রণজিৎ দাস। ফুটবল সম্পর্কে যারা খোঁজখবর রাখেন, তাদের কাছে এই নাম বড় পরিচিত। কিন্তু তরুণ প্রজন্মের অনেকেই জানে না রণজিৎ দাস কে? এমনকি সিলেট শহর থেকে বেশ খানিকটা ভিতর দিকে করের পাড়ার কমলাকান্ত ভবনে কে থাকে তাও জানা নেই আশপাশের অনেকের। রণজিৎ দাসের বাড়ি চেনেন? জিজ্ঞেস করলেই ভ্রু কুঁচকে তাকায়। কমলাকান্ত ভবন? তাও জানে না লোকে। অথচ, ২৯/এ করের পাড়ার কমলাকান্ত ভবনের দোতলায় স্ত্রী, ছেলে আর নাতিনাতনিদের নিয়ে দিন কাটছে পূর্ব পাকিস্তান দলের জার্সিতে মাঠ কাঁপানো গোলরক্ষক রণজিৎ দাসের।
সাবেক তারকা এ ফুটবলারের বর্তমান বয়স ৯৩ বছর। জীবন সায়াহ্নে এসে বার্ধক্য বাসা বেঁধেছে শরীরে। কয়েক বছর ধরেই কথা বলতে পারেন না খুব একটা। গত কয়েক মাস ধরে একেবারেই বিছানায় শায়িত। কখনো হাত নেড়ে কিংবা ঠোঁট নেড়ে দুয়েকটা কথা বলেন। একমাত্র ছেলে রাজীব দাস এবং স্ত্রী সারাক্ষণই দেখাশোনা করছেন রণজিৎ দাসের। এখনো সামান্য যে প্রয়োজন আছে, তা মেটানোর চেষ্টা করছেন। সিলেট শহর থেকে নানা গলি ঘুরে ২৯/এ করের পাড়া গেলেই চোখে পড়ে কমলাকান্ত ভবন। প্রায় সারাদিন ঘুমিয়ে থাকা রণজিৎ দাসকে দেখলে ফুটবলপ্রেমীদের মনে আবেগের জোয়ার আসে। কিছুদিন আগেও কথা বলতে পারতেন। তখন ছেলে আর নাতিনাতনিদের সঙ্গে ফুটবল জীবনের নানা গল্প করতেন। সেসব গল্প সংগ্রহ করে আত্মজীবনীমূলক একটা বইও ছাপা হয়েছে। সেখানে আছে রণজিৎ দাসের ফুটবল জীবনের অনেক রোমাঞ্চকর ঘটনার কথা। তবে সেখানে নেই জীবন সায়াহ্নে যে আক্ষেপে পুড়ছেন রণজিৎ দাস, তাঁর কথা। সুস্থ অবস্থায় প্রায়ই তিনি ছেলের সঙ্গে বলতেন এই আক্ষেপের কথা। একমাত্র ছেলে রাজীব দাস নিজ বাড়িতে বসে সেসব কথাই শোনালেন। তিনি বলেন, ‘বাবা প্রায়ই আক্ষেপ করে বলতেন, আমাদের সময় অর্থ ছিল না। আমরা প্রচণ্ড ভালোবাসা থেকে, প্যাসন থেকে ফুটবল খেলতাম। পরিশ্রম করতাম। বর্তমানে ফুটবলে কত কত টাকা আছে। কিন্তু ফুটবলারদের মধ্যে আগ্রহ ও ভালোবাসার অভাব।’ কেবল তাই নয়, রণজিৎ দাস মনে মনে অনেক কষ্ট নিয়ে শেষ জীবনটা কাটাচ্ছেন। একসময়কার সতীর্থরা ব্যক্তি উদ্যোগে খোঁজখবর রাখেন এই তারকা ফুটবলারের। তবে ফেডারেশন থেকে কোনো খোঁজ রাখা হয়নি। বিশেষ করে জীবনের এই কঠিন সময়টাতেও কেউ নেই পাশে। মনের দুঃখ মনে রেখেই অপেক্ষার প্রহর গুনছেন রণজিৎ দাস।
একসময় পূর্ব পাকিস্তানে কত তারকা ফুটবলাররাই না খেলেছেন। সেই সময় এখন সুদূর অতীত বলেই মনে হয়। কিন্তু ফুটবলে তারকার আগমন হয় না কেন? যে দেশে গুণীর কদর নেই, সে দেশে গুণী আসবে কেন? রণজিৎ দাসও এই প্রশ্ন নিয়েই জীবনের শেষ সময়টা কাটাচ্ছেন।