১৯৭১ সালের মার্চ মাসের তদানীন্তন পূর্ব পাকিস্তানে শুরু হওয়া গোলযোগ প্রতিদিনই নতুন মোড় নিয়ে নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গিয়েছিল। শেখ মুজিবুর রহমানের সাতই মার্চের ভাষণের পর থেকে পূর্ব পাকিস্তান কার্যত তার নির্দেশেই পরিচালিত হচ্ছিল। এ পরিস্থিতিতে শেখ মুজিবের সঙ্গে আলোচনার উদ্দেশ্যে ১৫ মার্চ ইয়াহিয়া খান ঢাকায় আসেন এবং ১৭ মার্চ থেকে আলোচনা শুরু হয়। ২১ মার্চ জুলফিকার আলী ভুট্টো ঢাকায় আসেন এবং তিনিও সাংবিধানিক উপায়ে সংকট নিরসনের উদ্দেশ্যে প্রেসিডেন্টের সঙ্গে আলোচনা করেন। আলোচনায় কোনো অগ্রগতি না হওয়ায় সামরিক জান্তা চূড়ান্ত আঘাত হানার সিদ্ধান্ত নেয় এবং ইতিহাসের কালো অধ্যায়ের সূচনা ঘটে ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ মধ্যরাতে।
১৯৭১ সালের জুলাই মাসে সাউথ এশিয়ান রিভিউ-এ প্রকাশিত খ্যাতিমান অর্থনীতিবিদ রেহমান সোবহান উল্লেখ করেছেন, ‘১৯৭১ সালের ৬ মার্চের ভাষণে ইয়াহিয়া খান পূর্ব পাকিস্তান সংকটের জন্য মুজিবকে দায়ী করে জনগণকে আরও উসকানি দেন। ভাষণে তিনি ভুট্টোর নাম পর্যন্ত উল্লেখ করেননি। তিনি ২৫ মার্চ জাতীয় পরিষদের অধিবেশন পুনরায় আহ্বান করলেও তা বিলম্বিত ও অপর্যাপ্ত বিবেচিত হয়েছে এবং যে প্রেক্ষাপটে অধিবেশন আহ্বান করা হয়েছে তা চলমান পরিস্থিতিতে কার্যত অযৌক্তিক হয়ে পড়ে। অনেকে বিশ্বাস করেছিলেন যে মুজিব ৭ মার্চের জনসমাবেশকে স্বাধীনতা ঘোষণার জন্য ব্যবহার করবেন। কারণ ইয়াহিয়া তার আগের সিদ্ধান্তের কারণে যে পরিস্থিতির উদ্ভব ঘটেছে, সে সম্পর্কে কথা বলার কোনো ইচ্ছা ব্যক্ত করেননি। তা ছাড়া ৭ মার্চ এ ধরনের ঘোষণা করা হলে সেনাবাহিনীকে পূর্ণ সতর্কাবস্থায় রাখা হয়েছিল পদক্ষেপ গ্রহণের জন্য।’
তিনি আরও বলেন, ‘মুজিব উপলব্ধি করেছিলেন যে এ ধরনের ঘোষণা করা হলে বাঙালির ওপর ব্যাপক হত্যাযজ্ঞ চালানো হবে এবং তিনি এর দায়দায়িত্ব গ্রহণ করতে অনিচ্ছুক ছিলেন। তার সিদ্ধান্ত ছিল অসহযোগিতা বজায় রেখে পাকিস্তানের মধ্যে নিষ্পত্তির জন্য আলোচনার পথ উন্মুক্ত রাখা, এবং রাজপথ ও সেনাবাহিনীর পাল্টা চাপের মধ্যে একটি সমঝোতায় উপনীত হওয়া। সন্দেহ নেই যে ১ ও ৭ মার্চের মধ্যে স্বাধীনতা ঘোষণার জন্য তিনি প্রচ- চাপের মধ্যে ছিলেন এবং তার ওপর এ চাপ আরও বৃদ্ধি পায় ইয়াহিয়া খানের ৬ মার্চের ভাষণের পর। কিন্তু ৭ মার্চ বিকালের মধ্যে তিনি সফলতার এই এসব চাপ কাটিয়ে উঠতে সক্ষম হন এবং বলেন যে তার দল পাকিস্তানের কাঠামোর মধ্যে আলোচনা করতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।’
