বাকি মাত্র ৬ বল। জয়ের জন্য প্রয়োজন ২৬ রান। সম্ভব হবে কি এই লক্ষ্য পাড়ি দেওয়া? কামরুল ইসলাম রাব্বি সাহস দিলেন নুরুল হাসান সোহানকে। রংপুর রাইডার্সের অধিনায়ককে রাব্বি বললেন, উইকেটের আচরণ আর বোলিং দেখে মনে হচ্ছে সম্ভব। পরের ছয়টা বল এক ধ্যানে খেলে গেলেন নুরুল হাসান সোহান। ফরচুন বরিশালের বোলার কাইল মায়ার্সকে টানা ছয় বলে ৬, ৪, ৪, ৬, ৪, ৬ মেরে দলকে উপহার দিলেন এক অবিস্মরণীয় জয়। বিপিএলের ইতিহাসে এমন রোমাঞ্চকর ম্যাচ খুব কমই দেখেছেন দর্শকরা। সিলেট আন্তর্জাতিক ক্রিকেট স্টেডিয়ামের হাজার হাজার দর্শক দলমত ভুলে উপভোগ করলেন ম্যাচটা।
নুরুল হাসান সোহান শেষ বলে ছক্কা হাঁকিয়েই বুনো উল্লাসে মেতে ওঠেন স্টেডিয়ামের সবুজ মাঠে। তার সঙ্গে যোগ দেন রংপুর রাইডার্সের বাকিরাও। ঠিক এ সময়টাতেই পরাজিত ফরচুন বরিশালের অধিনায়ক তামিম ইকবাল ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠেন। পরাজিত হওয়ার যন্ত্রণা ভুলতেই পারছিলেন না তিনি। অবশ্য ঠিক কী কারণে তিনি ক্ষিপ্ত হয়েছেন দূর থেকে তা বোঝার উপায় ছিল না। হয়তো কোনো বাজে মন্তব্য শুনেছেন পাশ থেকে!
বহু বছর মনে রাখার মতো একটা ম্যাচ উপহার দিলেন নুরুল হাসান সোহান। নিজের ক্যারিয়ারের অন্যতম সেরা বলেও জানালেন। গতকাল ম্যাচসেরার পুরস্কার হাতে সংবাদ সম্মেলনে এসে সোহান বললেন, ‘এটা আমার জীবনের অন্যতম সেরা ম্যাচ। এতে কোনো সন্দেহ নেই।’ এর আগে টি-২০ বিশ্বকাপে এক ওভারে ২০ রান করার লক্ষ্য তাড়া করেছিলেন তিনি। সেই ম্যাচটা হেরেছিলেন। তবে এবার ২৬ রান তাড়া করেও জয় নিয়ে মাঠ ছাড়লেন। অথচ ম্যাচের বেশিরভাগ সময়ই ফরচুন বরিশাল ছিল জয়ের ব্যাপারে মোটামুটি নিশ্চিত। ফরচুন বরিশাল দলীয় ৫০ রান করে ৪৩ বলে। বিপরীতে রংপুর রাইডার্স ৫০ রান করে ৪৭ বলে। ৮ ওভার পর বরিশালের রান ছিল বিনা উইকেটে ৬৭। রংপুর ৫৯ রান করে ২ উইকেটে। ১৬ ওভার পর বরিশাল ২ উইকেটে ১৪৬। রংপুর ৩ উইকেটে ১৪৩। প্রায় পুরো ম্যাচেই পিছিয়ে ছিল রংপুর। তবে ব্যবধান গড়ে দেন নুরুল হাসান সোহান। মাত্র ৭ বল খেলে ৩২ রান করেন। এ কারণে ম্যাচসেরার পুরস্কারটাও পেয়ে যান তিনি।
