বসন্তের প্রথম দিন। বিকেলবেলা বাড়ির সামনে পুকুরপাড়ে বসে কোকিলের কুহু কুহু গান শুনছেন গল্পকার হাফিজুর রহিম। ঘরের ভিতর থেকে তাকে দেখে দৌড়ে কাছে আসে দশ বছরের নাতিন ভাষা।
বায়না ধরে দাদুর কাছে গল্প শোনার। হাসিমুখে নাতিনকে কাছে টেনে নিয়ে বললেন- ঠিক আছে, তা কী গল্প শুনবি দাদুভাই। ভাষা বলল- বাংলা ভাষার গল্প।
তিনি বলতে শুরু করলেন-
তখন ১৯৫২ সালের একুশ ফেব্রুয়ারি, বাংলা ১৩৫৮ সনের আট ফাল্গুনের উত্তাল সকাল। রাস্তার রাস্তায় মিছিলের পর মিছিলে স্লোগান হচ্ছিল ‘রাষ্ট্রভাষা বাংলা চাই, মানতে হবে মেনে নাও, নিতে হবে।’ এরকম আরও অনেক স্লোগান তুলে বাংলার দামাল ছেলেরা। ভাষা জিজ্ঞেস করে, আচ্ছা দাদু- দামাল ছেলে মানে কী? দাদু- দামাল ছেলে হচ্ছে, দুরন্ত-উদ্যমী যুবক ছেলেরা। বুঝেছ? ভাষা- জি দাদু বুঝেছি। তারপর? দাদু- ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রাঙ্গণে গঠিত হয় ‘রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদ’। এ সংগ্রাম পরিষদের একজন গর্বিত সদস্য ছিল তোর বড় চাচা কাব্য। তখন তোর জন্মই হয়নি!
হঠাৎ শুনতে পেলাম পুলিশের গুলিতে নাকি মিছিলেই পড়েছিল কয়েকজন যুবকের লাশ! শনাক্ত করে জানা যায় এরা ছিল ভাষাসৈনিক। তারা হচ্ছে- রফিক, জব্বার, সালাম, বরকত ও শফিউর। অন্য খানেও আরও নাম না জানা অনেক লাশ পড়েছিল। সাধারণ মানুষেরা যখন আন্দোলনে ঝাঁপিয়ে পড়ে এ আন্দোলন তখন প্রকট হয়ে ওঠে। মাতৃভাষার এ আন্দোলনের ফলে পাকিস্তান সরকার বাঙালির মুখের ভাষা ফিরিয়ে দিতে বাধ্য হয়। রক্তের দামে ফিরে পাওয়া এই মায়ের ভাষাকে পরবর্তী সময়ে আমাদের রাষ্ট্রীয় ভাষার মর্যাদা দেওয়া হয় শুধু তাই নয়! বাংলাভাষা এখন আন্তর্জাতিক ভাষা হিসেবে স্বীকৃতি পেয়েছে। বাংলা ভাষার ইতিহাসে আমাদের শেখ মুজিবুর রহমানেরও প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে অবদান রেখেছিলেন। এজন্যই ভাষার স্মৃতিকে ধরে রাখতে দেশের প্রতিটি শিক্ষাঙ্গনে শহীদ মিনার স্থাপন করা হয়।
আর ভাষার জন্য যারা জীবন দিয়েছে তাদের ভাষাশহীদ বলা হয়।
ভাষা- আচ্ছা দাদু, আমার বড় চাচাও কি ভাষাশহীদ?
দাদু- হ্যাঁ দাদুভাই। তোর বড় চাচাও একজন ভাষাশহীদ। স্বীকৃতপ্রাপ্ত না হলেও আমি তার নীরব সাক্ষী।
আমার মতো একজন লেখকের সন্তান যে ভাষার জন্য জীবন দিয়েছে। আমি সত্যিই গর্বিত একজন ভাষাশহীদের পিতা হতে পেরে। তাই ভাষার মাসে অর্থাৎ আট ফাল্গুনে তোর জন্ম হলো বলে আমিই তোর নাম রেখেছি ‘ফাল্গুনী ভাষা’। একটি ছড়াও লিখেছিলাম তোকে নিয়ে, শুনবি সে ছড়া! ভাষা বলল- হ্যাঁ দাদু, শুনব। দাদু, তাহলে শোন- ছড়াটির নাম ছিল তোর নামে, এরকম-
ভাষার মাসে কাব্য গেল
জন্মে এলে তুই
মন কাননে ফুটেছিল
চম্পা বেলি জুঁই!
পুত্র আমার ভাষার তরে
দিয়ে গেল প্রাণ
সেদিন থেকে যাচ্ছি নিয়ে
বাংলা ভাষার ঘ্রাণ।
জন্ম হলো যখন রে তোর
পেলাম নতুন আশা
সেদিন থেকে নাম রেখেছি
তুই, ‘ফাল্গুনী ভাষা’।
ভাষা- খুব ভালো লাগল দাদু, তোমার মুখে ভাষার গল্প শুনে। তার চেয়ে বেশি ভালো লেগেছে আমায় নিয়ে যে ছড়াটি লিখেছ। আমিও বড় হয়ে তোমার মতো গল্প, ছড়া লিখতে চাই।
দাদু- (মাথায় হাত বুলিয়ে) দোয়া করি দাদুভাই, তুই অনেক বড় লেখক হবি।
সন্ধ্যা হয়ে গেছ, এবার চল ঘরে ফিরে যাই।
ভাষা- (দাদুর হাত ধরে) দুজনেই ঘরে ফিরে গেল।