‘হারাম’ শব্দের প্রচলিত অর্থ নিষিদ্ধ। তবে আরবি ভাষায় শব্দটি সম্মান অর্থেও ব্যবহৃত হয়। ইসলাম কিছু স্থান ও সময়ের বিশেষণ হিসেবে ‘হারাম’ শব্দটি ব্যবহার করেছে, যেগুলো একই সঙ্গে এসব স্থান ও সময়ের মর্যাদা বোঝায় এবং তাতে বিভিন্ন কাজের সীমাবদ্ধতা নির্ধারণ করে। সেগুলো হচ্ছে—ক. বায়তুল হারাম, খ. মসজিদুল হারাম, গ. বালাদুল হারাম, ঘ. মাশআরুল হারাম, ঙ. আশহুরুল হারাম।
এখানে সেগুলোর বিধান তুলে ধরা হলো।
হারাম ঘোষণার দুই দিক
ইসলাম কর্তৃক কিছু স্থান ও সময়কে হারাম ঘোষণা করার দুটি দিক আছে। তা হলো—
১. আমলের প্রতিদান বৃদ্ধি : এসব স্থান ও সময়ের বিশেষ মর্যাদা, যার কারণে বান্দার আমলের প্রতিদান বৃদ্ধি পায়। যেমন—মসজিদুল হারামের ব্যাপারে মহানবী (সা.) বলেন, ‘আমার মসজিদে আদায়কৃত এক রাকাত নামাজ অন্যত্র আদায় করা এক হাজার রাকাত নামাজের চেয়ে উত্তম। তবে মসজিদুল হারাম এর ব্যতিক্রম। আর মসজিদুল হারামে আদায়কৃত এক রাকাত নামাজ অন্যত্র আদায় করা এক লাখ রাকাত নামাজের চেয়ে উত্তম।’
(সুনানে ইবনে মাজাহ, হাদিস : ১৪০৬)
২. পাপের ভয়াবহতা বৃদ্ধি : এসব স্থানে বান্দার কার্যক্রমের ওপর সীমাবদ্ধতা আরোপ এবং এখানে পাপ করলে তার ভয়াবহতা বৃদ্ধি পাওয়া। আল্লাহ যেসব স্থানকে সম্মানিত করেছেন, সেগুলোতে বান্দার কিছু কাজ নিষিদ্ধ করেছেন।
যেমন—হেরেমের সীমানার মধ্যে শিকার করা, ঘাস, লতা-পাতা ছেঁড়া নিষিদ্ধ। আবার এসব স্থানে পাপ করা গুরুতর অপরাধও বটে। মহান আল্লাহ বলেন, ‘যারা কুফরি করে এবং মানুষকে নিবৃত্ত করে আল্লাহর পথ থেকে ও মসজিদুল হারাম থেকে, যা আমি করেছি স্থানীয় ও বহিরাগত সবার জন্য সমান। আর যে ইচ্ছা করে সীমা লঙ্ঘন করে তাতে পাপকাজের, তাকে আমি আস্বাদন করাব মর্মন্তুদ শাস্তি।’ (সুরা : হজ, আয়াত : ২৫)
হারাম বা সম্মানিত স্থান-সময়
পবিত্র কোরআনে পাঁচটি স্থান ও সময়ের ব্যাপারে ‘হারাম’ বিশেষণ ব্যবহার করা হয়েছে। তা হলো—
১. বায়তুল হারাম : ‘বায়ত’ অর্থ ঘর আর ‘বায়তুল হারাম’ অর্থ সম্মানিত ঘর। এর দ্বারা উদ্দেশ্য পবিত্র কাবাঘর। ‘পবিত্র কাবাঘর, পবিত্র মাস, কোরবানির জন্য কাবায় প্রেরিত পশু ও গলায় মালা পরিহিত পশুকে আল্লাহ মানুষের কল্যাণের জন্য নির্ধারিত করেছেন। এটা এই কারণে যে তোমরা যেন জানতে পারো, যা কিছু আসমান ও জমিনে আছে, আল্লাহ তা জানেন এবং আল্লাহ সর্ববিষয়ে সর্বজ্ঞ।’ (সুরা : মায়িদা, আয়াত : ৯৭)
২. মসজিদুল হারাম : ‘মসজিদুল হারাম’ অর্থ সম্মানিত মসজিদ। এর দ্বারা দুটি জিনিস উদ্দেশ্য হতে পারে—ক. কাবাঘর এবং খ. কাবাঘরসহ সমগ্র হেরেম এলাকা। মহান আল্লাহ বলেন, ‘যারা কুফরি করে এবং মানুষকে নিবৃত্ত করে আল্লাহর পথ থেকে ও মসজিদুল হারাম থেকে, যা আমি করেছি স্থানীয় ও বহিরাগত সবার জন্য সমান। আর যে ইচ্ছা করে সীমা লঙ্ঘন করে তাতে পাপকাজের, তাকে আমি আস্বাদন করাব মর্মন্তুদ শাস্তি।’ (সুরা : হজ, আয়াত : ২৫)
৩. বালাদুল হারাম : ‘বালাদুল হারাম’ অর্থ সম্মানিত শহর। এর দ্বারা পবিত্র মক্কা নগরী উদ্দেশ্য। শব্দদ্বয় হুবহু হাদিসে পাওয়া যায়। কোরআনে মক্কা নগরী সম্মানিত হওয়ার সপক্ষে একাধিক আয়াত আছে। আল্লাহ বলেন, ‘তারা কি দেখে না আমি হারামকে নিরাপদ স্থান করেছি। অথচ এর চারপাশে যেসব মানুষ আছে তাদের ওপর হামলা করা হয়, তবে কি তারা অসত্যেই বিশ্বাস করবে এবং আল্লাহর অনুগ্রহ অস্বীকার করবে?’