সেনাবাহিনীর কারও বুঝতে অসুবিধা ছিল না যে ইয়াহিয়া খান শক্তি প্রয়োগ করতে চেয়েছিলেন। এর পরিণতি কী হতে পারে, তা যেকোনো পাগলের পক্ষেও বোঝা সম্ভব ছিল। যেহেতু তিনি তার মনোভাব সম্পর্কে লিখিতভাবে কিছু রেখে যাননি, অথবা তার ইচ্ছা বা পরিকল্পনা সম্পর্কে তার ঘনিষ্ঠ কাউকে কিছু বলে যাননি, অতএব প্রামাণ্য রেকর্ড না থাকায় তার উদ্দেশ্য সম্পর্কে অনুমান করা ছাড়া কোনো উপায় নেই। অনেকে বিশ্বাস করেন যে ইয়াহিয়া খান ইচ্ছাকৃতভাবে পূর্ব পাকিস্তানকে বিচ্ছিন্ন হওয়ার সুযোগ দিয়েছেন। কারণ তার পক্ষে উপলব্ধি করা কঠিন ছিল না যে আলোচনার টেবিলে সমস্যার সমাধান করা সম্ভব হবে না। সম্ভবত তিনি পাকিস্তানের অতীতের ফেডারেল সরকারগুলোর অবস্থা থেকে দেখেছেন যে কারও পক্ষেই পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তানের মধ্যে সব ক্ষেত্রে বিরাজমান সমস্যা সমাধান করা সম্ভব হয়নি। সে ক্ষেত্রে একটি অন্তর্বর্তী সরকারের পক্ষে তা কীভাবে সম্ভব হতে পারে? তা ছাড়া তিনি যেভাবে নিজেকে রাজনীতিতে জড়িয়ে ফেলেছিলেন, তাতে তার প্রাথমিক প্রতিশ্রুতিগুলো, বিশেষ করে একটি সংবিধান গঠনের জন্য প্রাপ্তবয়স্কদের ভোটাধিকারের ভিত্তিতে নির্বাচন অনুষ্ঠান করা, তা থেকে তাকে সরে আসতে হয়েছে। অতএব তার মধ্যে পরিস্থিতি যেদিকে যায় যাক, এমন একটি মনোভাব সৃষ্টি হয়েছিল।
ধারণা করা হয়েছিল যে প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খান শেখ মুজিবের সঙ্গে আলোচনা অব্যাহত রাখবেন, এমনকি যদি মুজিবের সঙ্গে প্রতারণামূলক কৌশলও অবলম্বন করতে হয় এবং ভুট্টো যদি আলোচনার ফলাফলে সম্মত না-ও হন, তবু তিনি ২৫ মার্চ ঘোষণা দেবেন আওয়ামী লীগের দাবি মেনে নেওয়ার পক্ষে। ২৫ মার্চের অপারেশন সার্চলাইটের পরিকল্পনার মধ্যে ছিল সর্বোচ্চসংখ্যক রাজনৈতিক ও ছাত্রনেতাকে গ্রেপ্তার করা। ঢাকা ইউনিভার্সিটির ইকবাল হল (সার্জেন্ট জহুরুল হক হল) ও জগন্নাথ হল এবং প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের লিয়াকত হল ঘেরাও করে অবৈধ অস্ত্র উদ্ধার এবং ছাত্রনেতাদের গ্রেপ্তার করা।
