দেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের সীমান্তঘেঁষা জনপদ জকিগঞ্জ। ভারতের বরাক নদী জকিগঞ্জের আমলসীদ হয়ে বাংলাদেশে প্রবেশ করে সুরমা-কুশিয়ারা নামধারণ করে প্রবাহিত হয়েছে। নদী দুটির প্রায় ৬৬ কিলোমিটার অংশ সীমান্ত নদী হিসেবে পরিচিতি। এর মধ্যে কুশিয়ারার ৪১ কিলোমিটার ও সুরমার ২৫ কিলোমিটার আন্তসীমান্ত নদী। গত ভয়াবহ বন্যায় সুরমা-কুশিয়ারার বেড়িবাঁধের (ডাইকের) অন্তত ৩০টি স্থান ভেঙে পানি প্রবেশ করে জনপদে। ক্ষতিগ্রস্ত হয় ঘরবাড়ি ও ফসলি জমি। বন্যা-পরবর্তী সময়ে সেই বাঁধ মেরামত করতে গেলে ভারতের সীমান্তরক্ষী ফোর্স-বিএসএফ বাধা দেয়। ফলে আটকে যায় পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) বেড়িবাঁধ সংস্কার কাজ। বিএসএফের বাধায় ক্ষতিগ্রস্ত বাঁধ মেরামত বা মাটি ফেলে ভরাট করা সম্ভব না হওয়ায় আগামী বর্ষায় ভয়াবহ বন্যার আশঙ্কা করছেন সুরমা-কুশিয়ারা নদীপাড়ের বাসিন্দারা। স্থানীয় জনগণ জানান, ২০২৪ সালে সুরমা ও কুশিয়ারা নদীর প্রায় অর্ধশত স্থানের বাঁধ ভেঙে কয়েক দফা বন্যায় প্লাবিত হয় জকিগঞ্জ উপজেলা। বন্যা-পরবর্তী বাঁধ মেরামতের উদ্যোগ নেয় পাউবো। দরপত্র আহ্বান করে ঠিকাদারও নিয়োগ দেওয়া হয়। কিন্তু বাঁধে মাটি ফেলার কাজ শুরু হলে বাধা দেয় বিএসএফ। দফায় দফায় বাধার মুখে বন্ধ হয়ে যায় বাঁধ মেরামতের কাজ। সরেজমিন জকিগঞ্জ সদর ইউনিয়নের ছবড়িয়া এলাকায় গিয়ে দেখা যায় কুশিয়ারা নদীর বাঁধের বিশাল অংশ অরক্ষিত অবস্থায় রয়েছে। স্থানীয় লোকজন বন্যার সময় ভাঙা বাঁধে যেভাবে বালুর বস্তা ফেলে রেখেছেন, সেভাবেই আছে। ছবড়িয়া এলাকার আবদুল করিম জানান, বাঁধ মেরামতের কাজ শুরু করলেই বিএসএফ বাধা দেয়। বাধার কারণে এ বছর শুষ্ক মৌসুমে বাঁধে মাটি ফেলার কাজ করতে না পারায় এলাকার লোকজন আতঙ্কে আছেন।
পাউবো জানায়, কুশিয়ারার ৪১ কিলোমিটার ও সুরমার ২৫ কিলোমিটার আন্তসীমান্ত নদী। আইন অনুযায়ী সীমান্তের ১৫০ গজের ভিতরে কৃষি কাজ, মাছ আহরণ ও পানি ব্যবহারসহ কিছু কাজ করার অনুমতি রয়েছে। কিন্তু স্থাপনা নির্মাণের কোনো বিধান নেই। তবে অতীতে নদীর বাঁধ নির্মাণের কাজে কখনো বিএসএফ বাধা দেয়নি। বন্যায় সুরমা-কুশিয়ারার যেসব স্থানে ভাঙন দেখা দেয় শুষ্ক মৌসুমে পাউবো সেসব স্থানে মাটি ফেলে বাঁধ নির্মাণের কাজ করে। কিন্তু এবছর বাঁধ নির্মাণের কাজ শুরু হলে বিএসএফ বাধা দেয়। কোনোভাবেই তারা বাঁধ মেরামতের জন্য মাটি ফেলতে দেয়নি।
জকিগঞ্জ উপজেলা পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান ইকবাল আহমদ জানান, কুশিয়ারা নদীর ছবড়িয়া, ছয়লেন, মাইজকান্দি, সষ্যকুড়ি, বাখরশাল, মানিকপুর, রারাই এবং সুরমা নদীর বাল্লা, শরীফাবাদ ও হাজীগঞ্জসহ বিভিন্ন এলাকায় বাঁধ অরক্ষিত অবস্থায় রয়েছে। বিএসএফের বাধার কারণে বাঁধ মেরামত করতে না পারায় আগামী বর্ষায় বিনা বাধায় পানি ঢুকবে। এতে উপজেলাজুড়ে ভয়াবহ বন্যার সৃষ্টি হবে। ঘরবাড়ি পানিতে তলিয়ে যাওয়ার পাশাপাশি বিপুল পরিমাণ ফসলহানি ঘটবে।
পানি উন্নয়ন বোর্ড সিলেটের নির্বাহী প্রকৌশলী দীপক রঞ্জন দাশ জানান, বিএসএফের বাধার কারণে সুরমা ও কুশিয়ারার অন্তত ৩০টি স্থানে বাঁধ নির্মাণের কাজ করা যাচ্ছে না। এক্সেভেটর ও ড্রাম ট্রাক নিয়ে বাঁধে মাটি ভরাটের কাজ করতে গেলেই বিএসএফ বাধা দিচ্ছে। ফলে বাধ্য হয়ে বাঁধ নির্মাণের কাজ বন্ধ রাখতে হচ্ছে।