মায়েদের ধারণা ছন্দের সুরে কথা বললে বাচ্চা হয়তো শান্ত হবে। মিলিও তাই করে। খোকন সোনা খোকন সোনা আর কাঁদে না আর কাঁদে না। কিন্তু তার সোনার কান্না আর থামে না। কান্না না থামায় বাচ্চাকে কিছু খাওয়াতে পারে না, ঘুম তো পরের ব্যাপার। সব মায়ের মতো সেও প্রয়োগ করে ভাও থেরাপি। ওই যে ভাও আসল। তাতে কাজ হয়, বাচ্চা ভয় পেয়ে মায়ের বুকে মুখ লুকায়। লক্ষ্মী সোনা তখন খাবার খায় এবং ঘুমায়। এভাবে মিলি তার ছেলেকে প্রতিদিন খাওয়া ও ঘুম পাড়ায়। কিন্তু বাচ্চার মনে জমা হতে থাকে এক অজানা ভয়। ভাও নামক দৈত্যটা ঢুকে পড়ে শিশুমনের ভিতর। খোকন কখনো ভাও দেখেনি। কিন্তু তার সমস্ত অস্তিত্বজুড়ে কর্তৃত্ব করে ভাও।
খোকনদের বাড়ির পেছনে আছে বিরাট এক জঙ্গল। সেই জঙ্গলে শেয়াল-কুকুর অনেক কিছুর ডাক শোনা যেত রাতে। শিয়াল ডাকের বিচিত্র বৈশিষ্ট্য আছে। এক শিয়াল ডেকে উঠলে সব শিয়াল সমস্বরে এক ভীতিকর ঐকতান সৃষ্টি করে। অনেকক্ষণ ধরে চলে সেই হুক্কা হুয়া, হুয়া হুয়া কলরব। শিয়ালের এহেন ডাক শুনে খোকন ভয়ে মাকে জড়িয়ে ধরে। ছেলের ভয় পাওয়া দেখে মিলির খারাপ লাগে। সে চায় ছেলে সাহসী হবে। মিলি ছেলেকে সান্ত্বনা দেয়, না বাবা আমি আছি না, ভাও তোমার কাছে আসতে পারবে না। এই যে লাঠি কাছে রেখেছি ওকে পিটিয়ে দূর করে দেব। খোকন মায়ের কথায় সাহস পায়। বুদ্ধিমানের মতো বলে, আমাকে যদি নিয়ে যেতে চায়? মা খোকনকে বুকে চেপে বলে, না বাবা আমি কি তোমাকে নিতে দেব নাকি? আমার খোকন সোনাকে! পিটিয়ে ওর পা ভেঙে দেব না। তবে তোমাকে একটা জিনিস করতে হবে, ঠিকমতো খেতে হবে, ঘুমাতে হবে। খোকন বলে, আমার তো খেতে ভালো লাগে না। মা বলে, বাবা না খেলে তুমি শিয়ালের সঙ্গে পারবে কী করে? খেলে তো তোমার গায়ে অনেক শক্তি হবে। দেখবে তখন শিয়াল তাড়াতে কাউকে লাগবে না। তুমি নিজেই ওদের তাড়িয়ে দিতে পারবে। খোকন বুদ্ধিমানের মতো মাথা দুলিয়ে মাকে আশ্বস্ত করে। ঠিক আছে মা আমি বেশি বেশি খাব। কিন্তু আমি ভাত খাব না। চিপস খাব, চকলেট খাব। মা বলে, না বাবা এগুলো খেলে তুমি আর ভাত খেতে পার না। ভাত না খেলে শক্তি হবে কী করে? ওগুলো খাবা খুব কম। আর ভাত খাওয়ার সময় তুমি অন্য কিছু খাবা না।