অপারেশন সার্চলাইট চালানোর জন্য কোনো লিখিত আদেশ ইস্যু করা হয়নি। এ অপারেশন বাস্তবায়ন করা হয় মৌখিক আদেশে। মেজর জেনারেল (অব.) খাদিম হোসেন রাজা তার ‘অ্যা স্ট্রেঞ্জার ইন মাই ওন কান্ট্রি’ গ্রন্থে উল্লেখ করেছেন যে আদেশ বলতে কেবল একটি গাইডলাইন তৈরি করা হয়েছিল মাত্র। সংকট ঘনীভূত হচ্ছে দেখে পূর্ব পাকিস্তানে নিয়োজিত পশ্চিম পাকিস্তানি সেনা কমান্ডাররা পূর্ব পাকিস্তানের স্থায়ী ও অস্থায়ী সেনানিবাসগুলো থেকে ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের সৈনিকদের নানা ছলচাতুরির মধ্য দিয়ে তাদের স্থায়ী অবস্থান থেকে ছোট ছোট গ্রুপে ভাগ করে বিভিন্ন সেনানিবাসে পাঠিয়ে দেয়। যার ফলে বাঙালি সৈন্যরা ঐক্যবদ্ধভাবে তাৎক্ষণিক পদক্ষেপ গ্রহণের সামর্থ্য হারায়। চট্টগ্রামে মেজর জিয়াউর রহমান কর্তৃক আনুষ্ঠানিক বিদ্রোহ ঘোষণার আগে তারা ঐক্যবদ্ধ উদ্যোগ গ্রহণ করতে পারেনি। তাকে অনুসরণ করে দেশের অন্যান্য স্থানেও বাঙালি সৈনিকরা সীমিত সামর্থ্য নিয়ে বিদ্রোহ করে।
পরিস্থিতি বিস্ফোরণোন্মুখ হয়ে উঠেছিল। মেজর জেনারেল খাদিম হোসেন রাজা আরও উল্লেখ করেছেন, ‘আলোচনার মাধ্যমে সংকট উত্তরণের সব আশা পরিত্যাগ করা হয়েছিল। ২৫ মার্চ দুপুরের পর আমাকে নির্দেশ দেওয়া হলো ২৫ ও ২৬ মার্চের মধ্যবর্তী রাতে অপারেশন সার্চলাইট পরিচালনা করতে। এটা একটি তাৎপর্যপূর্ণ সিদ্ধান্ত এবং আমি দেশের জন্য অত্যন্ত দুঃখ অনুভব করলাম। দেশের সর্বোচ্চ কর্তৃপক্ষ পূর্ব পাকিস্তানের জনগণকে চরম বিপদ ও অস্বস্তির মধ্যে ফেলতে যাচ্ছে। ইয়াহিয়া খান দৃশ্যত পূর্ব পাকিস্তানকে পরিত্যাগ করার এবং তাদের নিজ উপায়ে চলতে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন। মনে হয় তিনি কেবল তার ব্যক্তিগত নিরাপত্তার কথা ভেবেছেন। অতএব তিনি ২৫ মার্চ সন্ধ্য ৭টায় একধরনের গোপনীয়তার মধ্যে ঢাকা ত্যাগ করেন। এভাবে তিনি অন্য কাউকে নয়, নিজেকেই বোকা বানিয়েছেন।’
