শরিয়তে গবেষণার ক্ষেত্রে যে চার ইমাম বরণীয় হয়ে আছেন তাঁদের মধ্যে শাফেয়ি মাজহাবের প্রতিষ্ঠাতা ইমাম শাফেয়ি (রহ.) ছিলেন অন্যতম। ইমাম আজম আবু হানিফা (রহ.)-এর পর তিনি নেতৃস্থানীয় মুজতাহিদ ইমাম হিসেবে সমাদৃত। তাঁর পূর্ণ নাম মুহাম্মদ ইবনে ইদরিস আশ-শাফেয়ি। তাঁর বংশের নবম পুরুষ হলেন রাসুল (সা.)-এর চতুর্থ পূর্বপুরুষ আবদে মানাফ।
এই হিসেবে তিনি ছিলেন কুরাইশ বংশোদ্ভূত। তিনি ১৫০ হিজরিতে আসকালান প্রদেশের গাজাহ নামক স্থানে জন্মগ্রহণ করেন।
জন্মের দুই বছর পর তিনি পিতাকে হারান। ফলে মাতৃক্রোড়েই তিনি লালিত-পালিত হন।
অসাধারণ স্মৃতি শক্তির অধিকারী ইমাম শাফেয়ি মাত্র ১০ বছর বয়সে কোরআন হিফজ করেন। অতঃপর মক্কায় গমন করে সেখানকার প্রখ্যাত ফকিহ মুসলিম ইবনে খালিদ বানজি (রহ.)-এর কাছে ফিকাহ শিক্ষা করেন। ১৫ বছর বয়সে তিনি উস্তাদের কাছ থেকে ফতওয়া দেওয়ার অনুমতি প্রাপ্ত হন, কিন্তু তিনি উস্তাদের সার্টিফিকেট নিয়ে ইমাম মালিক (রহ.)-এর দরবারে হাজির হন। এখানে তিনি মুয়াত্তা অধ্যয়ন করেন এবং মালিকি আইন সম্বন্ধে জ্ঞান অর্জন করেন।
মদিনায় থাকাকালেই রাজনৈতিক কারণে বন্দি হয়ে বাগদাদে কারারুদ্ধ হন। আব্বাসীয় শাসক হারুন অর রশিদ তাঁর অগাধ প্রজ্ঞার জন্য তাঁকে মুক্তি দেন। বাগদাদে তিনি হানাফি ফিকাহবিদ মুহাম্মদ বিন শাইবানি (রহ.)-এর সাহচর্যে আসেন এবং হানাফি ফিকাহ বিষয়ে গভীর জ্ঞান লাভ করেন। এই দুই মাজহাবের মধ্যে তিনি মধ্যপন্থা গ্রহণ করেন।
কর্মজীবনের শুরুতে তিনি আব্বাসীয় খলিফা হারুনুর রশিদের আমলে নাজরান প্রদেশের শাসনকর্তা নিযুক্ত হন। পরে তিনি সরকারি দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি নিয়ে ফিকাহচর্চায় মনোযোগ দেন।
১৯৫ হিজরিতে তিনি ইরাকে গমন করলে ইরাকের একদল আলিম তাঁর শিষ্যত্ব গ্রহণ করেন। এ সময় তিনি হানাফি ও মালেকি মুহাদ্দিসদের মাজহাবের সমন্বয়ে একটি মাজহাব প্রবর্তন করেন। এই মাজহাবকে মাজহাবে কাদিম তথা প্রাচীন মাজহাব বলা হয়।
১৯৮ হিজরি সালে তিনি মিসর গমন করেন এবং সেখানকার আলিম ও সাধারণ জনগণের সঙ্গে মতবিনিময় করেন। তখন মিসরে মালিকি মাজহাব ব্যাপকভাবে চালু ছিল। তিনি মিসরীয়দের সার্বিক অবস্থা বিবেচনা করে তথাকার পরিবেশ-পরিস্থিতির আলোকে স্বীয় ফিকহি চিন্তাধারা ও ইজতিহাদ পরিবর্তন করে মিসরি ফিকাহ প্রবর্তন করেন। একেই মাজহাবে জাদিদ তথা নতুন মাজহাব বলা হয়।
ইমাম শাফেয়ি (রহ.) তাঁর ফিকাহের মূলনীতিগুলো গ্রন্থে লিপিবদ্ধ করেন। তিনি কোরআনকে সর্বাগ্রে স্থান দিতেন। হাদিস দ্বারা দলিল গ্রহণের ক্ষেত্রে বর্ণনাকারীর নির্ভর যোগ্যতা যাচাই করতেন। হাদিসের পর ছিল তাঁর দৃষ্টিতে ইজমার স্থান। কোরআন, হাদিস ও ইজমার অনুপস্থিতিতে তিনি কিয়াসের মাধ্যমে সমস্যার সমাধান করতেন।
আইনের দিক থেকে শাফেয়ি (রহ.)-এর মাজহাব হাদিস বিজ্ঞান বিকাশের পেছনে একটি উল্লেখযোগ্য প্রেরণা হিসেবে বিবেচিত। মুসলিম আইনের সব ক্লাসিক্যাল মতবাদের উৎস বলেও তা ব্যাপকভাবে স্বীকৃত। তাঁর প্রধান গ্রন্থ ‘রিসালা’ আইন বিজ্ঞানের ক্ষেত্রে বিশেষ খ্যাতির অধিকারী। তাঁর বক্তৃতাবলি অবলম্বনে ‘কিতাবুল উম্ম’ সংকলিত হয়েছে। এটি শাফেয়ি মাজহাবের বুনিয়াদ। মিসরে এ গ্রন্থ সাত খণ্ডে মুদ্রিত হয়েছে।
ইসলামী আইনের মূলনীতি উদ্ভাবন করা ইমাম শাফেয়ি (রহ.)-এর জীবনের গৌরবময় কার্যাবলির অন্তর্ভুক্ত। এর মাধ্যমে আইন উদ্ভাবনের পদ্ধতি ও ইজতিহাদ করার নিয়মাবলি সুশৃঙ্খলিত হয়েছে। ইমাম শাফেয়ি (রহ.)-এর জীবদ্দশায়ই মিসর ও ইরাকে তাঁর অনুসারীরা প্রাধান্য অর্জন করে। তাঁর ইন্তেকালের পর তদীয় শাগরেদরা তাঁর চিন্তাধারা প্রচারে আত্মনিয়োগ করেন। তাঁর অনুসারীরা মিসর, পূর্ব আফ্রিকা, ফিলিস্তিন ও ইন্দোনেশিয়ায় বর্তমানেও পরিব্যাপ্ত। মালয়েশিয়া, তানজানিয়া, মধ্য এশিয়া, পশ্চিম আফ্রিকায় শাফেয়ি মাজহাবের বহু অনুসারী আছেন।
বিডি প্রতিদিন/ ওয়াসিফ