অন্তর্বর্তী সরকারের কাছে আর্থিক খাত সংস্কারের অগ্রগতি সম্পর্কে জানতে চেয়েছে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ)। সংস্থাটির পক্ষ থেকে মার্চের মধ্যে একটি অগ্রগতি প্রতিবেদন চাওয়া হয়েছে। পরের মাস এপ্রিলে সংস্থাটির একটি প্রতিনিধিদল আবারও ঢাকা সফর করবে। অর্থ বিভাগ সূত্রে এসব তথ্য জানা গেছে। সূত্র জানায়, বিশেষ করে ব্যাংক, শেয়ারবাজার, বাজেট ব্যবস্থাপনা, কৃষি ও জ্বালানি খাতের ভর্তুকি কমানোর প্রতিশ্রুতি প্রসঙ্গে সরকার কী ধরনের উদ্যোগ নিয়েছে তা জানতে চেয়েছে সংস্থাটি। এমনকি ৫ আগস্ট রাজনৈতিক পট পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে দেশে যে সংস্কার কার্যক্রম শুরু হয়েছে তাতে আর্থিক খাত কতটা গুরুত্ব পাচ্ছে তারও একটি ধারণাপত্র চাওয়া হয়েছে। এদিকে সংস্থাটির সঙ্গে চলমান ৪ দশমিক ৭ বিলিয়ন ডলার ঋণচুক্তির আওতায় চতুর্থ কিস্তি ফেব্রুয়ারিতে ছাড় করার কথা ছিল। সেটার সময়সীমা ইতোমধ্যে পিছিয়ে জুনে নির্ধারণ করা হয়েছে। এমনকি আসছে ২০২৫-২৬ বাজেটে আইএমএফের সঙ্গে প্রতিশ্রুতির প্রতিফলন দেখে ঋণের কিস্তি ছাড়ের বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেবে সংস্থাটি।
অবশ্য অর্থ বিভাগ থেকে এক ব্যাখ্যায় জানানো হয়েছে- জুনে একসঙ্গে দুই কিস্তির (চতুর্থ, পঞ্চম) অর্থ ছাড় করবে আইএমএফ। আবার অর্থ উপদষ্টো বলেছেন, আমরা আপাতত আইএমএফের ঋণের কিস্তির জন্য মরিয়া নই। এর আগে আইএমএফ বলেছিল, শর্ত পূরণ ঠিকমতো না হলে যে কোনো সময় ঋণের কিস্তি আটকে দেবে। যেসব জায়গায় আইএমএফ অধিক জোর দিয়েছে এবং এগুলোর বিষয়ে অগ্রগতিও জানতে চেয়েছে সেগুলো হলো, বাজেটে ব্যবস্থাপনায় পরিবর্তন আনা, ভর্তুকি পুরোপুরি তুলে দেওয়া, জ্বালানি তেলের দাম সমন্বয়ে স্মার্ট পদ্ধতির প্রচলন, আন্তর্জাতিক নিয়মে রিজার্ভের হিসাব সংরক্ষণ করা, কর-জিডিপি বাড়ানো, ভ্যাট আইন-২০১২ সংশোধিত পুরোপুরি বাস্তবায়ন করা। এসব বিষয়সহ সামষ্টিক অর্থনীতির গতিপ্রকৃতি সংক্রান্ত একটি অগ্রগতি প্রতিবেদন তৈরি করা হচ্ছে। যা আইএমএফের দক্ষিণ এশিয়াবিষয়ক প্রধানের কাছে পাঠানো হবে।
জানা গেছে, প্রথম তিন কিস্তির অর্থ জরুরি সহায়তার অংশ হিসেবে সঠিক সময়ে ছাড় করা হয়েছে। এমনকি অর্থ ছাড়ের ক্ষেত্রে শর্ত শিথিলও করেছিল সংস্থাটি। সে সময় দেশের অর্থনীতি অনেক বেশি অস্থিতিশীল ছিল। পণ্যমূল্যও বেড়ে গিয়েছিল। সেসব বিষয় আমলে নিয়ে বাংলাদেশকে দ্রুত সহায়তা দিয়েছিল আইএমএফ। বর্তমানে দেশের অর্থনীতি অনেকটাই স্থিতিশীল, পণ্যমূল্যও কিছুটা কমেছে। রিজার্ভ বেড়েছে। রপ্তানি আয়েও ইতিবাচক ধারা ফিরেছে। তবে বাজেট বাস্তবায়নের গতি অত্যন্ত মন্থর। বাজেট ব্যবস্থাপনায় যেসব পরিবর্তন আনার কথা সেগুলোর বিষয়ে তেমন কোনো অগ্রগতি নেই। শেয়ারবাজার ও ব্যাংকিং খাতেও অস্থিরতা কমেনি। সরকার পরিবর্তন হলেও আর্থিক খাতে সুশাসন প্রতিষ্ঠিত হয়নি। এজন্য চতুর্থ কিস্তির অর্থ ছাড়ের প্রসঙ্গে শর্তপূরণের বিষয়ে কঠোরতা দেখাচ্ছে আইএমএফ। এদিকে আর্থিক খাতে নিয়ন্ত্রণ কাঠামো জোরদার ও সুশাসন নিশ্চিতে সংস্কার কার্যক্রম আরও ত্বরান্বিত করার সুপারিশ করেছে আইএমএফ। সংস্থাটি মনে করে- সরকার এখনো ডলারের বিপরীতের টাকার মান জোরপূর্বক ধরে রেখেছে। এজন্য টাকাকে আরও অবমূল্যায়নের পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। এর আগে ডিসেম্বরে সংস্থাটির এক প্রতিবেদনে জানায়, আর্থিক খাতে নিয়ন্ত্রণ কাঠামো জোরদার করতে হবে। দ্রুত চলমান সংস্কার কার্যক্রম এগিয়ে নিতে হবে। আন্তর্জাতিক মানদন্ডের সঙ্গে সমন্বয় করে আর্থিক খাতে ঋণসংক্রান্ত প্রতিবেদনগুলো তৈরি করতে হবে। এর মধ্যে খেলাপি ঋণের সংজ্ঞা আন্তর্জাতিক মানের করতে হবে। ব্যাংকগুলোতে ঝুঁকিভিত্তিক তদারকি ব্যবস্থা চালুর বিষয়ে জোর দিয়েছে আইএমএফ। গত তিন মাসে এসব বিষয়ে কী ধরনের পরিবর্তন এসেছে তাও জানতে চেয়েছে সংস্থাটি।