রাজার বর্ণনা অনুযায়ী, ‘প্রেসিডেন্টের ঢাকা ত্যাগ করার পর ঢাকার গুরুত্বপূর্ণ সব রাস্তায় বিভিন্ন উপায়ে ব্যারিকেড স্থাপন করা হয়েছিল, যাতে সৈন্যদের যানবাহন চলাচলে বিঘ্ন ঘটে। এত অধিকসংখ্যক ব্যারিকেড স্থাপন করা হয়েছিল যেন প্রতিটি নাগরিক রাস্তায় ব্যারিকেড দেওয়ার ব্যাপারে পেশাদারত্ব অর্জন করেছে। সৈন্যরা ব্যারাকে প্রস্তুতি গ্রহণ শুরু করেছিল। রিকয়েললেস রাইফেল এবং আর্টিলারি ব্যবহার করার সিদ্ধান্ত বাতিল করা হলেও পরে তা প্রত্যাহার করে শেষরাতের দিকে বেশ কিছু টার্গেটে আর্টিলারি ব্যবহার করা হয়। কমান্ডো ব্যাটালিয়নের লে. কর্নেল জেড এ খানকে বলা হয়, ৪০ জন সৈনিক নিয়ে শেখ মুজিবকে জীবিত আটক করা হবে। তিনি শেখ মুজিবকে জানতেন না। যিনি তাকে ব্যক্তিগতভাবে জানতেন, তিনি ছিলেন লে. কর্নেল এস ডি আহমেদ। তাকে বলা হয়েছিল, যাতে কোনো ধরনের ভুল না করা হয় এবং শেখ মুজিবের সঙ্গে সম্মানজনক আচরণ করা হয়। এ অভিযানে তেমন প্রতিবন্ধতার মুখে পড়তে হয়নি। তারা শেখ মুজিবকে অক্ষত আটক করতে সক্ষম হন এবং শেখ মুজিবকে গ্রেপ্তার করে নির্মাণাধীন জাতীয় পরিষদ ভবনে নেওয়া হয়।’
মেজর এস জি জিলানী, যিনি গভর্নরের এডিসি হিসেবে দায়িত্ব পালন করছিলেন, তিনি তার ‘ফিফটিন গভর্নরস আই সার্ভড উইথ’ নামে স্মৃতিচারণমূলক গ্রন্থে উল্লেখ করেছেন : “শেখ মুজিবের সঙ্গে কথা বলার সময় তিনি (লে. কর্নেল আহমেদ) তাকে দুঃখজনক ঘটনার জন্য দায়ী করেন এবং বলেন যে, জাতীয় পরিষদ ভবনের সিঁড়ি দিয়ে তার পা ফেলার কথা প্রধানমন্ত্রী হিসেবে, বন্দি হিসেবে নয়। শেখ মুজিব নিজেকে নির্দোষ দাবি করে বলেন, তিনি প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খানের সঙ্গে ঐকমত্যে পৌঁছার আশা করছিলেন। স্পেশাল সার্ভিস গ্রুপের কোম্পানি কমান্ডার তরুণ ক্যাপ্টেন বিলাল ছিলেন আরেকজন অফিসার, যিনি শেখ মুজিবের সঙ্গে কিছু বাক্যবিনিময় করেন। তিনি ভেবেছিলেন হাজার হাজার কর্মী ও সশস্ত্র পুলিশের প্রহরায় থাকা শেখ মুজিবের মতো একজন জনপ্রিয় ব্যক্তিত্বকে আটক করা বিপজ্জনক অভিযান হবে। কিন্তু তার বাহিনী যখন শেখ মুজিবের বাড়ির এলাকায় প্রবেশ করে, তখন সবাই পালিয়ে গিয়েছিল। তিনি শেখ মুজিবের কাছে জানতে চান তার জন্য একজন ব্যক্তিও জীবন দেওয়ার জন্য সামনে এগিয়ে আসেনি কেন? মুজিব রসিকতা করে বলেন, ‘ক্যাপ্টেন সাহেব, আপনি কী জানেন না যে বাঙালিরা কেমন বেইমান?’”
