গিট্টু মামা পাড়ার সবচেয়ে মজার মানুষ। তার হাঁটার ভঙ্গি, কথা বলার ধরন, সব কিছুতেই ছিল এক আলাদা মেজাজ। তবে তার সবচেয়ে বড় গর্ব ছিল তার বিশাল, মোচড়ানো গোঁফ। সকালবেলা উঠে আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে গোঁফে তেল মাখতেন, তারপর যত্ন করে মোচড় দিতেন। মুখে থাকত এক গর্বিত হাসি। তিনি প্রায়ই বলতেন, ‘গোঁফই গর্ব! গোঁফ মানেই বীরত্ব!’
পাড়ার ছেলেমেয়েরা তাকে নিয়ে দারুণ মজা করত। কেউ বলত, ‘মামা, তোমার গোঁফ দিয়ে রশি বানানো যাবে!’ কেউ বলত, ‘এ গোঁফ দিয়ে তো শীতকালে কান ঢাকা যায়!’ গিট্টু মামা এসব কথায় রাগ করতেন না বরং গোঁফের গল্প বলে সবাইকে হাসাতেন।
কিন্তু একদিন সকালবেলা ঘটে গেল এক অবিশ্বাস্য ঘটনা। ঘুম থেকে উঠে গিট্টু মামা আয়নার সামনে দাঁড়াতেই আঁতকে উঠলেন। তার গোঁফ নেই! সেই বিশাল, গর্বের গোঁফ কোথায় গেল?
‘ওরে বাবারে! আমার গোঁফ! আমার গোঁফ গেল কোথায়?’
চিৎকার শুনে গোটা পাড়া ছুটে এলো। সবাই হাঁ করে তাকিয়ে থাকল গিট্টু মামার গোঁফহীন মুখের দিকে। কেউ বিশ্বাস করতে পারছিল না! গিট্টু মামা যেন এক মুহূর্তেই অন্য মানুষ হয়ে গেছেন।
কেউ বলল, ‘গোঁফ কি কখনো চুরি হয়?’
কেউ বলল, ‘হয়তো মামা ভুলে গেছেন! রাতে ঘুমের ঘোরে কেটে ফেলেননি তো?’
গিট্টু মামা কেঁদে কেঁদে বললেন, ‘আমি নিজে গোঁফ কাটব? অসম্ভব! নিশ্চয়ই কেউ আমার গোঁফ চুরি করেছে!’
পাড়ার সবচেয়ে দুষ্টু ছেলে পুটু ঘোষণা করল, ‘এই রহস্যের কিনারা আমি করব!’
রাতে পুটু, মিন্টু, টুকু আর চঞ্চল গিট্টু মামার বারান্দায় লুকিয়ে থাকল। ঘড়ির কাঁটা টিকটিক করে এগিয়ে চলল, চারপাশ নিস্তব্ধ। হঠাৎ একটা ছায়ামূর্তি জানালার ফাঁক দিয়ে ঘরের ভিতর ঢুকল!
‘চোর! চোর!’ পুটু ফিসফিস করে বলল।
সবাই নিঃশ্বাস চেপে অপেক্ষা করল। ছায়ামূর্তিটি ধীরে ধীরে এগিয়ে গেল গিট্টু মামার চেয়ারের দিকে। ঠিক তখনই পুটু লাফিয়ে চোরকে ধরল! কিন্তু চোর এক ঝটকায় পালিয়ে যেতে চাইল। আলো জ্বেলে দেখা গেল, চোর আর কেউ নয়, পাড়ার কালো বিড়াল!
‘ও মা! বিড়াল গোঁফ চুরি করল?’
গিট্টু মামা হতভম্ব হয়ে বললেন, ‘বলি, তুই আমার গোঁফ দিয়ে কী করবি?’
বিড়ালটা মিউ মিউ করে এক লাফে পালিয়ে গেল।
সবাই দৌড়ে গেল বিড়ালের পিছ। পুটু জানালার পাশে গিয়ে দেখল, কিছু একটা নরম কিছুর ওপর বিড়ালটা শুয়ে আছে। সে কাছে গিয়ে চেঁচিয়ে উঠল, ‘গোঁফ পাওয়া গেছে! কিন্তু ...!’
বিড়ালটা তার বাসার কোণে গিট্টু মামার গোঁফ দিয়ে বিছানা বানিয়ে রেখেছে! পুটু বলল, ‘মামা, আপনার গোঁফ দিয়ে বিড়াল বালিশ বানিয়ে ফেলেছে!’
গিট্টু মামা বিস্ময়ে ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে রইলেন। তারপর আয়নায় নিজের গোঁফহীন মুখ দেখলেন- একেবারে নতুন, অচেনা চেহারা! তিনি একমুহূর্ত চুপ করে থেকে হঠাৎ হেসে দিলেন, ‘আচ্ছা, এতদিন আমার গোঁফ আমার অহংকার ছিল, এখন সেটা বিড়ালের গরম বিছানা?’
এবার সবাই হেসে কুটিকুটি! সেদিন থেকে মামা গোঁফ নিয়ে অহংকার করেন না।