সময়টা ১৯৬৯-৭০ সাল। পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তানের সম্পর্কে ততদিনে বড় ধরনের ফাটল দেখা দিয়েছে। সেই সময় দুই অঞ্চলের যে কোনো খেলায় বাড়তি উত্তেজনা দেখা যেত। রাজনৈতিক কারণ ছাড়াও এর বড় কারণ ছিল ফুটবলে পূর্ব পাকিস্তানের আধিপত্য। ১৯৬০-এর দশকে পূর্ব পাকিস্তানের দলগুলো বেশ কয়েকবার জাতীয় চ্যাম্পিয়নশিপ জয় করে। ১৯৬৯-৭০ সালে ফাইনাল হয় কুমিল্লার মাঠে। সেই ফাইনালে মুখোমুখি হয় চট্টগ্রাম ও পেশোয়ার। সেই সময় সিলেট ছিল চট্টগ্রাম বিভাগের অন্তর্গত। ১৯৬০-এর দশকে ফুটবল খেলে সিলেটে বেশ নাম কুড়িয়েছিলেন ভানু। তাঁর কাগজি নাম প্রবীর রঞ্জন দাস। তবে ভানু নামে সিলেটে ষাটের দশক থেকেই পরিচিত হয়ে উঠেন তিনি। ১৯৬৯-৭০ মৌসুমে চট্টগ্রাম বিভাগীয় দলে খেলেছিলেন তিনি। ফাইনালে একটা গোলও করেন তিনি। দল জিতে নেয় পাকিস্তান জাতীয় চ্যাম্পিয়নশিপ। পূর্ব পাকিস্তানের বিভাগীয় দলগুলোর মধ্যে এর আগে জাতীয় চ্যাম্পিয়নশিপ জয় করে শুধু ঢাকা (১৯৬১ ও ১৯৬২ সালে)। ঢাকার পর ভানু জাতীয় চ্যাম্পিয়নশিপ এনে দিয়েছিলেন চট্টগ্রাম বিভাগকে। সিলেটের সেই ভানু এখন একাকী নিভৃত জীবন কাটাচ্ছেন সিলেট শহরে প্রায় আড়াইশ বছর পুরনো এক বাড়িতে।
সিলেট শহরের পরিচিত মুখ ভানুকে একসময় পুরো দেশই জানত। তরুণপ্রজন্ম তাঁকে চেনে না। তার কীর্তি সম্পর্কেও জানা নেই। একসময় তিনি পাকিস্তান জাতীয় চ্যাম্পিয়নশিপ জয় করেছেন। খেলেছেন স্কুটার গফুর, প্রতাপ সংকর হাজরা, জাকারিয়া পিন্টুদের পক্ষে-বিপক্ষে। নাম কুড়িয়েছেন কোচ হিসেবেও। তাঁর কোচিংয়েই সিলেট বিভাগ প্রথম ও শেষবার জয় করে জাতীয় চ্যাম্পিয়নশিপ (১৯৮৩ সালে)। সেবার তারা ফাইনালে হারিয়েছিল ঢাকা জেলাকে। কলেজজীবনে জয় করেছেন বঙ্কু বিহারি শিল্প কেনেডি শিল্ড। মদনমোহন কলেজের হয়ে সিলেটের বিখ্যাত বঙ্কু বিহারি শিল্ড টুর্নামেন্ট জিতে নাম কুড়িয়েছিলেন। সেই ভানুকে পুরনোরা মনে রেখেছেন। ষাটোর্ধ্বরা এখনো নানা আড্ডায় ভানুর ফুটবলশিল্প নিয়ে আলোচনা করেন। তবে ধীরে ধীরে হারিয়েই যাচ্ছেন ভানু । জীবন সায়াহ্নে এসে স্বীকৃতি হিসেবে সোনালি অতীত আজীবন সম্মাননা স্মারক পেয়েছেন ২০২২ সালে। এতটুকুই। অথচ তাঁর অসুস্থতার সময় কেউ খোঁজও নিতে যায়নি। কলকাতায় গিয়ে চিকিৎসা নিয়েছেন। এখানেই আফসোসটা রয়ে গেছে সিলেটের প্রিয় ভানুর। তিনি বলেন, ‘একসময় কত কিছুই না করেছি। খেলার জন্য জীবনটাই উৎসর্গ করে দিয়েছি। অথচ আমার প্রয়োজনের সময় কেউ আসেনি।’ নিজের মনে অসংখ্য রাগ-অভিমান পুষে মৃত্যুর অপেক্ষায় দিন গুনছেন প্রবীর রঞ্জন দাস ওরফে ভানু। পুরনো বাড়ির গেটের সামনে দাঁড়িয়ে ধরা গলায় বললেন, ‘আমি এখন চিরন্তন যাত্রার অপেক্ষায় প্রহর গুনছি।’ সিলেটের আরও একজন তারকা ফুটবলার জীবনের শেষ নিঃশ্বাসের অপেক্ষায় আছেন। তিনি পূর্ব পাকিস্তান জাতীয় দলে গোলরক্ষক হিসেবে খেলা রণজিৎ দাস।