১৯৭২ সালের জানুয়ারি মাসে ব্রিটিশ সাংবাদিক ডেভিড ফ্রস্টের সঙ্গে সাক্ষাৎকারে শেখ মুজিব ২৫ মার্চ রাতে তাকে আটক করা সম্পর্কে বলেন, ‘সেই সন্ধ্যায় আমার বাড়ি কমান্ডোদের দ্বারা পরিবেষ্টিত ছিল এবং আমি বাড়ি থেকে বের হলে তারা আমাকে হত্যা করতে চেয়েছিল। তারা আমার নিজস্ব কিছু লোকের নাম উচ্চারণ করে বলে যে মুজিবুর রহমান বাংলাদেশের চরমপন্থিদের হাতে নিহত হয়েছে বলে তারা প্রচার করবে। এরপর তারা সিদ্ধান্ত নেয় যে তারা বিশ্বকে বলবে, আমরা যখন মুজিবুর রহমানের সঙ্গে আলোচনা করছিলাম; কিছু চরমপন্থি মুজিবুর রহমানকে হত্যা করেছে। এটাই ছিল তাদের প্রথম পরিকল্পনা। আমি জানতাম, তারা নিষ্ঠুর বর্বর। তারা আমার সমগ্র জনগণকে হত্যা করবে। তারা ধ্বংসযজ্ঞ চালাবে। আমি ভাবলাম যে আমার জন্য মৃত্যুবরণ করাই উত্তম। তাতে অন্ততপক্ষে আমার জনগণ রক্ষা পাবে, যারা আমাকে এত ভালোবাসে। আমি তাদের ভালোবাসি এবং আমি তাদের জীবন রক্ষা করতে চেয়েছি। কিন্তু ওই সব বর্বর আমাকে গ্রেপ্তার করে।’
ডেভিড ফ্রস্ট জানতে চান, তারা কীভাবে তাকে আটক করেছিল। শেখ মুজিব উত্তর দেন, তারা প্রথমে আমার বাড়ির ওপর মেশিনগানের গুলি ছুড়েছিল। আমি আমার বেডরুমে বসে ছিলাম, তারা ওই দিক থেকে (শেখ মুজিব তাকে জানালা দেখান) মেশিনগানের গুলি চালাতে শুরু করে। কিছু মেশিনগান এদিকে ছিল এবং ওই দিক থেকে তারা জানালা লক্ষ্য করে গুলি চালাতে থাকে। একটি গুলি আমার বেডরুমে প্রবেশ করে। আমার ছয় বছর বয়সি ছেলে বিছানায় শুয়ে ছিল। আমি আমার স্ত্রীকে বলি দুই সন্তানকে নিয়ে এখানে বসে থাকতে। আমার স্ত্রী একটি শব্দও উচ্চারণ করেনি। আমি কেবল তাকে একটি বিদায় চুম্বন করেছিলাম। আমি দরজা খুলে বের হই এবং তাদের গুলি বন্ধ করতে বলি। আমি বলি, ‘গুলি বন্ধ কর। আমি তো এখানেই। তোমরা গুলি করছো কেন? কী কারণে?’ এই সামরিক লোকগুলো আমাকে আঘাত করার জন্য বেয়নেট উঁচিয়ে সব দিক থেকে আমার দিকে ছুটে আসতে থাকে। একজন অফিসার ঠিক এখানে ছিলেন। তিনি আমাকে ধরে বলেন, ‘তাকে হত্যা করো না।’ এরপর তারা আমাকে টেনে নিয়ে যেতে থাকে এবং পেছন থেকে আমার পায়ে আঘাত করতে শুরু করে। তাদের বন্দুকের বাঁট দিয়ে পিঠে গুঁতো দিতে দিতে এদিক-সেদিক ধাক্কা দিতে থাকে। অফিসার আমাকে ধরে রাখা সত্ত্বেও তারা আমাকে টেনেহিঁচড়ে নামাতে শুরু করে। আমি বললাম, ‘আমাকে নিয়ে টানাহ্যাঁচড়া করো না। দাঁড়াও আমার পাইপ এবং তামাক নিতে দাও অথবা আমার স্ত্রীর কাছ থেকে নিয়ে এসো। আমার পাইপ প্রয়োজন।’ এরপর আমি আবারও আসি এবং আমার দুই সন্তানকে নিয়ে আমার স্ত্রীকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখি। তারা আমার জন্য পাইপ এবং একটি ছোট স্যুটকেস নিয়ে আসে। আমি সর্বত্র আগুনে সবকিছু জ্বলতে দেখি।’
