‘জুড়ে থাকি আজীবন, ভ্রাতৃত্বের বন্ধনে’ এই স্লোগানকে সামনে রেখে উদযাপিত হচ্ছে রাজধানী পুরান ঢাকার আরমানিটোলা সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়ের ১২০ বছর পূর্তি।
আজ শুক্রবার বেলা সাড়ে ১১টায় স্কুলটির মূল মাঠে দু’দিনব্যাপী এ উদযাপন অনুষ্ঠানের মূল পূর্ব উদ্বোধন করেন স্কুলের ১৯৬২ ব্যাচের সাবেক শিক্ষার্থী ও বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. আব্দুল মঈন খানসহ অন্যান্য অতিথিরা।
মূল পূর্বের শুরুতে পবিত্র কুরআন তিলাওয়াত ও দোয়া মোনাজাতের মাধ্যমে স্মরণ করা হয় স্কুলটির সাবেক শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের। এছাড়া জাতীয় সংগীত, মোড়ক উন্মোচন, শান্তির প্রতীক পায়রা উড়িয়ে অনুষ্ঠান উদ্বোধন করা হয়।
এসময় বিশেষ অতিথির বক্তব্যে শৈশবের স্মৃতি স্মরণ করে স্কুলটির ১৯৬৪ ব্যাচের সাবেক শিক্ষার্থী ও বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেন, ‘আমি আজকে এখানে এসে শৈশবের স্মৃতি মনে পড়ে গেল। স্কুলে পড়ার পর আজকেই প্রথম এসেছি। গেইট দিয়ে ঢুকতেই সেই পুরোনো লাল ভবনটি দেখে পুরোনো স্মৃতি ভেসে উঠেছে। বাবার চাকরির সুবাদে স্কুলটিতে এক বছর পড়ার সৌভাগ্য হয়েছিল আমার।’
আমীর খসরু আরও বলেন, ‘এখানে যারা দায়িত্বে আছেন তাদের বলব- সাবেক শিক্ষার্থীদের নিয়ে একটি অ্যালামনাই অ্যাসোসিয়েশন গঠন করার জন্য। শৈশবের স্মৃতি মনে করে নিজেকে পুনরায় সৌভাগ্যবান মনে হচ্ছে আজ।’
প্রধান অতিথির বক্তব্যে স্কুলের ১৯৬২ ব্যাচের সাবেক শিক্ষার্থী ও বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. আব্দুল মঈন খান বলেন, ‘এই আমিও এই স্কুলের ছাত্র ছিলাম। আজকে আমার সামনে আমার সহপাঠী এবং সিনিয়র-জুনিয়ররা আছেন। এই ধরনের সম্মেলনে একত্রিত হতে পারা সত্যিকার একটি আনন্দের বিষয়। আমি স্কুলে প্রথম আমার বাবার হাত ধরে এসেছি। আমি তখন ভয়ে কাঁপছিলাম প্রধান শিক্ষকের রুমে ঢুকে। একই সাথে অংকের ক্লাসে ঢুকলে আমাদের সবার হাত-পা কাঁপাকাঁপি শুরু হয়ে যেত।’
ড. মঈন খান আরও বলেন, ‘লাল ভবনের বিষয়ে কয়েকটি কথা বলা উচিত। ১৯০৪ সালে স্কুলটি একটি টিচার্স ট্রেনিং হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়। যা হয়তো অনেকে জানে না। এ অঞ্চলটি গড়ে উঠেছিল শত শত বছর আগে। পুর্তগিজরা ব্যবসায় করার জন্য এখানে এসেছিলেন।’
