দেশের পোশাক খাতে কর্মরত শ্রমিকদের ভাগ্য বদলায়নি এখনো। কোনোরকমে জীবন বাঁচিয়ে রেখেছেন তারা। উল্লেখসংখ্যক শ্রমিকদের কমপক্ষে ১০ ঘণ্টার বেশি কাজ করতে হয়। ন্যূনতম মজুরিতে কোনোরকম ডাল-ভাত খেয়ে এবং ঋণ করে তারা জীবন কাটাচ্ছেন।
পুরুষের চেয়ে নারী শ্রমিক বেতন কম পান এবং নির্যাতনের শিকারও তাদের বেশি হতে হয়। এ ছাড়া কর্মক্ষেত্রে শ্রমিকদের শারীরিক, মানসিক নির্যাতন, যৌন হয়রানি ও চাকরি হারানোর মতো হুমকি পেতে হয়। বেশির ভাগ কারখানায় অবৈধভাবে শিশু শ্রমিক নিয়োগ হয়। বিশেষ করে সাব-কন্ট্রাক ভিত্তিতে যে কাজ হয়, সেখানে শিশু শ্রম বেশি। গত ৬ ফেব্রুয়ারি প্রকাশিত ইউনিভার্সিটি অব নটিংহামের রাইটস ল্যাব এবং গুডওয়েব ইন্টারন্যাশনাল যৌথভাবে ‘মডার্ন সেøভারি অ্যান্ড চাইল্ড লেবার ইন বাংলাদেশ’স গার্মেন্ট সেক্টর : ডকুমেন্টিং রিস্ক অ্যান্ড ইনফর্মিং সল্যুশন’ শীর্ষক এক গবেষণায় এসব তথ্য উঠে আসে।
বাংলাদেশ লেবার ফাউন্ডেশন এবং আওয়াজ ফাউন্ডেশন এতে সহায়তা করে। ঢাকা এবং চট্টগ্রামের কারখানাগুলোতে জরিপ চালিয়ে এ গবেষণা করা হয়। গবেষণায় অংশ নেওয়া শ্রমিকদের উল্লেখসংখ্যকই মেশিন অপারেটর বা হেল্পার। ২০২৩ সালের ডিসেম্বর থেকে ২০২৪-এর জুলাই পর্যন্ত জরিপটি পরিচালিত হয়। এতে প্রায় ২ হাজার শ্রমিকের (১ হাজার ৯৭৪ জন শ্রমিক) সাক্ষাৎকার নেওয়া হয়।
শ্রম আইন অনুযায়ী- একজন প্রাপ্তবয়স্ক শ্রমিক দিনে ৮ ঘণ্টা এবং সপ্তাহে ৪৮ ঘণ্টার বেশি কাজ করতে পারবে না। আবার ওভারটাইমের সময় সপ্তাহে ৬০ ঘণ্টার বেশি হবে না। আর কোনো কিশোর/কিশোরী কারখানায় দিনে পাঁচ ঘণ্টা আর সপ্তাহে ৩০ ঘণ্টার বেশি কাজ করতে পারবে না। আইন বলছে, শ্রমিকরা সপ্তাহে একটি এবং বছরে সাধারণ ছুটি কাটানোর সুযোগ পাবেন। আর মজুরিসহ বছরে ১৪ দিনের সিক লিভ নিতে পারবে। কিন্তু বাস্তব পরিস্থিতি ভিন্ন।
কষ্টের জীবন : শ্রমিকদের এ ন্যূনতম মজুরিতে জীবনধারণ করা কষ্টের। গবেষণাটি বলছে, ৩২ শতাংশ পোশাক শ্রমিক ন্যূনতম মজুরির চেয়ে কম বেতন পান। হিসাব বলছে, রাজধানী ঢাকায় ২৭ হাজার ৯০০ এবং ঢাকার আশপাশে একজন শ্রমিকের জীবনধারণে প্রয়োজন ২৩ হাজার ১০০ টাকা। ট্রেড ইউনিয়নগুলো ২৩ হাজার টাকা ন্যূনতম মজুরির দাবি জানালেও সর্বশেষ শ্রমিকের ন্যূনতম মজুরি সাড়ে ১২ হাজার টাকা নির্ধারণ করা হয়। ৭০ শতাংশ শ্রমিক জানান, কোনোরকমে বেঁচে থাকতে হলে যে বেতন প্রয়োজন তা তাদের নেই। এর ফলে অনেকেই অতিরিক্ত কাজ করতে বাধ্য হন। রপ্তানিমুখী কারখানার ৮২ শতাংশ শ্রমিক ন্যূনতম মজুরি পেলেও সাব-কন্ট্রাক কারখানার কর্মীদের ৫৯ শতাংশ মাসে ১২ হাজারের চেয়ে কম মজুরি পান। কাজ ঠিকমতো শেষ করতে না পারলে শ্রমিকদের বেতন থেকেও টাকা কেটে নেওয়া হয়। এজন্য সংসার চালাতে শ্রমিকরা ঋণ নেন। ১৩ শতাংশই জানান, তারা ঋণ করে সংসার চালান। ৭৮ শতাংশ শ্রমিক জানান, তারা কম মজুরির কারণে পরিবারের জন্য পর্যাপ্ত খাবার কিনতে পারেন না। বেশির ভাগ সময়ই তারা ভাত-ডাল খান। মাসে দু-একবার মাছ- মাংস খান। বাড়ি ভাড়া দেওয়ার পর এ শ্রমিকদের যে টাকা থাকে তা দিয়ে কোনোমতে শুধু পেট ভরার জন্য খাবার খান। জরিপের অর্ধেক শ্রমিকই অতিরিক্ত আয়ের জন্য ওভারটাইম করেন।