(সুরা : আনকাবুত, আয়াত : ৬৭)
রাসুলুল্লাহ (সা.) মক্কা বিজয়ের দিন বলেন, ‘এই নগরীকে আল্লাহ তাআলা আকাশ ও পৃথিবীর সৃষ্টির দিন থেকে সম্মানিত করেছেন। কাজেই তা আল্লাহর দেওয়া সম্মানের দ্বারা কিয়ামত পর্যন্ত সম্মানিত থাকবে। আমার আগে এখানে যুদ্ধ করা কারো জন্য হালাল ছিল না। আমার জন্যও তা দিনের কেবল কিছু সময়ের জন্য হালাল করা হয়েছিল। অতএব, আল্লাহর দেওয়া সম্মানের দ্বারা কিয়ামত পর্যন্ত তা সম্মানিত থাকবে। এখানকার কাঁটা কর্তন করা যাবে না, শিকার তাড়ানো যাবে না আর পথে পড়ে থাকা জিনিস কেউ ওঠাবে না। তবে সেই ব্যক্তি ওঠাতে পারবে, যে তা ঘোষণা করবে। এখানকার ঘাস কাটা যাবে না। (সহিহ বুখারি, হাদিস : ৩১৮৯)
৪. মাশআরুল হারাম : ‘মাশআরুল হারাম’ অর্থ পবিত্র নিদর্শন। এর দ্বারা উদ্দেশ্য মুজদালিফা। পবিত্র কোরআনে ইরশাদ হয়েছে, ‘যখন তোমরা আরাফাত থেকে প্রত্যাবর্তন করবে, তখন মাশআরুল হারামের নিকট পৌঁছে আল্লাহকে স্মরণ করবে এবং তিনি যেভাবে নির্দেশ দিয়েছেন, ঠিক সেভাবে তাঁকে স্মরণ করবে। যদিও ইতিপূর্বে তোমরা বিভ্রান্তদের অন্তর্ভুক্ত ছিলে।’ (সুরা : বাকারাহ, আয়াত : ১৯৮)
৫. আশহুরুল হারাম : ‘আশহুরুল হারাম’ অর্থ হারাম মাসগুলো। এর দ্বারা উদ্দেশ্য হিজরি বর্ষের বিশেষ চারটি মাস—জিলকদ, জিলহজ, মহররম ও রজব। ইসলামের প্রাথমিক যুগে এসব মাসে যুদ্ধ-বিগ্রহ নিষিদ্ধ ছিল। বেশির ভাগ আলেমের মতে, জিহাদের আয়াত অবতীর্ণ হওয়ার পর এই বিধান রহিত হয়ে যায়। পবিত্র মাসগুলো সম্পর্কে আল্লাহ বলেন, ‘নিশ্চয়ই আকাশমণ্ডলী ও পৃথিবীর সৃষ্টির দিন থেকেই আল্লাহর বিধানে আল্লাহর কাছে মাস গণনায় মাস ১২টি। এর মধ্যে চারটি সম্মানিত মাস, এটাই সুপ্রতিষ্ঠিত বিধান।’ (সুরা : তাওবা, আয়াত : ৩৬)
অন্য আয়াতে ইরশাদ হয়েছে, ‘লোকে তোমাকে পবিত্র মাসে যুদ্ধ করা সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করে; বলো, তাতে যুদ্ধ করা ভীষণ অন্যায়। কিন্তু আল্লাহর পথে বাধা দান করা, আল্লাহকে অস্বীকার করা, মসজিদুল হারামে বাধা দেওয়া এবং তার বাসিন্দাকে তা থেকে বহিষ্কার করা আল্লাহর কাছে তদপেক্ষা অধিক অন্যায়। ফিতনা হত্যা অপেক্ষা গুরুতর অন্যায়।’ (সুরা : বাকারাহ, আয়াত : ২১৭)
৬. মদিনা নগরী : এ ছাড়া মদিনা নগরীকে মহানবী (সা.) হারাম ঘোষণা করেছেন। তিনি বলেন, ‘মদিনার আইর ও সওর পর্বতের মাঝখানের স্থানটুকু হারাম।’
(সহিহ মুসলিম, হাদিস : ৩৩৯৩)
হারাম ঘোষণার উদ্দেশ্য
মহান আল্লাহ কিছু স্থান ও সময়কে হারাম ঘোষণা করেছেন, যেন মানুষ তাদের অহংকার, অহমিকা, আভিজাত্যের বড়াই, আজন্মলালিত ঘৃণা, বিদ্বেষ ও শত্রুতা ভুলে শান্তি ও নিরাপত্তার সঙ্গে সমবেত হতে পারে। আর এককাতারে দাঁড়িয়ে এসব মানসিক সংকট ও সংকীর্ণতা কাটিয়ে উঠতে পারে এবং পরস্পরকে ভাই মনে করতে পারে। আর তা এভাবে যে, ব্যক্তি নিজের ব্যক্তিগত, গোষ্ঠীগত ও আঞ্চলিক চিন্তা-চেতনা ও জীবনের ওপর আল্লাহর বিধানকে প্রাধান্য দিল। সবাই প্রতিপক্ষের প্রতি অন্যায় করা, এমনকি প্রতিশোধ গ্রহণ থেকেও বিরত থাকল। তার মুখ ও হাত থেকে মানুষসহ সব সৃষ্টজীব নিরাপত্তা লাভ করল। (তাফসিরে শারভি, পৃষ্ঠা-৯৭৬৬)
আল্লাহ সবাইকে দ্বিনের সঠিক জ্ঞান দান করুন। আমিন।