শেখ মুজিবকে গ্রেপ্তার করা সম্পর্কে মেজর (পরবর্তী সময়ে ব্রিগেডিয়ার) তার গ্রন্থ ‘উইটনেস টু সারেন্ডার’-এ উল্লেখ করেছেন, “যারা তার বাড়ি প্রহরায় নিয়োজিত ছিল তাদের নিরস্ত্র করে ৫০ জন সৈন্য চার ফুট উঁচু বেষ্টনী প্রাচীর ডিঙিয়ে ভিতরে প্রবেশ করে। তারা আঙিনায় গিয়ে স্টেনগানের ব্রাশফায়ার করে তাদের উপস্থিতি ঘোষণা করে এবং শেখ মুজিবের নাম ধরে চিৎকার করে ডাকে। কিন্তু কোনো সাড়া ছিল না। তারা সিঁড়ি দিয়ে ওপরে শেখ মুজিবের বেডরুমের দরজা খুঁজে পায়। দরজা বাইরে থেকে তালাবদ্ধ ছিল। গুলি ছুড়ে তালা ভেঙে ফেলা হয়। এরপর মুজিব বের হয়ে আসেন। মনে হচ্ছিল তিনি এর জন্যই অপেক্ষা করছিলেন। একটু পর ৫৭ ব্রিগেডের মেজর জাফরকে ওয়্যারলেসে বলতে শোনা যায়, ‘বিগ বার্ড ইন দ্য কেজ, আদারস নট ইন দেয়ার নেস্টস’ (বড় পাখি এখন খাঁচায়, অন্যেরা তাদের বাসায় নেই)।”
পরদিন ২৬ মার্চ গভর্নরের এডিসি মেজর জিলানী পরিস্থিতি দেখার জন্য শহর প্রদক্ষিণ করেন। এ সম্পর্কে তিনি তার গ্র্রন্থে উল্লেখ করেন : ‘ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইকবাল হল এবং পুলিশ লাইনের মতো কিছু স্থান দেখতে বের হই, যেখান থেকে অস্ত্রধারী লোকজন সেনাবাহিনীর ওপর গুলি ছুড়েছিল। সেনাবাহিনীর সদস্যরা পাল্টা আক্রমণ করায় বহু হতাহতের ঘটনা ঘটেছে। ২৬ মার্চ রাতে প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খান করাচি থেকে দেওয়া তার বেতার ভাষণে শেখ মুজিবের সঙ্গে যৌক্তিক নিষ্পত্তিতে উপনীত হওয়ার জন্য তার প্রচেষ্টার বিস্তারিত তুলে ধরেন এবং রাজনৈতিক ঘটনাবলির বিবরণ দেন, যার পরিপ্রেক্ষিতে পাকিস্তানের অখন্ডতা বজায় রাখার স্বার্থে সেনাবাহিনীর পদক্ষেপ অত্যাবশ্যকীয় হয়ে উঠেছিল।’
শেখ মুজিবুর রহমানকে জাতীয় পরিষদ ভবন থেকে ক্যান্টনমেন্টে একটি স্কুলে এনে রাখা হয়। সেখান থেকে তাকে স্থানান্তর করা হয় কমান্ড হাউসের গেস্টরুমে। এ সম্পর্কে মেজর জিলানী লিখেছেন : ‘যেহেতু তিনি একজন গুরুত্বপূর্ণ নিরাপত্তা বন্দি ছিলেন এবং আশঙ্কা করা হয়েছিল যে কোনো বিদেশি শক্তি, বিশেষ করে ভারত তাকে বের করে নিয়ে যেতে চেষ্টা করতে পারে, সেজন্য তাকে এক স্থানে না রেখে প্রায়ই তাকে স্থান বদল করে রাখা হচ্ছিল। তাকে পশ্চিম