দেশে জাতীয় সরকারের আদলে গঠন হবে স্থানীয় সরকারব্যবস্থা। দুটি অংশে বিভক্ত থাকবে স্থানীয় সরকার। সংসদ সদস্যরা যেভাবে সরকারপ্রধান নির্বাচন করেন, সেভাবেই স্থানীয় সরকারের নির্বাহী প্রধান নির্বাচন করবেন নির্বাচিত মেম্বার বা কাউন্সিলররা। জাতীয় সংসদের স্পিকারের মতো একজন সভাধ্যক্ষও নির্বাচন করবেন তাঁরা। এই সভাধ্যক্ষ স্থানীয় সরকারের নির্বাহী প্রধান অর্থাৎ চেয়ারম্যান বা মেয়রের পরামর্শে সভা বা অধিবেশন ডাকবেন। জাতীয় সংসদে যেমন বিরোধী নেতা থাকেন, স্থানীয় সরকারেও তেমনি একজন বিরোধী নেতা নির্বাচনের সুপারিশ করা হয়েছে।
গতকাল প্রধান উপদেষ্টার কার্যালয় পেশ করা স্থানীয় সরকার সংস্কার কমিশনের প্রাথমিক প্রতিবেদনে এসব সুপারিশ উঠে এসেছে। প্রেস উইং থেকে প্রতিবেদনের এসব তথ্য প্রকাশ করা হয়। পূর্ণাঙ্গ প্রতিবেদন চূড়ান্ত করতে আরও সময় প্রয়োজন বলে জানিয়েছে কমিশন। এর আগে প্রথম দফায় গঠিত ৬ সংস্কার কমিশনের রিপোর্ট প্রধান উপদেষ্টার কাছে জমা দিয়েছে সংশ্লিষ্ট কমিশনগুলো। গত ১৮ নভেম্বর দ্বিতীয় ধাপে গণমাধ্যম, স্বাস্থ্য, শ্রম, নারীবিষয়ক এবং স্থানীয় সরকার সংস্কার কমিশনসহ পাঁচটি সংস্কার কমিশন গঠন করে অন্তর্বর্তী সরকার। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের লোকপ্রশাসন বিভাগের সাবেক চেয়ারম্যান অধ্যাপক তোফায়েল আহমেদকে প্রধান করে ৭ সদস্যের সংস্কার কমিশন গঠন করা হয়। গত বছরের ডিসেম্বরের মাঝামাঝি কাজের জন্য ১৫টি ক্ষেত্র নির্ধারণ করে প্রতিবেদনের কাঠামো গঠন করা হয়।
সংস্কার কমিশনের সুপারিশের সারসংক্ষেপ পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, স্থানীয় সরকারে ডিসি, ইউএনওর প্রভাব কমিয়ে নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের অংশীদারত্ব বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। বলা হয়েছে, জেলার সব উন্নয়ন দপ্তর থাকবে জেলা পরিষদের চেয়ারম্যানের অধীনে; যুগ্মসচিব পদমর্যাদার একজন কর্মকর্তা হবেন জেলা পরিষদের মুখ্য সচিব; ডেপুটি কমিশনার (ডিসি) জাতীয় সরকারের প্রতিনিধিত্ব করবেন, তাঁর হাতে থাকবে শুধু ভূমিব্যবস্থাপনা।
প্রাথমিক প্রতিবেদনের সারসংক্ষেপে বলা হয়েছে, জেলা পরিষদের অনুরূপ উপজেলা ও ইউনিয়নের কার্যাদি ও অর্থসম্পদ স্ব-স্ব পরিষদের অধীনে থাকবে। তিনটি পৃথক আইনের বদলে ইউপি, উপজেলা ও জেলা পরিষদকে একক আইনে আনা হবে। পৌরসভা ও সিটি করপোরেশনের জন্য হবে আরেকটি আইন। নতুন আইনের অধীনে একই তফসিলে পাঁচ প্রতিষ্ঠানের নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে।