মিলি ছেলেকে নিয়ে বাবার বাড়ি যাবে। স্বামীকে বলে, তুমিও চলো। অনেকদিন শ্বশুরবাড়িতে যাও না। আশিক বলে, আমি যেতে পারব না আমার অফিস আছে। তুমি ছেলেকে নিয়ে যাও, আমি গিয়ে তোমাদের নিয়ে আসব। খোকনের খুব আনন্দ। মামাবাড়ি বেড়াতে যাবে। মামাকে পাবে, খালামণিকে পাবে। এবার সে অনেক দুষ্টুমি করতে পারবে। যেগুলো করতে তার ভালো লাগে সেগুলোকে দুষ্টুমি বলা হয় কেন? সে ভেবে পায় না। খাওয়া নিয়ে উৎপাত কেন করা হয়, সে বোঝে না। খেতে ইচ্ছে করলে তো আমিই খেতে চাইব। মা যদি তাকে মারতে আসে খালামণি, মামা ঠেকাবে। তাকে আদর করবে, মাকে মারতে দেবে না। সে খাওয়া থেকে বেঁচে যাবে। খোকন কিছুতেই খেতে চায় না। সে দৌড়ে খালামণিকে জড়িয়ে ধরে। খালা নিলুফা বলে, কী হয়েছে আমার খোকন বাবার? খোকন বলে, আমি খাব না, মা আমাকে জোর করে খাওয়াবে। খালা বলে, বাবা তুমি খাও খেলে তোমার মা আর খাবার নিয়ে জোর করবে না। দেখবে তখন তোমাকে কত আদর করে, আমি আদর করব সবাই তোমাকে আদর করবে। সময়ের কী পরিবর্তন, একটা কথা মনে পড়ে মনে মনে হাসে নিলুফা। তাদের জন্য বরাদ্দ খাবার তো খেতই তারপর মা যেখানে যা রাখত চুরি করে খেয়ে ফেলত। আর আজকাল বাচ্চাদের খাওয়ানোর জন্য যুদ্ধ করতে হয়।
একদিন খোকন খেলছিল তার মামা বাড়ির পেছনে জঙ্গলটার কাছে। সেই জঙ্গল থেকে একটা বড় শিয়াল বেরিয়ে এলো। শিয়ালটা আস্তে আস্তে খোকনের সামনে এলো। খোকন রাজ্যের বিস্ময় নিয়ে তাকে অবাক দৃষ্টিতে দেখে! শিয়ালের কান দুটো খাড়া খাড়া। গায়ের অংশ একটু বাদামি ধূসর। নিরাপদ দূরত্বে খোকনের সামনে এসে দাঁড়ায় শিয়ালটা। তাকিয়ে থাকে খোকনের দিকে অপলক দৃষ্টিতে। খোকন কখনো দ্রুত ধাবমান পলায়ন পর শিয়াল হয়তো দেখেছে। কিন্তু এমন স্থির দৃষ্টিতে দেখা শিয়াল দেখেনি তাও আবার এত কাছ থেকে। খোকন আরও আশ্চর্য হয় শিয়াল দেখে তার কোনো ভয়ভীতি লাগছে না! খোকনের হাতে চিপস ছিল শিয়ালকে বলে, তুমি এটা খাবে? মনে হলো শিয়াল মাথা নেড়ে সম্মতি জানাল। খোকন চিপস বের করে শিয়ালকে খেতে দিল। শিয়াল বাধ্য ছেলের মতো সেগুলো খেলো। খাওয়া শেষ করে শিয়াল জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে খোকনের দিকে তাকায়। খোকন বলে, কাল তুমি আবার এসো আমি তোমাকে খেতে দেব। খোকন জঙ্গলের ধারে এলেই শিয়াল সতর্ক দৃষ্টিতে চারদিক দেখে উপস্থিত হয়। মনে হয় যেন সে খোকনের প্রতীক্ষায় ছিল। খোকন যা খায় তা শিয়ালকে খাওয়ায়। এভাবে খোকনের সঙ্গে শিয়ালের এক অস্বাভাবিক বন্ধুত্ব গড়ে ওঠে। একদিন খোকনের মনে হলো শিয়ালকে