পাকিস্তানে পাঠানোর উদ্যোগ দুবার বাতিল করা হয় একেবারে শেষ মুহূর্তে। কারণ সন্দেহের সৃষ্টি হয়েছিল যে ভারতীয় গোয়েন্দাদের কাছে তার গতিবিধি জানাজানি হয়েছে এবং তাকে বহনকারী বিমানের পথ রুদ্ধ করা হতে পারে। অবশেষে ১ এপ্রিল তাকে পশ্চিম পাকিস্তানে পাঠানো হয়। তাড়াহুড়ার কারণে শেখ মুজিবের স্যুটকেস গাড়ির বুটে রয়ে যায় এবং পরবর্তী ফ্লাইটে সেটি পাঠানো হয়।’
শেখ মুজিবের সঙ্গে আলোচনা ভেঙে যাওয়া প্রসঙ্গে ইয়াহিয়া খান ১৯৭১ সালের সেপ্টেম্বর মাসে প্যারিসের বিখ্যাত ‘লা ফিগারো’ পত্রিকার সাংবাদিক পিয়ার বোয়াকে বলেন, ‘আলোচনা ভেঙে গিয়েছিল মুজিবুর রহমানের দোষে। আপনি জানেন, তিনি হয়তো একজন প্রতিভাবান বক্তা। কিন্তু তিনি আদৌ একজন ভালো নেতা বা প্রশাসক হতে পারেননি। তিনি মেধাবী এবং জনসমক্ষে নিজের সম্পর্কে খুব আস্থাবান; কিন্তু আমার সামনে তিনি এমন কিছুর অধিক নন... কীভাবে আমি তাকে বর্ণনা করতে পারি? একটি ‘ছোট্ট বিড়াল’-এর চেয়ে বেশি কিছু নয়। একটি দেশ পরিচালনার জন্য সাধারণ বিচারবুদ্ধি প্রয়োজন। আমি নিজে একজন সৈনিক। শাসন করার জন্য আমাকে গড়ে তোলা হয়নি। আমি আমার সাধারণ বুদ্ধির ওপর নির্ভর করি। মুজিবুর রহমান কিছুটা ফ্যাসিস্ট, যার কোনো মাত্রাজ্ঞান নেই। জনগণ তাকে নির্বাচিত করে তার স্বায়ত্তশাসনের কর্মসূচির কারণে। কিন্তু মোহগ্রস্ত হয়ে তিনি সঙ্গে সঙ্গে স্বাধীনতার কথা বলতে শুরু করেন।’
ইয়াহিয়া আরও বলেন, “একদিকে মুজিবুর রহমান পূর্ব পাকিস্তানে সংখ্যাগরিষ্ঠ আসন পেয়েছিলেন, অন্যদিকে ভুট্টো পশ্চিম পাকিস্তানে সংখ্যাগরিষ্ঠ আসন লাভ করেন। আমি চেয়েছিলাম দুই নির্বাচিত সংখ্যাগরিষ্ঠ দল সামরিক শাসনের পরিবর্তে বেসামরিক শাসন প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে একটি সংবিধান প্রণয়ন করবে। কিন্তু মুজিবুর রহমানের সঙ্গে আলোচনা অসম্ভব ব্যাপার। মুজিবুর আমাকে বলেন, ‘আপনি যদি আমার সঙ্গে একটি চুক্তিতে স্বাক্ষর না করেন, তাহলে আগামীকাল পূর্ব পাকিস্তানে একটি বিদ্রোহ ঘটবে।’ আমি তার দিকে তাকিয়ে বললাম, ‘ঠিক আছে, আপনি আপনার বিপ্লব নিয়ে এগিয়ে যান।’” প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া দীর্ঘ নিঃশ্বাস ফেলে বলেন, ‘আমি তার জন্য আসলেই দুঃখিত।’