দেশের গ্রাম ও নগরের মধ্যে পার্থক্য ঘোচাতে গ্রাম-নগরনির্বিশেষে দুটি অংশে বিভক্ত থাকবে। একটি বিধানিক অংশ এবং অপরটি হবে নির্বাহী অংশ। বিধানিক অংশের প্রধান হবেন সভাধ্যক্ষ (জাতীয় সংসদের স্পিকারের অনুরূপ)। নির্বাহী অংশের প্রধান হবেন চেয়ারম্যান বা মেয়র। নির্বাচন অনুষ্ঠানের পর নির্বাচন কমিশন কর্তৃক গেজেট জারি হলে নির্বাচিত সব সদস্য ভোটারদের উপস্থিতিতে নিজ নিজ ধর্মগ্রন্থে হাত রেখে আইনে নির্ধারিত একটি শপথনামা পাঠ করবেন। শপথ গ্রহণের পর পরিষদের সদস্যদের ভোটে একজন সভাধ্যক্ষ নির্বাচিত হবেন। নির্বাচন কমিশনের একজন প্রতিনিধি উপস্থিত থেকে শপথের পর সভাধ্যক্ষ নির্বাচনের মনোনয়ন গ্রহণ করবেন এবং গোপন ব্যালটের মাধ্যমে সভাধ্যক্ষ নির্বাচন করবেন। নির্বাচিত সভাধ্যক্ষ এবার তাঁর সভাপতিত্বে গ্রাম বা নগরের নির্বাহী প্রধান হিসেবে চেয়ারম্যান বা মেয়র নির্বাচন করবেন। পরিষদের অভ্যন্তরে গোপন ব্যালটে সাধারণ সদস্যদের মধ্য থেকে চেয়ারম্যান বা মেয়র নির্বাচিত হবেন। চেয়ারম্যান নির্বাচিত হওয়ার পর তিনি পরিষদ নেতা হিসেবে তাঁর আসনে বসবেন এবং আইন অনুযায়ী তিন বা পাঁচ সদস্যবিশিষ্ট নির্বাহী কাউন্সিল গঠন করে তা পরিষদের অবগতির জন্য সভাধ্যক্ষের কাছে পেশ করবেন। নির্বাহী পরিষদের এক-তৃতীয়াংশ নারী সদস্য রাখতে হবে।
চেয়ারম্যান পরিষদ বা মেয়র কাউন্সিল গঠনের পর সভাধ্যক্ষ একজন ছায়া পরিষদ নেতা নির্বাচনের আহ্বান জানাবেন। ছায়া পরিষদ নেতা পরিষদ বা কাউন্সিলে বিরোধী নেতা হিসেবে স্বীকৃতি পাবেন। চেয়ারম্যান, মেয়র ও নির্বাহী কাউন্সিলের সদস্য ব্যতীত অন্য সব সদস্য ছায়া পরিষদ নেতাকে ভোট দিতে পারবেন। জাতীয় সরকারের মতো স্থানীয় সরকারেও স্থায়ী কমিটি গঠনের সুপারিশ করা হয়েছে প্রাথমিক প্রতিবেদনে। ইউপিতে ৬টি, উপজেলা পরিষদে ১০টি, জেলা পরিষদে ১০টি, পৌরসভায় ৬টি এবং সিটি করপোরেশনে সর্বোচ্চ ১০টি স্থায়ী কমিটি থাকবে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, চেয়ারম্যান, মেয়র ও নির্বাহী কাউন্সিলের সদস্যরা হবেন পরিষদ, পৌরসভা ও সিটি করপোরেশনের সার্বক্ষণিক দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মী। তাঁরা নিয়মিত বেতন-ভাতার অধিকারী হবেন। চেয়ারম্যান ও মেয়ররা স্ব-স্ব প্রতিষ্ঠানের প্রধান নির্বাহী হিসেবে গণ্য হবেন। তাঁরা নিয়োগপ্রাপ্ত নির্বাহীর এক স্তর ওপরের গ্রেডে বেতন-ভাতাদি পাবেন। নির্বাহী কাউন্সিলের সদস্যরা সরকারি চাকরিতে প্রবেশকালীন প্রথম শ্রেণির কর্মকর্তার সমান বেতন-ভাতাদি পাবেন। স্থায়ী কমিটির চেয়ারম্যান ও সদস্যরা অবৈতনিক হবেন। তবে তাঁরা সভায় উপস্থিতির জন্য ভাতা পেতে পারেন বলে সুপারিশে উল্লেখ করা হয়েছে।
স্থানীয় সরকারের বাইরের পার্বত্য অঞ্চল-সম্পর্কিত সুপারিশে বাজার ফান্ড প্রতিষ্ঠানটি বিলুপ্ত করার সুপারিশ করে বাকি ছয়টি প্রতিষ্ঠান অক্ষুণœ রাখার কথা বলা হয়েছে। বাজার ফান্ডের পরিবর্তে রাজস্ব আহরণের জন্য উপজেলা পরিষদের নিয়ন্ত্রণে উপজেলা নির্বাহী অফিসার, সহকারী কমিশনার (ভূমি) ও উপজেলা পরিষদ সভাপতির সভাপতিত্বে একটি কমিটি গঠনের মাধ্যমে রাজস্ব আহরণের সুপারিশ করা হয়েছে।