তরুণদের মধ্যে মাদকাসক্তির প্রবণতা বাড়ছে। মাদক সেবনে কিডনি, স্নায়ুর জটিলতাসহ ভয়াবহ মানসিক রোগে আক্রান্ত হচ্ছে তারা। হতাশা থেকে গুরুতর মানসিক রোগীতে পরিণত হচ্ছে সম্ভাবনাময় তরুণরা। এদের অনেকেই জড়িয়ে পড়ছে অপরাধমূলক কাজে।
মাদকদ্রব্য ও নেশা নিরোধ সংস্থা (মানস)-এর প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি ডা. অরূপরতন চৌধুরী গতকাল বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, তরুণদের মাদকের আগ্রাসন থেকে রক্ষা করা জরুরি। দেশে বর্তমানে মাদকাসক্তের প্রকৃত পরিসংখ্যান না থাকলেও বেসরকারি তথ্যমতে কোটির বেশি মাদকাসক্ত রয়েছে এবং মাদকসেবীর ৮০ শতাংশই যুবক। তাদের মধ্যে ৪৩ শতাংশ আবার বেকার। ৬০ শতাংশ বিভিন্ন অপরাধে জড়িত। বেসরকারি পরিসংখ্যান অনুযায়ী মাদকাসক্তের ৩০ শতাংশই শুধু নেশার খরচ জোগান দিতে অপরাধ-অপকর্মে জড়িয়ে পড়ছে। জরিপের যে তথ্যটি সবচেয়ে বেশি আতঙ্ক ও ভয়ের কারণ, তা হচ্ছে দেশে মাদকাসক্তের ৮০ শতাংশই কিশোর, তরুণ ও যুবক বয়সি। আর এ আসক্তির ভয়াবহ বিস্তার ঘটেছে ছাত্র ও শিক্ষিত বেকারের মধ্যে। তিনি আরও বলেন, অন্যান্য রোগের মতোই মাদকাসক্তি একটি রোগ, যাকে বলা হয় ‘ক্রনিক রিল্যান্সিং ব্রেন ডিজিজ’। সঠিক নিয়মে এবং একটি নির্দিষ্ট মেয়াদে অ্যাভিডেন্স বেজইড ট্রিটমেন্টের মাধ্যমে এ রোগের চিকিৎসা এবং চিকিৎসা-পরবর্তী নিয়মিত ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে সুস্থ থাকা সম্ভব বলে জানান তিনি। চিকিৎসাসংশ্লিষ্টরা বলছেন, মাদকাসক্তের মধ্যে সব পেশার মানুষই রয়েছে। তবে বেশি আসক্ত তরুণরা। তাদের মেজাজ খিটখিটে থাকে, ঘুম হয় না। বিভিন্ন ধরনের রোগে তারা আক্রান্ত হয়। স্থায়ীভাবে যৌনক্ষমতা হারিয়ে ফেলে। স্কুল-কলেজ পড়ুয়া অনেক রোগী স্নায়ুসংক্রান্ত জটিলতা নিয়ে আসে চিকিৎসকের কাছে। মাদকাসক্তির কারণে তাদের মধ্যে দেখা দিচ্ছে এ ধরনের রোগ। অনেকে অল্প বয়সে স্ট্রোকে আক্রান্ত হচ্ছে। কোকেন, ইয়াবা, ফেনসিডিল সেবনের ফলে অল্প বয়সে স্ট্রোক হওয়ার ঝুঁকি বাড়ে। অনেক দিন ধরে মাদক নিতে থাকলে ওই ব্যক্তির শরীরে মাদকের সহনশীলতা বেড়ে যায়। এ বদভ্যাসের কারণে আগের তুলনায় অনেক বেশি মাদক সেবন করতে হয়। ফলে দেহে বিষক্রিয়া তৈরি হয়। একপর্যায়ে মাদকাসক্ত ব্যক্তি মানসিক ভারসাম্য হারিয়ে ফেলতে পারে, হারিয়ে ফেলতে পারে শারীরিক ভারসাম্যও। হার্টের কার্যকারিতা স্তিমিত হয়ে পড়ে। আস্তে আস্তে হার্টবিট বন্ধ হওয়ার উপক্রম হয়। ফলে মাদক সেবনকারীর মৃত্যুঝুঁকি বেড়ে যায়। পাকস্থলীর নানা রোগ যেমন আলসার, লিভার ক্যান্সার হতে পারে। খাবারে অরুচি হতে পারে। এ ছাড়া স্মৃতিশক্তি কমে যায়। স্পর্শের অনুভূতি কমে যায়। কারও কারও মাংসপেশি শুকিয়ে যায়। মানসিক রোগ বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ডা. হেলাল উদ্দিন আহমেদ বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, মাদকাসক্তি একটি মানসিক রোগ। মাদক সেবনের ফলে ওই ব্যক্তি শারীরিক-মানসিকভাবে তাৎক্ষণিক ও দীর্ঘমেয়াদে ক্ষতির শিকার হয়। তাদের মধ্যে অসহিষ্ণুতা দেখা যায়, আচরণ বদলে যায়, চিন্তাভাবনায় পরিবর্তন হয়, হিংসাত্মক আচরণ হতে পারে। এ ছাড়া দীর্ঘমেয়াদে বিষণ্নতা, হতাশা দেখা দেয়, ব্যক্তিত্বের পরিবর্তন হতে পারে। গুরুতর মানসিক রোগ দেখা দেয় মাদকাসক্তদের মাঝে। মাদক সেবন ছেড়ে দিলেও এ মানসিক রোগ জেঁকে বসে বলে মন্তব্য করেন তিনি।
