প্রাকৃতিক, অর্থনৈতিক ও ভৌগোলিক- এই তিন দৃষ্টিকোণেই কর্ণফুলী নদীর গুরুত্ব অনন্য। নদীটির কোলেই আছে দেশের অর্থনীতির হৃৎপি- চট্টগ্রাম সমুদ্রবন্দর। এই নদীর ওপর নির্মিত সেতুটিই নগরের সঙ্গে সংযোগ ঘটিয়েছে কক্সাবাজার, বান্দরবান, টেকনাফ এবং দক্ষিণ চট্টগ্রামের। অথচ এমন গুরুত্বপূর্ণ নদীটিই এখন দখল, দূষণ ও ভরাটের কবলে পড়েছে। ফলে কমছে নাব্য, কমছে মৎস্য সম্পদ। ভরাট হচ্ছে কর্ণফুলীর শাখা খাল। কমছে খালকেন্দ্রিক নৌপরিবহন।
স্থানীয় সূত্রগুলো জানিয়েছে, দেশের হৃৎপি- হলো চট্টগ্রাম বন্দর। জাতীয় অর্থনীতিতে চট্টগ্রাম বন্দরের অবদান অপরীসিম। দেশের আমদানি বাণিজ্যের প্রায় ৮৫ ভাগ এবং রপ্তানি বাণিজ্যের ৮০ ভাগই পরিচালিত হয় বন্দরের মাধ্যমে। এই বন্দর অবস্থিত কর্ণফুলীর তীরেই। বন্দরের অস্তিত্বই নির্ভর করছে কর্ণফুলীর ওপর। দেশের জাতীয় অর্থনীতির উৎকর্ষ, সমৃদ্ধি, উন্নয়ন ও অগ্রগতি সিংহভাগ নির্ভর করে বন্দরের ওপর। আর বন্দর নির্ভর করে কর্ণফুলী নদীর ওপর। চবির প্রাণিবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক ড. মনজুরুল কিবরিয়া বলেন, গুরুত্বপূর্ণ কর্ণফুলী নদীটিকে এখন নানাভাবে গ্রাস করা হচ্ছে। দখল দূষণের কবলে নদী ক্রমেই ছোট হয়ে আসছে, আর তা হুমকি তৈরি করছে সমুদ্রবন্দরের জন্য। শহরের আবাসিক ও বাণিজ্যিক বর্জ্যগুলো খাল হয়ে পড়ছে কর্ণফুলীতে। ফলে কমছে মৎস্য সম্পদ, কমছে নদীর নাব্য। তাই দেশের জাতীয় অর্থনীতির স্বার্থেই কর্ণফুলী নদীতে বাঁচানো জরুরি। চট্টগ্রাম খাল-নদী রক্ষা আন্দোলনের সাধারণ সম্পাদক আলীউর রহমান বলেন, কর্ণফুলী নদীর তীরে এখনো অনেক স্থাপনা থেকে গেছে। এ ব্যাপারে আমরা জেলা প্রশাসনকে বারবার অবহিত করেছি। আদালতের নির্দেশনাও আছে। তাছাড়া, নগরের বর্জ্যও খাল হয়ে আসছে কর্ণফুলীতে। নদীটিকে বাঁচাতে হলে এসব দখল ও দূষণ থেকে রক্ষা করতে হবে। ২০১২ সালের এক জরিপ থেকে জানা গেছে, কর্ণফুলী নদীর গড় গভীরতা ছিল ৩ থেকে ২২ মিটার। এর মধ্যে বন্দর এলাকায় ছিল ১১ থেকে ২২ মিটার। বন্দরের হাইড্রোগ্রাফিক জরিপ অনুযায়ী, ১৯৮৯-৯০ সালে ব্রিজঘাট এলাকায় কর্ণফুলীর প্রস্থ ছিল ৮৭০ মিটার। একই জায়গায় ২০০৯-১০ সালের জরিপে প্রস্থ হয় ৬০০ মিটার। ১৯৯০ সালে চাক্তাই খালের মুখ এলাকায় প্রস্থ ছিল ৬৫০ মিটার, ২০১১ সালে তা হয় ৬০০ মিটার। সর্বশেষ জরিপ অনুযায়ী, গত ২৫ বছরে স্থানভেদে নদীর প্রশস্ততা কমেছে ৫০ থেকে ৩০০ মিটার পর্যন্ত। বন্দরের মাঝিরঘাট এলাকায় অতীতে