একটা ছোট্ট গ্রামে ছিল রাজু নামের এক ছেলে। সে বেশ কৌতূহলী। রাজুর সবচেয়ে প্রিয় কাজ প্রকৃতির নানা জিনিস খুঁজে দেখা আর তাদের সম্পর্কে জানা। তার ঘরের সামনে বড় একটা আম গাছ ছিল। প্রতিদিন স্কুল থেকে ফিরে সে ওই গাছের নিচে বসে পড়ত আর পোকামাকড়, পাখি, এবং পাতার নড়াচড়া দেখে মুগ্ধ হতো।
একদিন বিকালে রাজু গাছের নিচে বসে খেয়াল করল, একটা মাকড়সা খুব দ্রুত তার জাল বুনছে। সে এতটাই নিখুঁতভাবে কাজ করছিল যে রাজু অবাক হয়ে গেল। মাকড়সা প্রথমে ছোট্ট একধারে সুতো ফেলল, তারপর তা আরেক ধারে নিয়ে গিয়ে আটকে দিল। এরপর সে ত্রিভুজের মতো করে সুতোর জাল বুনতে থাকল।
রাজুর কৌতূহল চরমে উঠল। সে ভাবল, ‘এই ছোট্ট মাকড়সাটা এত জটিল একটা জাল কীভাবে বুনছে? এটা কি শিখে এসেছে, নাকি ওর জন্ম থেকেই এটা জানে?’
সে দৌড়ে মায়ের কাছে গেল। মা তখন রান্নাঘরে। রাজু মাকে বলল, ‘মা, তুমি জানো মাকড়সারা কেমন করে এত সুন্দর জাল বুনতে পারে?’
মা হাসলেন। তিনি বললেন, ‘প্রকৃতি প্রতিটা প্রাণীকে তার কাজের জন্য বিশেষ দক্ষতা দিয়েছে। মাকড়সার শরীরে এমন কিছু গ্রন্থি আছে, যেখান থেকে সে সুতো তৈরি করে। এই সুতো খুব মজবুত, আবার অনেক হালকাও। মাকড়সারা এটা ব্যবহার করে শিকার ধরার জন্য জাল বোনে।’
রাজুর আরও কৌতূহল বাড়ল। সে বলল, ‘কিন্তু মা, ওরা কি স্কুলে গিয়ে এটা শিখে?’
মা হাসি থামিয়ে বললেন, ‘না, বাবা। এটা ওদের সহজাত দক্ষতা। যেমন- তুমি ছোটবেলা থেকেই হাঁটতে, কথা বলতে শিখেছ, তেমনি মাকড়সাও জন্ম থেকেই জাল বুনতে জানে। তবে, ওরা প্রতিদিন এটা শিখতে শিখতে উন্নতি করে।’
রাজু মায়ের কথা শুনে ভাবতে লাগল। তারপর মায়ের কাছে একটা পুরনো লেন্স চেয়ে নিল। লেন্স দিয়ে সে মাকড়সার জাল আরও ভালোভাবে দেখতে লাগল।
সে খেয়াল করল, জালের মাঝে মাঝেই ফাঁকা জায়গা আছে। রাজু ভেবে নিল, হয়তো মাকড়সা ভুল করেছে। পরদিন স্কুলে গিয়ে সে বিজ্ঞান স্যারকে বিষয়টা বলল।
বিজ্ঞান স্যার বললেন, ‘তুমি খুব ভালো একটা ব্যাপার খেয়াল করেছ, রাজু। মাকড়সার জালে ফাঁকা জায়গাগুলো ইচ্ছা করেই রাখা হয়। এই ফাঁকা জায়গাগুলো জালকে হালকা রাখে, বাতাসে ঝুলতে সাহায্য করে। আর ছোট পোকামাকড় সহজেই আটকে যায়, কিন্তু মাকড়সা নিজে কখনো এতে আটকে পড়ে না।’
রাজু অবাক হয়ে বলল, ‘কিন্তু স্যার, মাকড়সারা এত ছোট হয়, তবু তাদের এত বুদ্ধি?’
স্যার হেসে বললেন, ‘রাজু, প্রতিটা প্রাণী তার কাজের জন্য বিশেষভাবে তৈরি। মাকড়সার ছোট মাথায় ছোট্ট মস্তিষ্ক আছে। যা তাদের জীবন-ধারণের জন্য যথেষ্ট। প্রকৃতি আমাদের জন্য যে ভারসাম্য তৈরি করেছে, তা সত্যিই বিস্ময়কর।’
সেদিন থেকে রাজু মাকড়সাদের প্রতি আরও বেশি শ্রদ্ধাশীল হয়ে উঠল। সে বুঝতে পারল, প্রকৃতির প্রতিটা প্রাণী, যত ছোটই হোক না কেন, তার নিজের জগতে গুরুত্বপূর্ণ।
কিছুদিন পর, রাজু তার বন্ধুদেরও মাকড়সার জালের এই রহস্যের কথা বলল। সবাই মিলে গাছের নিচে বসে মাকড়সার কাজ দেখে মুগ্ধ হলো। রাজু বুঝতে পারল, প্রকৃতি শুধু আমাদের শেখায় না, আমাদের ভাবতে শেখায়।
গল্পের শেষে রাজু আর তার বন্ধুরা মিলে ঠিক করল, তারা প্রকৃতির সব রহস্য জানার জন্য আরও গবেষণা করবে। কারণ, প্রকৃতির জগৎ মানেই শেখার এক অশেষ ভান্ডার।