স্কুলের স্মৃতি স্মরণ করে সাবেক এ শিক্ষার্থী বলেন, ‘জাহাঙ্গীরনগর তখনকার সারাবিশ্বে অনেক বেশি জনপ্রিয় শহর ছিল। তখন এক লাখ জনসংখ্যা ছিল এ শহরের। পর্তুগিজরা ব্যবসা করার জন্য সিদ্ধান্ত নিয়ে নিজের দেশ ছাড়া এখানে স্থায়ীভাবে বসবাস করতে শুরু করেছিলেন। তারা এখানে একটা আরমানিয়া চার্চও করে ছিল। ১৯৮১ সালে প্রতিষ্ঠিত তাঁরা মসজিদ তখন সারাবিশ্বে অনেক বিখ্যাত ছিল।’
তিনি আরও বলেন, ‘আজকে এ গৌরবময় ইতিহাসের সাক্ষী হতে পেরে আমরা সবাই গর্বিত। একজন মানুষের জীবনে স্কুল জীবনের যেই শিক্ষা সেটি শেষ জীবন পর্যন্ত কাজে লাগে। স্কুল জীবনের শিক্ষা হচ্ছে জীবনের ভিত্তি। শিক্ষার উপর ভিত্তি করে দেশের মানুষের জন্য সেবা করতে চেষ্টা করছি। আমার জীবনের সবচেয়ে সেরা শিক্ষা ছিল স্কুল জীবনের শিক্ষা। স্কুলের সময় মানুষের জীবনে স্বর্ণাক্ষরে লেখা থাকে। যা কখনো ভুলা যাবে না।’
১২১ বছরের পুরাতন লাল ভবনের কথা মনে করে ড. মঈন খান বলেন, ‘স্কুলের এ ভবনটি কেন এখনো হেরিটেজ হিসেবে ঘোষণা হয়নি- এটি আমার প্রশ্ন? আমি সবাইকে বলব- দরকার হলে আমিসহ সরকারের কাছে যাব আপনাদের সাথে নিয়ে। এ ভবনটিকে বিশ্ব ঐতিহ্যের অন্তর্ভুক্ত করার জন্য।’
এসময় সাবেক শিক্ষার্থীরা জানান, দুই দিনব্যাপী আয়োজনের প্রথম দিনে বৃহস্পতিবার বিকালে স্কুলটির বর্তমান নবম ও দশম শ্রেণি এবং এসএসসি পরীক্ষার্থীরা অংশগ্রহণ করবেন। এটি পুনর্মিলনীর বর্ধিতাংশের একটি অনুষ্ঠান যার মূল উদ্দেশ্য স্কুলের বর্তমান শিক্ষার্থীদের স্কুলের ইতিহাস ও ঐতিহ্য সম্পর্কে অবগত করা এবং তাদেরকে উৎসাহ প্রদান করা যেন তারা ভবিষ্যতে অগ্রজদের পদাঙ্ক অনুসরণ করে জীবনে সফলতা লাভ করতে পারে। বিকালে শুরু হওয়া অনুষ্ঠানে স্মৃতিচারণ ও সাংস্কৃতিক পর্ব থাকছে।’
আয়োজক কমিটির পক্ষ থেকে জানা যায়, ‘সাবেক শিক্ষার্থীদের উদ্যোগেই মূলত এই অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়েছে। আয়োজক কমিটির সভাপতি সিদ্দিকুর রহমান এবং সাধারণ সম্পাদক হিসেবে আতিকুর রহমান এতে ব্যাপক ভূমিকা রাখছেন। এর আগে প্রতিষ্ঠানটির শতবর্ষ পূর্তি অনুষ্ঠিত হয়েছিল। অনেক ইতিহাসের সাক্ষী আরমানিটোলা স্কুলটির যাত্রা শুরু হয়েছিল ১৯০৪ সালে।’
এর আগে, বৃহস্পতিবার থেকে শুরু হয় ১২০ বছর পূর্তি উপলক্ষ্যে দু-দিনব্যাপী এ উদযাপন অনুষ্ঠান। এতে স্কুলটির সাবেক আড়াই হাজার নিবন্ধিত শিক্ষার্থীসহ বিশিষ্ট ব্যক্তিরা অংশগ্রহণ করবেন। এ উদযাপন ও পুনর্মিলনী’ অনুষ্ঠান ঘিরে স্কুল ক্যাম্পাসে ব্যাপক সাজ-সজ্জা করা হয়েছে।
বিডি-প্রতিদিন/শফিক