১৯৭৫ সালে ভারতের ইলাসট্রেটেড উইকলি অব ইন্ডিয়ার সম্পাদক খুশবন্ত সিংয়ের সঙ্গে সাক্ষাৎকারে ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ রাতে ‘অপারেশন সার্চলাইট’-এর জন্য দায়ী জেনারেল টিক্কা খান বলেন, ‘দেশের অনেক স্থানে ভারী গুলিবিনিময়ের ঘটনা ঘটছিল। ঢাকায় আমরা সারা রাত ধরে প্রতিরোধের স্থানগুলোকে ঝুঁকিমুক্ত করার জন্য অভিযান চালিয়েছি। সকালের মধ্যে পরিস্থিতি পুরোপুরি আমাদের নিয়ন্ত্রণে চলে আসে। আপনাদের (ভারতীয়) সংবাদপত্র সেগুলোকে অনুসরণ করে বিদেশি সংবাদপত্রগুলো রিপোর্ট প্রকাশ করেছে যে ২৫ মার্চ রাতে ও ২৬ মার্চ ঢাকায় ৭ হাজার লোক নিহত হয়েছে। নিহত ব্যক্তির প্রকৃত সংখ্যা ১০০-এর নিচে ছিল। সঠিক সংখ্যা ৯৭। আমি নির্দেশ দিয়েছিলাম সব মৃতদেহ দুটি হাসপাতালে আনার জন্য। একটি হাসপাতালে ছিল ৬৬টি, অন্য হাসপাতালে ৩১টি, অর্থাৎ মোট ৯৭টি। ধরা যাক, দুটি বা তিনটি মৃতদেহ পাওয়া যায়নি অথবা তাদের আত্মীয়স্বজন নিয়ে গেছে এবং সব মিলিয়ে ১০০টি। এটিকে ৭০ দিয়ে গুণ করুন, তাহলেই ভারতীয়রা যে সংখ্যা বলেছে তা পেয়ে যাবেন।’ তিনি আরও বলেন, ‘প্রকৃত ঘটনা ছিল স্থানীয় জনগণের মধ্য থেকে আমাদের প্রতি শত্রুতা, যারা আমাদের বিরুদ্ধে চলে গিয়েছিল। এ ঘটনাই ঘটেছে বাংলায়; একপর্যায়ে জনগণের ৯০ শতাংশই আমাদের বিরুদ্ধে চলে যায়।
দীর্ঘ ৯ মাসব্যাপী যুদ্ধের পর বাংলাদেশ-ভারত যৌথ বাহিনীর কাছে পাকিস্তান সেনাবাহিনীর আত্মসমর্পণের মধ্য দিয়ে অভ্যুদয় ঘটে স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশের। ২০০১ সালের ডিসেম্বরে ১৯৭১ সালে পূর্ব পাকিস্তানে নিয়োজিত পাকিস্তান ইস্টার্ন কমান্ডের কমান্ডার জেনারেল আমীর আবদুল্লাহ খান নিয়াজির সাক্ষাৎকার গ্রহণ করেন ইন্ডিয়া অ্যাব্রডের সাংবাদিক আমীর মীর। জেনারেল নিয়াজি তাকে বলেন, ‘ইয়াহিয়া, মুজিব ও ভুট্টোর মধ্যে ক্ষমতার লড়াই একাত্তর সালের তালগোল পাকানো পরিস্থিতির সৃষ্টি করে। ইয়াহিয়া চেয়েছিলেন ক্ষমতা ধরে রাখতে, অন্যদিকে ভুট্টো চেয়েছিলেন তা দখল করতে। আর প্রকৃত সত্য হচ্ছে- নির্বাচনে বিজয়ী হয়েছিল শেখ মুজিবের আওয়ামী লীগ। সরকারের দায়িত্ব তার হাতেই তুলে দেওয়া উচিত ছিল। মুজিবের হাতে ক্ষমতা হস্তান্তর করা হলে পাকিস্তান ঐক্যবদ্ধ থাকত। জেনারেল টিক্কা খান ২৫ মার্চের বর্বর হত্যাকান্ডের জন্য ‘কসাই’-এর কুখ্যাতি অর্জন করেছেন।’
পাকিস্তানের শাসকদের পক্ষে ধারণা করা সম্ভব হয়নি যে একটি ভূভন্ডের সমগ্র জনগোষ্ঠী যদি তাদের ওপর সরকারের চাপিয়ে দেওয়া অন্যায়, অবিচার ও বৈষম্য থেকে মুক্ত হতে চায়, তাহলে বলপ্রয়োগ করে তাদের দমন করা সম্ভব নয়। বাংলাদেশের স্বাধীনতা তারই এক দৃষ্টান্ত।
♦ লেখক : সিনিয়র সাংবাদিক ও অনুবাদক