গণমাধ্যম সংস্কার কমিশনের প্রধান কামাল আহমেদ বলেছেন, সাংবাদিকতা পেশা থেকে রাজনৈতিক দলবাজি বন্ধ করা প্রয়োজন। পেশার জন্য এটা দরকার, খুবই গুরুত্বপূর্ণ। কারণ সাংবাদিকতা এবং দলীয় রাজনীতির আদর্শ থেকে খবর সেন্সর করা অথবা বিকৃত করা- এগুলো সাংবাদিকতাকে প্রভাবিত করে।
আজ রবিবার চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসনের সম্মেলন কক্ষে চট্টগ্রাম বিভাগের সাংবাদিকদের সঙ্গে গণমাধ্যম সংস্কার কমিশনের মতবিনিময় সভায় তিনি এসব কথা বলেন।
এ সময় উপস্থিত ছিলেন- গণমাধ্যম সংস্কার কমিশনের সদস্য অধ্যাপক গীতিআরা নাসরীন, আখতার হোসেন খান, বেগম কামরুন্নেসা হাসান, আব্দুল্লাহ আল মামুন, মোস্তফা সবুজ প্রমুখ।
কমিশন প্রধান কামাল আহমেদ বলেন, 'সংবাদপত্রকে স্বাধীন, শক্তিশালী ও বস্তুনিষ্ঠ করার জন্য এ সংস্কার কমিশন গঠন করা হয়েছে। এ কমিশনের প্রধান লক্ষ্য থাকবে সংবাদ প্রতিষ্ঠান এবং সাংবাদিকদের কাজের ক্ষেত্রে পূর্ণ স্বাধীনতা নিশ্চিত করা। বর্তমানে আমাদের সম্পাদকীয় নীতিমালা নেই। সারাদেশে সম্পাদকীয় মান অভিন্ন ন্যাশনাল স্টান্ডার্ড থাকা উচিত, সব প্রতিষ্ঠান মেনে চলবে ন্যূনতম সাংবাদিকতার নৈতিকতার দিকগুলো- সেরকম কোন কিছু নেই। সেটার জন্য আমরা সম্পাদক পরিষদকে বলেছি।'
তিনি বলেন, 'নীতিগতভাবে বা বিভিন্ন রাষ্ট্রীয় সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে যে বৈষম্য করা হয়েছে, রাজনৈতিক কারণে বৈষম্যের শিকার যারা হয়েছেন- ব্যক্তি, সাংবাদিকদের ক্ষতিপূরণের প্রশ্ন খুব একটা গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন। এটা আমাদেরকে বিবেচনায় নিতে হবে। একইভাবে হয়রানিমূলক মামলায় যারা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন, দিনের পর দিন জেল খেটেছেন, কাজ করতে পারেননি, তাদের মামলা প্রত্যাহারের বিষয় অগ্রাধিকারের ভিত্তিতে বলা দরকার। আর যারা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন ক্ষতিপূরণের দাবিটাও যৌক্তিক এবং ন্যায্য।'
কামাল আহমেদ বলেন, 'সাংবাদিকদের দলীয় সক্রিয়তা। এখানে আসা বক্তব্যগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বড় সমস্যা রাজনৈতিক সক্রিয়তা, দলীয় সক্রিয়তা, ফ্যাসিবাদের সহযোগিতা। যারা ফ্যাসিবাদের সহযোগিতা করেছেন তাদের বিচারের প্রশ্ন। তাদের যারা উস্কানি দিয়েছেন তাদের বিচারের প্রশ্ন। সমস্যা হলো আমরা কোনো তদন্ত সংস্থা না। অপরাধগুলোর তদন্ত আমরা করতে পারবো না। তবে আমরা এটা বলতে পারি, যারা উস্কানিদাতা তাদের উস্কানির তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হোক।'
তিনি আরও বলেন, হকার্সদের পত্রিকা বিক্রির হিসেবের সঙ্গে বাস্তবতার কোনো মিল নেই। ঢাকা শহর থেকে ৩০২টি পত্রিকা মিডিয়া লিস্টে আছে, সারা দেশে ৫৯২টির মত পত্রিকা আছে। আমরা দেখেছি হকারদের তালিকায় ৪৬টি কাগজ তারা লেনদেন করে। বাকি কাগজগুলোর কোনো নথি নেই। কেউ নেয় না ওই কাগজ। তাহলে এটা সরকারের মিডিয়া লিস্টিং এর মধ্যে ঢুকলো কি করে? এই সমস্যার সমাধান করতে হবে। একইভাবে পত্রিকার প্রচারসংখ্যার দিক থেকে সাবেক প্রধানমন্ত্রীর প্রেস সচিবের একার নামেই চারটি পত্রিকার ডিক্লারেশন ছিল। একটি পত্রিকার সার্কুলেশন ৬ হাজারেরও কম, সেটাকে তিনি ২ লাখ ৯৯ হাজার দেখিয়েছেন, দেখাতে বাধ্য করেছেন।
সভায় একগুচ্ছ সুপারিশ আসে। এর মধ্যে আছে- সাংবাদিকদের অর্থনৈতিক নিরাপত্তার পাশাপাশি জীবনের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, প্রভাবশালী রাজনীতিবিদদের হাত থেকে সংবাদমাধ্যমকে মুক্ত রাখা, বিগত বছরে যেসব সাংবাদিকের নামে মিথ্যা মামলা হয়েছে সেগুলো প্রত্যাহার করা, গত পনের বছরে যেসব ভুয়া পত্রিকা নিবন্ধিত হয়ে ডিএফপি’র তালিকাভুক্ত হয়েছে সেগুলো বাদ দেয়া, পত্রিকায় সম্পাদক হিসেবে যোগদান করতে হলে সাংবাদিকতায় কমপক্ষে ১৫-২০ বছরের অভিজ্ঞতা থাকা ও সাংবাদিকতায় পেশাগত ডিগ্রী থাকা, উপজেলা এবং মফস্বল এলাকার প্রেসক্লাব সভাপতি ও সম্পাদককে জাতীয় প্রেসক্লাবের সদস্য নির্বাচিত করা, মফস্বল সাংবাদিকদের যথাযথ প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা, মোটরসাইকেলসহ বিভিন্ন যানবাহনে সাংবাদিক লেখা স্টিকার ব্যবহার বন্ধ করা, প্রেস ইনিস্টিটিউটে ডিপ্লোমা চালু করা, সাংবাদিকদের মান উন্নয়নের জন্য স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠান গঠন করা ও এ প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে সাংবাদিকদের একক রেজিস্ট্রেশন নাম্বার প্রদান এবং তাদের সরকারি পরিচিতি নিশ্চিত করা।
বিডি প্রতিদিন/মুসা