সাব-কন্ট্রাক্ট কারখানার শ্রমিকদের মজুরি রপ্তানিমুখী কারখানার শ্রমিকদের চেয়ে কম। সাব-কন্ট্রাক্ট কারখানার শ্রমিকরা দিনে ১২ ঘণ্টা বা তার চেয়ে বেশি সময় কাজ করেন।
উদ্বেগ শিশু শ্রমে : সাব-কন্ট্রাক্ট কারখানাগুলোতে শিশু শ্রমিকের সংখ্যা বেশি। এসব শ্রমিককে কারখানায় সরাসরি আবার কখনো তাদের পরিবারের সদস্যরা কাজে ঢুকিয়ে দেন। শিশু শ্রমিকদের বড়দের মতোই কঠিন কাজ করতে হয়। তাদের নির্দিষ্ট কর্মঘণ্টার বেশি কাজ করতে হয়। এ জরিপে পোশাক কারখানায় কাজ করে এমন ১২২ জন শিশু শ্রমিকের সঙ্গে কথা হয়। এদের বয়স ১০ থেকে সর্বোচ্চ ১৭। দেখা যায়, ৯৯ শতাংশ শিশু দিনে ৮ বা তার চেয়ে বেশি ঘণ্টা কাজ করে। ৮৯ শতাংশ শিশু (১০৮ জন) জানায়, তারা সন্ধ্যা ৭টার পরও কাজ করে। ৯ শতাংশ সকাল ৭টার আগেও কাজ করে। তারা সপ্তাহে ৩০ ঘণ্টার বেশি কাজ করে। চট্টগ্রামের শিশু শ্রমিকরা দিনে ১৩ থেকে ১৫ ঘণ্টা পর্যন্ত কাজ করে। আর ঢাকা ও তার আশপাশের শিশুরা ৯ থেকে ১৪ ঘণ্টা পর্যন্ত কাজ করে। তারা ৫ হাজার থেকে সাড়ে ১১ হাজার টাকা পর্যন্ত বেতন পায়। বড়দের সমান কাজ করেও তারা বড়দের চেয়ে কম বেতন পায়। ৬১ শতাংশ শিশু মাসে ৬ থেকে ১০ হাজার টাকা পায়। চট্টগ্রামে ছয়জন শিশু শ্রমিক জানায়, তারা মাসে আড়াই থেকে ৪ হাজার টাকা পর্যন্ত পায়। মাত্র ১২ শতাংশ শিশু জানায়, তারা মাসে সাড়ে ১২ হাজার টাকার বেশি পায়। ঢাকা ও তার আশপাশের ২৭ শতাংশ শিশু জানায়, তারা লুব্রিকেটিং এবং ভারী যন্ত্রপাতি সরানোর মতো কাজ করে। এ ছাড়া সময়মতো কাজ শেষ করতে না পারায় শিশুরা শারীরিক নির্যাতনেরও শিকার হয়।
নারী শ্রমিক বঞ্চনার শিকার : এ খাতে নারীরা বেশি কাজ করলেও তারা পুরুষ সহকর্মীর চেয়ে গড়ে ২ হাজার টাকা কম পান। নারীরা এখনো পোশাক কারখানায় নিচু পদে কাজ করেন, যেখানে পুরুষরা গুরুত্বপূর্ণ পদে কাজ করেন। কারখানায় বেশির ভাগ নারী শ্রমিক যেখানে ১২ হাজার টাকার নিচে মাসিক বেতন পান, সেখানে পুরুষরা পান ১৫ হাজার টাকার ওপর। চট্টগ্রামে নারী শ্রমিকদের শারীরিক নির্যাতনের শিকার হতে হয়। বেশির ভাগ কারখানায় নারীদের মাতৃত্বকালীন ছুটি দিলেও জরিপে অংশ নেওয়া ১৩ জন শ্রমিককে এ সময় ছাঁটাই করা হয়। কাজে বিরতি, টয়লেটে যাওয়া কিংবা বেতন কম দিলে আপত্তি জানালে তাদের হুমকি দেওয়া হয়। আবার নির্দিষ্ট সময়ে টার্গেট পূরণ না করলেও শ্রমিকদের ম্যানেজাররা শাস্তি দেন।