন্ত চারটি জাতীয় দৈনিক পত্রিকার শৈত্যপ্রবাহ-সম্পর্কিত খবরের বিষয়বস্তু বিশ্লেষণ করে এ-সংক্রান্ত একটি ডেটাসেট তৈরি করেছেন এবং এর সঙ্গে সম্পর্কিত অন্যান্য রিপোর্টের সঙ্গে তা যাচাই করেছেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইনস্টিটিউট অব ডিজাস্টার ম্যানেজমেন্ট অ্যান্ড ভালনারেবিলিটি স্টাডিজের চারজন এবং স্পেনের ওভিডো বিশ্ববিদ্যালয়ের মেডিসিন অ্যান্ড হেলথ সায়েন্সেস অনুষদের দুজন গবেষক বাংলাদেশে শৈত্যপ্রবাহে মৃত্যুর ঘটনার স্থান-কালগত প্রবণতা এবং বৈশিষ্ট্যগুলো বিশ্লেষণ করেছেন। ইনস্টিটিউট অব ডিজাস্টার ম্যানেজমেন্ট অ্যান্ড ভালনারেবিলিটি স্টাডিজের সহযোগী অধ্যাপক মো. খালিদ হাসান জাতীয় দৈনিকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে বলেন, ‘আমাদের প্রাথমিক লক্ষ্য ছিল মৃত্যুহার বিষয়ে বিশদ জানা। আমরা দেখেছি যে ওই ২০ বছরে শৈত্যপ্রবাহের সময়কাল ও পুনরাবৃত্তি বেড়েছে।’
তিনি আরও জানান, গবেষণাকালীন শৈত্যপ্রবাহে ৫ হাজার ৬১০ জনের মৃত্যু হয়েছে। মৃত্যুহারের দিক থেকে শীর্ষে রংপুর বিভাগ, এরপরই রয়েছে রাজশাহী বিভাগ। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ময়নাতদন্ত না হওয়ায় ঠান্ডাজনিত রোগে কত মানুষের মৃত্যু হয়েছে তা বলা মুশকিল। শীতকালীন মৃত্যু নিয়ে আমাদের রাষ্ট্র-সংশ্লিষ্টদের ভাবতে হবে। মৃত্যুর হার কমিয়ে আনার জন্য যা করা দরকার, সে বিষয়ে পদক্ষেপ নিতে হবে। তা ছাড়া যারা বিত্তবান, তাদেরও একটা বড় দায়িত্ব রয়েছে। এ কঠিন সময়ে মানবতার প্রতি আমাদের দায়িত্ব যেন আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে, এটাই সময় শীতার্ত মানুষের পাশে দাঁড়ানোর। মানবিক সহানুভূতি ও সহায়তার হাত বাড়ালে, আমাদের সমাজের হৃদয়ে পরিবর্তন আনা সম্ভব।
শীত মৌসুমে, যাদের সামর্থ্য কম, তারা সবচেয়ে বেশি কষ্টে পড়ে। দেশের গ্রামীণ অঞ্চল থেকে শহরের বস্তিতে, ছিন্নমূল এবং গৃহহীন মানুষের কাছে শীতের তীব্রতা একেবারে দুর্বিষহ হয়ে ওঠে। শীতের সকালে আমরা যখন ঘর থেকে বেরিয়ে তাজা বাতাসে শ্বাস টানি, তখন আশপাশের শীতার্ত মানুষের কষ্টও যেন আমাদের হাড়ে হাড়ে অনুভূত হয়। এমন সময়ে আমাদের মানবিক দায়িত্ববোধের পরীক্ষা নেওয়ার সময় চলে আসে। এ শীতে তাদের পাশে দাঁড়ানো আমাদের সবার জন্য এক মহান কর্তব্য হয়ে দাঁড়ায়।
তীব্র শীতে বিশেষ করে গৃহহীন মানুষদের জন্য জীবন হয়ে ওঠে আরও কঠিন। ছিন্নমূল মানুষ, যাদের কোনো আশ্রয় নেই তারা খোলা আকাশের নিচে রাত কাটাতে বাধ্য হয়। শীতের কারণে অনেকেই ঠান্ডা থেকে সর্দি, কাশি, নিউমোনিয়া, হাঁপানি কিংবা শ্বাসকষ্টের মতো রোগে আক্রান্ত হয়। শিশু, বৃদ্ধ এবং শারীরিকভাবে দুর্বল মানুষের জন্য শীতের আগমন এক ভীষণ বিপদ হয়ে দাঁড়ায়। শীতের সময় দরিদ্র মানুষের খাদ্যসংকটও প্রকট হয়ে ওঠে, তাদের গরম কাপড় ও প্রয়োজনীয় জিনিসপত্রের অভাব চরম আকার ধারণ করে। এ অবস্থায় শীতের মধ্যে তাদের পাশে দাঁড়ানো এবং সাহায্যের হাত বাড়ানো একান্ত জরুরি হয়ে পড়ে।
এ সময় আমরা যা করতে পারি :
