রেলওয়ে কর্তৃপক্ষ কম দূরত্বে নিরাপদে যাত্রী পরিবহনে ৬৫৪ কোটি টাকায় ২০টি ডেমু (ডিজেল ইলেকট্রিক মাল্টিপল ইউনিট) ট্রেন ক্রয় করে। কিন্তু এগুলো চালুর সাত বছর পার না হতেই অকেজো হয়ে পড়েছে। বর্তমানে ২০টি ডেমু ট্রেনের মধ্যে ১৮ সেটই অচল। অচল ডেমু আর সচল করার মতো অবস্থাও নেই। অথচ এরই মধ্যে ডেমুগুলোর মেরামতে খরচ করা হয়েছে প্রায় সাড়ে ৫ কোটি টাকা। এই অর্থ শুধু অপচয়ই হয়েছে। ট্রেনগুলো কোনো কাজে আসেনি।
ফলে প্রশ্ন আসে- কী হবে ৬৫৪ কোটি টাকার ২০টি ডেমু ট্রেনের। ট্রেনগুলো ঢাকা-নারায়ণগঞ্জ এবং চট্টগ্রাম-নাজিরহাট ও চট্টগ্রাম-বিশ্ববিদ্যালয় রেলপথে ব্যবহারের জন্য কেনা হয়েছিল। চট্টগ্রামের পাহাড়তলী রেলওয়ে ওয়ার্কশপে ডেমুগুলো পড়ে আছে।
অভিযোগ আছে, এত বড় অঙ্কের প্রকল্প গ্রহণ করা হলেও এর কোনো সমীক্ষা করা হয়নি। এসব ট্রেন যাচাইবাছাই না করেই কেনা হয়। এগুলো আনার আগে দেশের বিদ্যমান রেলপথ ডেমু চলাচলে উপযোগী কিনা, দেশের আবহাওয়া অনুকূল কিনা, প্রশিক্ষিত জনবল আছে কিনা, ডেমু মেরামতে দেশে কোনো ওয়ার্কশপ আছে কিনা- এসব বিষয় বিবেচনা করা উচিত ছিল। প্রয়োজনীয় সমীক্ষা না করেই ডেমু ক্রয় করা হয়েছিল। এটি জনগণের টাকার অপচয় ছাড়া আর কিছুই নয়।
রেলওয়ে সূত্রে জানা যায়, ২০১৩ সালে তৎকালীন সরকার চীনের হেবেই প্রদেশের সিএনআর থাঙ্কসান কোম্পানির কাছ থেকে ২০টি ডেমু ট্রেন দেশে আনে। ওই বছর ২৪ এপ্রিল ঢাকা-নারায়ণগঞ্জ রুটে দেশে প্রথম ডেমু রেল চলাচল শুরু করে। ট্রেনগুলোর সামনে-পেছনে দুই দিকেই আছে ইঞ্জিন। তিন কোচবিশিষ্ট এ ট্রেনের ধারণক্ষমতা ৩০০ যাত্রী এবং সর্বোচ্চ গতি ৮০ কিলোমিটার। চুক্তি মতে, কম্পোন্যান্ট, যন্ত্রাংশ, স্টাফদের প্রশিক্ষণ এবং রক্ষণাবেক্ষণ প্রকল্পে অন্তর্ভুক্ত ছিল। ইঞ্জিনের বয়সকাল ধরা হয়েছিল ২০ বছর, ওয়াগনের বয়স ৩৫-৪৫ বছর। প্রতিটি ডেমুতে ৩০-৩৫টি মডিউল ছিল। মডিউলগুলো বাজারে পাওয়া যায় না। পাওয়া গেলেও সেটি লাগানোর জন্য প্রশিক্ষিত জনবল নেই। ডেমুর যন্ত্রাংশ স্থানীয়ভাবে কোথাও পাওয়া যায় না। কিন্তু ২০১৩ সালের উদ্বোধনের পরপরই যান্ত্রিক ত্রুটি ধরা পড়ে। এরপর থেকে নানা যান্ত্রিক ত্রুটি লেগেই ছিল। ফলে চলাচল অযোগ্য এসব ট্রেনে আয়ের চেয়ে মেরামত খাতে ব্যয় বাড়তে থাকে। ২০১৯ সাল থেকে ডেমু ট্রেনে যাত্রী পরিবহন সেবা বন্ধ হয়ে যায়। এরপর অকেজো ট্রেনগুলো চট্টগ্রাম ও ঢাকার রেলওয়ের স্থাপনায় ফেলে রাখা হয়। ট্রেনগুলোর কোনোটির চাকা সচল নেই, ভেঙে গেছে জানালা, কোনোটির জানালার কাচও অবশিষ্ট নেই, কোনোটির ইঞ্জিন নষ্ট হয়ে আছে, কিছু ট্রেনের ভিতরের যন্ত্রাংশ, লাইট-ফ্যান খুলে নেওয়ায় প্রতীকী হিসেবেই অবশিষ্ট আছে। ঘন জঙ্গলে ঢেকে আছে, জং ধরে গেছে ট্রেনের যন্ত্র ও বডিতে। অচল ডেমু ট্রেন মেরামত, যন্ত্রাংশ ক্রয় ও জ্বালানি তেলের ব্যবহার দেখিয়ে কোটি কোটি টাকা দুর্নীতি-অনিয়মের অভিযোগও আছে। রেলওয়ে পূর্বাঞ্চলের মহাব্যবস্থাপক প্রকৌশলী মো. সবুক্তগীন বলেন, ডেমু ট্রেনগুলো অনেক আগের কেনা। এগুলো এখন হয়তো আর চলাচলের মতো অবস্থা নেই। মেরামত করে চালানোও ব্যয়বহুল হবে। বিষয়টা নিয়ে রেল ভবন থেকে প্রয়োজনীয় নির্দেশনা আসবে।
রেলওয়ে পূর্বাঞ্চলের বিভাগীয় ব্যবস্থাপক এ বি এম কামরুজ্জামান বলেন, ডেমুর বিষয়টা এখন সবার কাছেই স্পষ্ট। এগুলো মেরামত করে চালানো হবে, এমন অবস্থাও নেই। সেগুলো কী করা হবে তা আমরাও জানি না। মন্ত্রণালয় যে সিদ্ধান্ত নেয়, আমরা সে সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন করব।
রেলওয়ের মেকানিক্যাল বিভাগ সূত্রে জানা যায়, ২০টি ডেমু ট্রেনের মধ্যে চট্টগ্রামের পাহাড়তলী লোকোশেডে আছে ১০টি। ৮টি ডেমু ট্রেন ঢাকার কমলাপুর লোকোশেডে, দুটি ডেমু ট্রেন পার্বতীপুর লোকোশেডে।