একটি পন্টুন দিয়ে পণ্য ওঠা-নামা করা যেত, এখন ক্ষেত্র বিশেষ দুই থেকে তিনটি পন্টুন ব্যবহার করতে হচ্ছে। নদীতে পলি জমার কারণে জাহাজ তীরের কাছে ভিড়তে না পারায় এমন দশা। পক্ষান্তরে, গঠনের দিক থেকে দেশের অন্যান্য নদীর চেয়ে ভিন্নতর এ নদী। কর্ণফুলী নদীর কোথাও কোথাও ৩৫ দশমিক শূন্য ৫ ডিগ্রি আনুভূমিক তল রয়েছে। এটি এমনভাবেই খাড়া যে জোয়ারের পানি কোনোভাবেই উজানে ২০ কিলোমিটারের বেশি অতিক্রম করতে পারে না। ফলে পাহাড় থেকে নেমে আসা পলি মাটি ক্রমশ নদীর নাব্য কমিয়ে ফেলে। কর্ণফুলী নদীটি প্রতিনিয়তই দূষণের কবলে আছে। নদীতে পড়ছে নগরের কারখানার তরল বর্জ্য। সঙ্গে আছে গৃহস্থালি বর্জ্য। তাছাড়া নদীর সঙ্গে থাকা প্রায় ১৯টি শাখা খালের মাধ্যমে পড়ছে কর্ণফুলী নদীতে। পরিবেশ অধিদপ্তর কর্ণফুলী নদীর তীরবর্তী কর্ণফুলী পেপার মিল, রেয়ন মিল, সিইউএফএল, কাফকো, টিএসপি, ইস্টার্ন রিফাইনারি লিমিটেড, পদ্মা, মেঘনা, যমুনার ডিপো, চিটাগাং ড্রাইডক লিমিটেড, সিমেন্ট কারখানাসহ ২২০টি কারখানাকে মারাত্মক দূষণকারী হিসেবে চিহ্নিত করেছে। তাছাড়া, চট্টগ্রাম নগরের কাছে কালুরঘাট, নাসিরাবাদ, ভাটিয়ারি, বাড়বকুন্ড, পতেঙ্গা, ফৌজদারহাট, কাপ্তাই ও ষোলোশহর এলাকায় অবস্থিত ১৯টি চামড়া শিল্প, ২৬টি বস্ত্রকল, পাঁচটি মৎস্য প্রক্রিয়াকরণ কারখানা, একটি ইস্পাত মিল, আটটি সাবান কারখানা, চারটি রঙের কারখানা ও দুটি সিমেন্ট কারখানার বর্জ্য প্রতিনিয়ত কর্ণফুলী নদীতে গিয়ে পড়ছে। অন্যদিকে, কাপ্তাই নতুন বাজার থেকে মোহনার মাথা পর্যন্ত ৮৮ দশমকি ৫ কিলোমিটার কর্ণফুলী তীরবর্তী ছোট-বড় ৪০টি বাজারের মৌসুমি ফল ও ফলের উচ্ছিষ্ট ফেলা হয় কর্ণফুলীতে। আছে খোলা বাথরুম, হাঁস, মুরগি, গরু, ছাগলের মল ও মৃতদেহ। সর্বোপরি কলকারখানা ও গৃহস্থালি বর্জ্য, জাহাজ ও নৌকার নির্গত তেল, কসাইখানার বর্জ্য ও সিমেন্ট ক্লিংকারের পাউডার, নগরীর সলিড এবং তরল বর্জ্য সব মিলে নাভিশ্বাস উঠেছে কর্ণফুলীর। পরিবেশ অধিদপ্তর কর্ণফুলী নদীতে ২০১৪ সালে এক সমীক্ষা পরিচালনা করে। সমীক্ষায় উল্লেখ করা হয়, দূষণের কারণে নদীর ৩৫ প্রজাতির মাছ বিলুপ্ত হয়েছে। অতীতে এ নদীতে ৬৬ প্রজাতির মিঠা পানির মাছ ও ৫৯ প্রজাতির মিশ্র পানির এবং ১৫ প্রজাতির সামুদ্রিক পরিযায়ী মাছ পাওয়া যেত। এখন মিঠা পানির ২০ থেকে ২৫ প্রজাতির এবং মিশ্র পানির ১০ প্রজাতির মাছ বিলুপ্ত প্রায়। এ ছাড়া হুমকিতে আছে আরও ২০ প্রজাতির মাছ। দূষণই এর একমাত্র কারণ।