গতকাল ম্যাচজুড়েই ছিল নানারকম উত্তেজনা। ম্যাচের ১৯তম ওভারের চতুর্থ বলে শেখ মেহেদি বল বাতাসে ভাসিয়ে দিলে ক্যাচ নিতে ছুটে আসেন জাহানদাদ। একই সময়ে নুরুল হাসান সোহানও রান নিতে ছুটে যান। দুজনের মধ্যে সংঘর্ষ হলে ক্যাচ নিতে ব্যর্থ হন জাহানদাদ। সঙ্গে সঙ্গেই ফরচুন বরিশালের ক্রিকেটাররা ‘অবস্ট্রাকশন’ আউটের দাবি জানান। ক্রিকেটীয় আইনের ৩৭ নম্বর ধারা অনুযায়ী ‘অন দ্য প্লে’ ফিল্ডারকে বাধা দিলে আম্পায়ার আউটের সিদ্ধান্ত দিতে পারবেন। শেখ মেহেদি অবস্ট্রাকশন আউটের শিকার হয়ে মাঠ ছাড়েন। ম্যাচের পর সোহান দৃঢ়তার সঙ্গেই বলেছেন, ‘আমি কেবল রান নিতে চেয়েছিলাম। আমার গতিপথও পরিবর্তন করিনি।’ ১৯তম ওভারের পঞ্চম বলে সাইফুদ্দিন নাঈম হাসানকে ক্যাচ দিয়ে ফিরে যান। এরপর ম্যাচটা পুরোপুরিই ফরচুন বরিশালের নিয়ন্তণে চলে গিয়েছিল। তবে চোয়ালবদ্ধ প্রতিজ্ঞায় শেষ ওভারে রোমাঞ্চ ছড়িয়ে জয় ছিনিয়ে আনেন নুরুল হাসান সোহান। কী অসাধারণ এক জয়। ফরচুন বরিশাল করল ১৯৭ রান। বরিশালের ইনিংসে কাইল মায়ার্স মাত্র ২৯ বলে ৭ ছক্কা ও ১ চারের মারে করেন ৬১ রান। ফাহিম আশরাফ মাত্র ৬ বলে করেন ২০ রান। এ ছাড়া তামিম ৪০, শান্ত ৪১ রান করেন। তৌহিদ হৃদয় করেন ২৩ রান। বরিশালের ইনিংসটা দারুণ উপভোগ করেছেন দর্শকরা। তবে নুরুল হাসানের ৭ বলে ৩২ রানের ইনিংসটাই সবাইকে ছাপিয়ে গেছে। ২০২ রান করে ৩ উইকেটের জয় তুলে নেয় রংপুর। এমন ম্যাচ দর্শকদের জন্য দারুণ বিনোদন উপহার দিয়েছে। ম্যাচের পর রংপুর রাইডার্সের অধিনায়ক সোহান বললেন, ‘এমন ম্যাচ দর্শকদের বিনোদন দেয়। তাদের দুঃখ-কষ্ট ভুলিয়ে দেয়।’ এ ধরনের ম্যাচ তো ক্রিকেটের জন্যও ভালো!
সংক্ষিপ্ত স্কোর
ফরচুন বরিশাল : ১৯৭/৫, ২০ ওভার (তামিম ৪০, শান্ত ৪১, মায়ার্স ৬১*। শেখ মেহেদি ৩-১-১৯-০, ইফতিখার ২-০-২৩-০, আকিফ ৪-০-১৬-১, সাইফুদ্দিন ৪-০-৪২-১, কামরুল ৩-০-৪৭-২)।
রংপুর রাইডার্স : ২০২/৭, ২০ ওভার (তৌফিক ৩৮, সাইফ ২২, ইফতিখার ৪৮, খুশদিল ৪৮, সোহান ৩২*। তানভির ৪-০-৩৩-১, আফ্রিদি ৪-০-৩০-১, জাহানদাদ ৪-০-৪৮-২, ফাহিম ৪-০-৩০-১, রিশাদ ২-০-২৬-১)।
ফল : রংপুর রাইডার্স ৩ উইকেটে জয়ী।
ম্যাচসেরা : নুরুল হাসান সোহান