১. শীতবস্ত্র বিতরণ : দরিদ্র মানুষের জন্য শীতবস্ত্র বিতরণ একটি সহজ কিন্তু অত্যন্ত কার্যকর উপায়। কম্বল, সোয়েটার, শাল, গরম কাপড় প্রদান তাদের শীতের যন্ত্রণা কিছুটা হলেও কমিয়ে দিতে পারে। সরকারি এবং বেসরকারি সংগঠনগুলো এ উদ্যোগে নেতৃত্ব দিতে পারে; কিন্তু প্রতিটি ব্যক্তি এবং পরিবারকেও এর সঙ্গে যুক্ত হওয়া উচিত। ছোট ছোট দানে অনেক বড় পরিবর্তন আনা সম্ভব।
২. আশ্রয় স্থাপন : যারা গৃহহীন, তাদের জন্য আশ্রয়ের ব্যবস্থা করা উচিত। খোলা আকাশের নিচে যারা রাত কাটায়, তাদের জন্য শীতকালে অস্থায়ী আশ্রয়ের ব্যবস্থা করতে হবে। স্থানীয় প্রশাসন এবং স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনগুলো এ উদ্যোগ নিতে পারে, যেখানে মানুষজন রাত কাটাতে এবং শীতের প্রকোপ থেকে সুরক্ষিত থাকতে পারে।
৩. স্বাস্থ্যসেবা প্রদান : শীতকালীন অসুখের সংখ্যা বেড়ে যায়, বিশেষ করে বয়স্ক ও শিশুদের মধ্যে। স্বাস্থ্যসেবা সহজলভ্য করতে হবে। শীতকালে প্রতিটি গ্রামে বা শহরে বিনামূল্যে চিকিৎসা ক্যাম্প চালু করা, সর্দি-কাশি এবং শ্বাসকষ্টের রোগের চিকিৎসা নিশ্চিত করা গুরুত্বপূর্ণ। দরিদ্র ও অসহায়দের মধ্যে যে চিকিৎসার জন্য অর্থের সংকট থাকে, তাদের জন্য বিনামূল্যে ওষুধ প্রদান করা জরুরি।
৪. খাদ্যসহায়তা : শীতের সময়ে অনেক দরিদ্র পরিবার কাজকর্মের অভাবে খাদ্যসংকটে পড়তে পারে। তাদের জন্য খাদ্যসহায়তা, বিশেষ করে শীতের খাবার যা শীত থেকে নিরাপদ রাখে, তা প্রদান করা যেতে পারে। প্রয়োজনীয় খাবার, যেমন স্যুপ, পুষ্টিকর খাবার এবং শাকসবজি প্রদান করে তাদের শরীরকে শক্তিশালী করা সম্ভব।
৫. সচেতনতা বৃদ্ধি : শীতকালীন রোগের প্রতিরোধে সচেতনতা সৃষ্টি করা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। মানুষের মধ্যে শীতের সময় সর্দি, কাশি, নিউমোনিয়া ইত্যাদি রোগ থেকে বাঁচতে স্বাস্থ্যবিধি সম্পর্কে সচেতনতা সৃষ্টি করা প্রয়োজন। বিশেষ করে শিশু ও বৃদ্ধদের স্বাস্থ্য খতিয়ে দেখা, তাদের গরম রাখার ব্যবস্থা করা এবং প্রয়োজনীয় পুষ্টি সরবরাহ নিশ্চিত করতে হবে।
শীতে যারা দরিদ্র, গৃহহীন ও অসহায় তাদের পাশে দাঁড়ানো শুধু মানবিক কর্তব্য নয় বরং সমাজের দায়ও বটে। একত্রে কাজ করলে আমরা অনেক কষ্ট লাঘব করতে পারি। শীতকালীন এ সহানুভূতি আমাদের সমাজের শক্তি, অটুট সম্পর্ক এবং মানুষের প্রতি শ্রদ্ধার প্রমাণ হতে পারে। মানুষের দুঃখকষ্টে আমাদের এগিয়ে আসা উচিত, কেননা একে অপরের সাহায্যেই সমাজ তার প্রকৃত রূপ পায়।
সবশেষে বলতে চাই, শীতার্ত মানুষের পাশে দাঁড়ানো মহান কাজ, যা মানবিকতার পরিচায়ক। প্রত্যেক নাগরিকের ছোট্ট সাহায্যও বিশাল পরিবর্তন আনতে পারে। তাই আমাদের উচিত একে অন্যের প্রতি সহানুভূতি প্রদর্শন করা, যাতে শীতের এ কঠিন সময়ে একজন মানুষও অসহায় না থাকে। মানবিক দায়িত্ববোধ থেকে শীতকালে শীতার্ত মানুষের পাশে দাঁড়ানো একমাত্র উদ্দেশ্য হওয়া উচিত। সমাজের অভাবী ও দরিদ্র মানুষদের জন্য এটি শুধু দান নয়, বরং মানবতার প্রতি এক গভীর শ্রদ্ধা ও কর্তব্য।
লেখক : গবেষক