আমাদের জীবনে ইতিবাচক পরিবর্তন এনে দিতে প্রশিক্ষণ কোর্স হিসেবে হাজির হওয়া পবিত্র মাহে রমজান বিদায় নিয়েছে। একটি রমজানের সমাপ্তি হলেও একজন মুমিনের জীবনে মৃত্যুর আগপর্যন্ত নেক আমলের সমাপ্তির কোনো সুযোগ নেই। রমজানে গুনাহ ছেড়ে দেওয়া ও বেশি বেশি নেক আমলের প্রশিক্ষণ জীবনজুড়ে ধরে রাখতে পারলেই রমজান পাওয়া সার্থক হবে। যেভাবে আমরা জীবনজুড়ে রমজানের শিক্ষা ধরে রাখতে পারি তা হলো :
১. গুনাহে প্রত্যাবর্তন না করা : রমজান ছিল হারাম ছেড়ে দেওয়ার প্রশিক্ষণ। রোজাদার সাহরি খেয়ে রোজা শুরু করার পর তার সামনে যত মজাদার খাবারই আসুক, সে খাবারকে ‘না’ বলেন। যে খাবারটি একটু আগেও হালাল ছিল আল্লাহ নিষেধ করার কারণে তাকে যেভাবে ‘না’ বলেন ঠিক সেভাবে আল্লাহ কর্তৃক নিষিদ্ধ সব হারামকে ‘না’ বলার শিক্ষাই দেয় রমজান। এ শিক্ষা জীবনভর ধরে রাখতে হবে। রমজানের পর পানাহার চালু হবে, কিন্তু আল্লাহ রাব্বুল আলামিন কর্তৃক নিষিদ্ধ সব হারামকে ‘না’ বলা অব্যাহত রাখতে হবে। ধূমপানসহ যেসব বদভ্যাস রমজানে ত্যাগ করা হয়েছিল সেগুলোতেও যেন আমরা ফিরে না যাই।
২. নেককাজগুলো চলমান রাখা : রমজানে যেসব অতিরিক্ত নফল আমল আমরা শুরু করেছিলাম, সেগুলো যেন রমজানের পরেই বন্ধ না হয়ে যায়, সে ব্যাপারে খেয়াল রাখতে হবে। রমজানে আমরা তারাবিহ, তাহাজ্জুদসহ বিভিন্ন ধরনের নফল নামাজ পড়েছি। রমজানের বিদায়ের পর নফল নামাজ বন্ধ না করে ইশরাক, আওয়াবীন, তাহাজ্জুদ ও সাধারণ নফল নামাজের মাধ্যমে সে চর্চা ধরে রাখতে হবে। তারাবিহতে দাঁড়িয়ে কোরআন শুনেছি, প্রতিদিন কিছু কিছু কোরআন তিলাওয়াতের মাধ্যমে সে ধারাবাহিকতাও ধরে রাখতে হবে।
৩. ছুটে যাওয়া রোজাগুলোর কাজা আদায় করা : কাজা হলো বকেয়া আদায়। অসুস্থ ব্যক্তি ও মুসাফিরের জন্য রমজানের রোজা ছাড়ার অনুমতি আছে। আল্লাহতায়ালা বলেন, ‘তোমাদের মধ্যে যে ব্যক্তি এ মাসটিতে (রমজানে) উপস্থিত হবে, সে যেন তাতে সিয়াম পালন করে। আর যে ব্যক্তি অসুস্থ বা মুসাফির হয়, সে অন্য দিনে সংখ্যা পূরণ করে নেবে, আল্লাহ তোমাদের জন্য সহজটাই চান, কঠিন করতে চান না সুরা বাকারা, আয়াত : ১৮৫।’ মুসাফির এবং অসুস্থ ব্যক্তির মতো হায়েজ ও নেফাসগ্রস্ত নারীর জন্যও রোজা ছাড়ার অনুমতি আছে। তেমনি নিজের অথবা সন্তানের ক্ষতির আশঙ্কা থাকলে গর্ভবতী ও দুগ্ধদানকারী নারীরও রোজা ছাড়ার অনুমতি আছে। এসব কারণে যারা রমজানের রোজা ছেড়েছেন, তাদের সেই ছুটে যাওয়া রোজাগুলো আদায় করে নেওয়ার সবচেয়ে উপযোগী সময় হলো রমজান-পরবর্তী শাওয়াল মাস। বিলম্বে আদায় জায়েজ হলেও যত দ্রুত সম্ভব তাড়াতাড়ি আদায় করে নেওয়া উচিত। কেননা প্রয়োজনীয় সময় পেয়েও তা আদায় না করলে এমতাবস্থায় মৃত্যু হলে রোজা ছেড়ে দেওয়ার জন্য গুনাহগার হয়ে মৃত্যুবরণ করতে হবে।
৪. রমজানের কাফফারা আদায় করা : কাফফারা হলো জরিমানা। মুসাফির এবং অসুস্থ ব্যক্তির মতো যাদের ইসলাম রোজা ছাড়ার অনুমতি দিয়েছে, তারা ব্যতীত অন্য কেউ যদি ইচ্ছাকৃতভাবে পানাহার বা স্ত্রী সম্ভোগের মাধ্যমে একটি রোজাও ছাড়েন তাহলে এর জন্য কাজা ও কাফফারা উভয়ই আদায় করতে হয়। রোজা কাফফারা হলো বিরতিহীনভাবে ৬০টি রোজা রাখা। ৬০টি রোজা যেমন শর্ত তেমনি তা লাগাতার হওয়াও শর্ত। তাই যদি কেউ কাফফারা আদায় করতে গিয়ে ৬০তম দিনেও অসুস্থ হয়ে সে রোজা ভেঙে ফেলে তবে তাকে আবার প্রথম থেকে কাফফারা আদায় শুরু করতে হবে। আগেরগুলো বাদ হয়ে যাবে। একই রমজানের এক বা একাধিক রোজা কেউ ছেড়ে থাকলে প্রথমে যতগুলো রোজ ছেড়েছেন, সেগুলোর সমপরিমাণ কাজা আদায় করবেন। তারপর একটি কাফফারা অর্থাৎ লাগাতার ৬০টি রোজা রাখবেন। রোজা রাখতে অক্ষম হলে ৬০ জন মিসকিনকে দুবেলা খানা খাওয়াতে হবে। অথবা প্রতি মিসকিনকে এক ফিতরা পরিমাণ খাদ্য বা অর্থ দিয়েও কাফফারা আদায় করা যাবে। কাজা ও কাফফারা আদায় রমজান-পরবর্তী শাওয়াল মাসেই অবিলম্বে শুরু করা উচিত।
৫. শাওয়ালের ছয় রোজা : কাজা বা কাফফারা না থাকলে রমজানের পরপরই শাওয়ালের ছয় রোজা পালন করা মুস্তাহাব। কাজা থাকলে তা আদায় করে তারপর শাওয়ালের ছয় রোজা পালন করতে হবে। রসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, যে ব্যক্তি রমজানের রোজা রাখল অতঃপর শাওয়ালের ছয়টি রোজা রাখল, সে যেন সারা বছরই রোজা রাখল। মুসলিম ২/৮২২। শাওয়ালের রোজা ছাড়াও অন্যান্য নফল রোজার মাধ্যমে জীবনজুড়ে রমজানের শিক্ষা ধরে রাখতে হবে।
লেখক : খতিব, বাইতুশ শফীক মসজিদ
বিডি-প্রতিদিন/সালাহ উদ্দীন