আগামী ২০২৫-২৬ অর্থবছরের বাজেটের প্রস্তুতি ইতোমধ্যেই শুরু করে দিয়েছে সরকার। চলতি বছরের ডিসেম্বরের দিকে জাতীয় সংসদ নির্বাচন করতে হলে বাড়তি প্রায় ৩ হাজার কোটি টাকার প্রয়োজন পড়বে। যা বার্ষিক বাজেট থেকে জোগান দিতে হবে অর্থ বিভাগকে। আর অর্থ বিভাগ নিজে কোনো আয় করে না। ফলে অর্থ বিভাগ টাকার জন্য মুখিয়ে থাকবে এনবিআরের প্রতি। দেশের অর্থনীতির বর্তমান চালচিত্র ও করণীয়সংক্রান্ত একটি প্রতিবেদন ৯ ফেব্রুয়ারি অর্থ বিভাগ থেকে প্রধান উপদেষ্টার কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে। সেই প্রতিবেদনে এসব তথ্য উল্লেখ করা হয়েছে। এজন্য ভ্যাট আহরণ বাড়াতে আয়কর ও ভ্যাট খাতের পূর্ণাঙ্গ অটোমেশনের প্রস্তাব করা হয়েছে। অবশ্য অটোমেশন প্রক্রিয়া ইতোমধ্যে শুরুও করেছে এনবিআর। এতে আরও বলা হয়, এ সময়ে বাংলাদেশ স্বল্পোন্নত দেশের তালিকা থেকে বেরিয়ে গেলে বাজার উন্মুক্ত হয়ে যাবে। তখন আমদানি পর্যায়ে শুল্ক হ্রাস পাবে। ফলে রাজস্ব আয় বাড়ানোর জন্য সরকারের ভ্যাট ও আয়কর নির্ভরতা বাড়বে। অন্যথায় রাজস্ব আদায়ে ঘাটতি বেড়ে যাবে। এজন্য আগামী বছরের বাজেটে ভ্যাট ও আয়করের ক্ষেত্রে ব্যাপক পরিবর্তন আনতে হবে। অবশ্য সেই কাজটা সরকার ইতোমধ্যে অনেকটা এগিয়ে রেখেছে। কেননা গত মাসে শতাধিক পণ্যের ওপর ভ্যাট ও শুল্ক বাড়ানো হয়েছে। যা থেকে অর্থবছর শেষে সরকার ১২ হাজার কোটি টাকা অতিরিক্ত আয় করতে পারবে। গ্রাহক পর্যায়ে কোনো পণ্য বা সেবার ভ্যাট বাড়ালে তার সরাসরি প্রভাব পড়ে ভোক্তার ওপর। এই পরিস্থিতি পরবর্তী অর্থবছর অপরিবর্তিত রাখলে সে বছরও ১২ থেকে ১৫ হাজার কোটি টাকা বেশি রাজস্ব আদায় হবে। এজন্য আগামী বছরের বাজেটে করজালকে নতুন করে সাজাতে এখন থেকেই কাজ শুরু করেছে সরকার। এতে করে পণ্য ও সেবার দাম কোনো কোনো ক্ষেত্রে আরও বাড়বে। যার ফলে সব শ্রেণির মানুষের ওপর আয় ও ভ্যাটের চাপ বাড়বে। তবে নিম্ন ও মধ্য আয়ের মানুষের ভোগান্তি কীভাবে কমানো যায় সে কথাও ভাবছে সরকার। এজন্য যার যার বেশি সম্পদ তার প্রতি তত বেশি সারচার্জ আরোপ করা হবে। অবশ্য এটা এ প্রথা এখনো কাগজে কলমে রয়েছে। কিন্তু ভ্যাট ও আয়কর ফাঁকির কারণে তা থেকে কাঙ্ক্ষিত হারে রাজস্ব পায় না সরকার। প্রতিবেদনে বলা হয়, সামনের দিনগুলোতে রাজস্ব বাড়াতে হলে দেশব্যাপী আয়কর অফিস স্থাপন করতে হবে। সম্ভব হলে তৃণমূল পর্যায়ে (গ্রামে) আয়কর আহরণ করতে হবে। যা আসছে ২০২৫-২৬ বছর থেকেই শুরু করতে হবে। কর ব্যয় যৌক্তিক পর্যায়ে কমিয়ে আনতে হবে। এতে করে এনবিআরের অসৎ কর্মকর্তাদের রোজগারে কিছুটা ভাটা পড়বে এবং দুর্নীতি কমবে বলে আশা করছে অর্থবিভাগ।
কর আদায় থেকে করনীতিকে সম্পূর্ণ আলাদা করা হবে। এর প্রাথমিক কার্যক্রম ইতোমধ্যে শুরু করেছে এনবিআর। রাজস্ব আদায়ের সঙ্গে জড়িতদের দক্ষতা ও সক্ষমতা বৃদ্ধির পাশাপাশি নৈতিকতার শিক্ষাকে জোরদার করা হবে। করজাল সম্প্রসারণ ও তা পরিপালন করা হবে। এসব পরিকল্পনা বাস্তবায়নে এনবিআরের সব পর্যায়ের জনবলকে প্রস্তুতি নিতে নির্দেশনা দিয়েছেন প্রধান উপদেষ্টা।
অর্থবিভাগ বলছে, আগের সরকারগুলো রাজনৈতিক বিবেচনায় রাজস্ব বোর্ডকেন্দ্রিক যেসব সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল সে রকম কোনো সিদ্ধান্ত এবার নেওয়া হবে না। করনেট ও কর আদায় বৃদ্ধির জন্য কঠোর কিংবা অপ্রিয় সিদ্ধান্ত হলেও তা বাস্তবায়ন করা হবে। এর অংশ হিসেবে ইতোমধ্যে শতাধিক পণ্যের ওপর ভ্যাট বাড়নো হয়েছে।
এ প্রসঙ্গে বিশ্বব্যাংক ঢাকার সাবেক মুখ্য অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেন বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, অন্তর্বর্তী সরকার যেসব সংস্কারমূলক কাজে হাত দিয়েছে সেগুলো করতে যথেষ্ট সময়ের প্রয়োজন। এরই মধ্যে নতুন একটি বাজেটের সময় ঘনিয়ে আসছে। আবার চলতি বাজেট বাস্তবায়ন নিয়েও সরকারের ওপর চাপ রয়েছে। ফলে রাজস্ব আদায় বাড়াতে না পারলে বাজেট বাস্তবায়ন পিছিয়ে যাবে। এতে করে অর্থনৈতিক সংস্কারগুলো কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্য অর্জনে ব্যর্থ হতে পারে বলে তিনি মনে করেন।