ধরে দেখলে কেমন হয়! সে হাত বাড়িয়ে দিলে শিয়াল অনুগতের মতো হাতের কাছে এসে দাঁড়ায়। খোকন মাথায় হাত বুলিয়ে তাকে আদর করে দেয়। অনেকক্ষণ হয়েছে খোকনের মনে হয় বাড়ি যাওয়ার কথা। এদিকে বাড়ির সবাই খোকনকে খোঁজাখুঁজি শুরু করেছে। মিলি তো ছেলেকে না পেয়ে কান্নাকাটি শুরু করে। হায় হায় আমার ছেলে গেল কোথায়? বাড়ির পেছনে জঙ্গলে গিয়ে দেখে খোকন এক শিয়াল একসঙ্গে খেলা করছে। মিলি তো দেখে অবাক! ছেলেকে যে শিয়াল আর ভাও এর কথা বলে ভয় দেখিয়ে খাওয়ানো হতো। আজ সেই ছেলের সঙ্গে শিয়ালের বন্ধুত্ব। ভাওকে জয় করল সে কীভাবে! সবাই দেখে তাজ্জব। এরপর জঙ্গলের পাশে এসে প্রায়ই শিয়াল খোকনের সঙ্গে খেত, খেলত।
আশিক শ্বশুরবাড়ি আসে স্ত্রী আর ছেলেকে নিয়ে যেতে। খোকন বাবাকে পেয়ে খুশি কিন্তু তাকে বাড়িতে যেতে হবে শিয়াল বন্ধুকে রেখে। সে জন্য তার মন খারাপ। সে কান্না জুড়ে দেয়, আমি বাড়ি যাব না। বন্ধু শিয়ালকে রেখে বাড়িতে যাব না। বাবা-মা দুজনেই খোকনকে বোঝায়। কিন্তু খোকন সোনা কোনো কিছুই শুনতে চায় না। এদিকে শিয়ালটাও হয়তো বুঝতে পেরেছে আসন্ন বন্ধু বিচ্ছেদের কথা। সে মাঝে মাঝে তার স্বরে চিৎকার করতে থাকে, মনে হয় যেন কাঁদছে। কী আর করা শেষ পর্যন্ত খোকনদের বাড়ি যাওয়ার প্রস্তুতি নিতে হয়। বাড়ি যাওয়ার দিন ঘটে আর এক ঘটনা।
শিয়াল মশাই স্বয়ং এসে হাজির। শিয়াল সাধারণত মানুষের সান্নিধ্য এড়িয়ে চলে। কিন্তু এই শিয়াল খোকনের কাছে এসে গা ঘেঁষে দাঁড়ায়। খোকন কী করবে বুঝতে পারে না। মাকে বলে, মা শিয়ালকে বাড়ি নিয়ে চলো। শেয়াল কোনো গৃহপালিত জীব নয়। মিলি ছেলের সৃষ্টিছাড়া কথা শুনে বলে, বাবা এরা বন-জঙ্গলে থাকে এরা বাড়িতে থাকে না। তাই একে নিয়ে যাওয়া যাবে না। খোকনদের গাড়ি ছেড়ে দেয়। আজব কান্ড, চারপাশে কাউকে তোয়াক্কা না করে শিয়াল গাড়ির সঙ্গে দৌড়াতে থাকে। খোকন পেছন ফিরে দেখে। হাত বাড়িয়ে দিয়ে বলে, তুমি আর এসো না পড়ে গিয়ে ব্যথা পাবে। কিন্তু শিয়াল তা শোনে না। শিয়াল গাড়ির পিছে দৌড়ে দৌড়ে খোকনদের বাড়ি এসে পৌঁছে। খোকন মাকে বলে, মা শিয়ালকে আর যেতে দেব না। শিয়ালের কারবার দেখে অভিভূত মা! বলে, ঠিক আছে বাবা। শিয়ালের জন্য তৈরি করা হয় একটা খাঁচা। সেই খাঁচায় শিয়াল বসবাস করতে থাকে খোকনের বন্ধু হয়ে। দূরদূরান্ত থেকে মানুষ আসে এই অদ্ভুত কান্ড দেখতে।