দেশে মাদকসেবীর সংখ্যা দেড় কোটি : আন্তর্জাতিক মাদক চোরাচালানের রুট গোল্ডেন ট্রায়াঙ্গেল, গোল্ডেন ওয়েজ, গোল্ডেন ভিলেজ ও গোল্ডেন ক্রিসেন্ট এলাকাগুলোর জন্য সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ হচ্ছে বাংলাদেশ। ভারত ও মিয়ানমার থেকে ভয়ংকর সব মাদকের অনুপ্রবেশ ঘটছে বাংলাদেশে। জল, স্থল ও আকাশপথে স্রোতের মতো মাদক আসছে। নতুন মাদকের প্রতি মাদকসেবী তরুণদের ঝোঁক বেশি থাকে। শহর-নগর, পাড়া-মহল্লা সবখানেই মাদক কারবারিদের বিস্তৃত নেটওয়ার্ক। ফেনসিডিল, ইয়াবা, কোকেন কিংবা ক্রিস্টাল মেথ-আইস, কুশ, খাট, ডিওবিসহ সব ধরনের মাদকই মিলছে দেশজুড়ে। চাইলে মিলছে হোম ডেলিভারিও। সারা দেশে আতঙ্কের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে এই মাদক। আশঙ্কাজনক হারে বাড়ছে মাদকাসক্তের সংখ্যা। সরকারিভাবে মাদকসেবীর সংখ্যা না থাকলেও বেসরকারি মাদকদ্রব্য ও নেশা নিরোধ সংস্থার (মানস) হিসাবে দেশে বর্তমানে মাদকসেবীর সংখ্যা প্রায় দেড় কোটি। এর মধ্যে ১ কোটি মাদকাসক্ত এবং বাকি ৫০ লাখ মাঝেমধ্যে মাদক সেবন করেন। বেড়েছে নারী মাদকসেবীর সংখ্যাও। তরুণরা সবচেয়ে বেশি মাদকের ঝুঁকিতে রয়েছেন। ৮০ শতাংশ মাদক ব্যবহারকারীর বয়স ১৮ থেকে ৩৫ বছরের মধ্যে। মাদক চোরাচালান এবং পরিবহনের কাজে শিশু ও মহিলাদের ব্যবহার করা হচ্ছে, যা খুবই ভয়ংকর। দেশের মোট জনসংখ্যার ৮.৭৫ শতাংশ মাদকসেবী। গড়ে প্রতি ১২ জনে একজন মাদকসেবী। একেকজন বছরে ৫৬ হাজার টাকা মাদকের পেছনে খরচ করছেন। সে হিসাবে বছরে ১ লাখ ২০ হাজার কোটি টাকা খরচ হচ্ছে মাদকের পেছনে। ২০২৪ সালে প্রকাশিত মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের বার্ষিক প্রতিবেদন বলছে, ২০২২ থেকে ২০২৩-এর জুলাই পর্যন্ত মাদকাসক্ত হয়ে মাদকাসক্তি নিরাময় কেন্দ্রে (রিহ্যাব) গেছেন অন্তত ৫০ হাজার মাদকসেবী। পাঁচ বছরে রিহ্যাবে চিকিৎসা নেওয়া নারী মাদকাসক্ত বেড়েছে পাঁচ গুণ। আর ১৫ ও তার কম বয়সি মাদকাসক্ত বেড়ে হয়েছে তিন গুণ, সংখ্যায় যা ৪৭ হাজার ৩৭৬ জন।
মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর, পুলিশ, বিজিবি, র্যাব ও কোস্টগার্ডসহ সব আইন প্রয়োগকারী সংস্থার উদ্ধারকৃত মাদক, আসামি ও মামলার পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, ২০০৯ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত ১১ লাখ ৫২ হাজার ৫৯৫টি মামলায় ১৪ লাখ ৬২ হাজার ৭৮৯ জন আসামি গ্রেপ্তার করা হয়েছে। এর মধ্যে ৩৮ কোটি ৭৮ লাখ ৫১ হাজার ৩৯৫ পিস ইয়াবা, ১ কোটি ৩২ লাখ ৮১ হাজার ৫৪৮ বোতল ফেনসিডিল, ৩২ লাখ ৮ হাজার ৪২৭ বোতল বিদেশি মদ জব্দ করা হয়েছে। মানসের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ডা. অরূপ রতন চৌধুরী বলেন, দেশে মোট মাদকসেবী প্রায় দেড় কোটি। এর মধ্যে ১ কোটি মাদকাসক্ত। মোট মাদকসেবীর ৮০ শতাংশ পুরুষ আর ২০ শতাংশ নারী। মাদকাসক্তের ৮০ ভাগ অপরাধের সঙ্গে যুক্ত। সড়কে দুর্ঘটনাকবলিত যানবাহনের ৩০ ভাগ চালকই মাদকসেবী। দিন দিন নারীদের মধ্যে এ প্রবণতা বাড়ছে। এ ছাড়া নতুন নতুন মাদকেও আসক্তি বাড়ছে। বর্তমানে মাদকের দিকে কারও নজর নেই। ফলে মাদক মাফিয়া চক্র সুযোগ পেয়ে দেশব্যাপী মাদক ছড়িয়ে দিয়ে রমরমা ব্যবসা করছে। মাদক হলো সব অপরাধের জনক। খুন, ধর্ষণ, পারিবারিক কলহ থেকে শুরু করে ছিনতাইয়ের মতো ঘটনার বেশির ভাগ ঘটছে মাদকের কারণে।