ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর সাবেক মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী, এমপিসহ রাজনৈতিক ও আর্থিকভাবে প্রভাবশালী প্রায় ২০০ জনের অবৈধ সম্পদের বিষয়ে অনুসন্ধান শুরু করে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। সম্প্রতি দুদকের কাজের গতি আরও বেড়ে গেছে। অনুসন্ধান শেষ করে গত ছয় মাসে তারা ১২৮টি মামলা করেছে এবং অনুসন্ধান চলমান রয়েছে ২৪৯টির।
প্রথম মামলাটি হয় গত বছরের ৯ অক্টোবর। অবৈধ সম্পদ, অর্থ আত্মসাৎ ও দুর্নীতিতে জড়িত থাকার সুনির্দিষ্ট তথ্যের ভিত্তিতে সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খানের বিরুদ্ধে মামলাটি করেছে দুদক। এ মামলায় আসাদুজ্জামান খানের স্ত্রী এবং দুই ছেলেমেয়েকেও আসামি করা হয়। তার সাবেক সহকারী একান্ত সচিব (এপিএস) মনির হোসেনও ওই মামলার আসামি।
দুদক সূত্র জানায়, বিশেষ তদন্তের মহাপরিচালকের অধীনে ১১৭টি মামলার তদন্ত চলছে এবং অনুসন্ধান আছে ১৩২টির। মানি লন্ডারিংয়ের মহাপরিচালকের অধীনে তদন্ত চলছে চার মামলার এবং অনুসন্ধান চলছে ২১টির। তদন্ত-১ এর মহাপরিচালকের অধীনে তদন্ত চলছে চারটি এবং অনুসন্ধান চলছে ৪৩টি মামলার। তদন্ত-২ এর মহাপরিচালকের অধীনে তদন্ত চলছে দুটি এবং অনুসন্ধান চলছে ৫৩টি মামলা।
গত ৩০ জানুয়ারি গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের সাবেক প্রতিমন্ত্রী শরীফ আহমেদের বিরুদ্ধে মামলা হয়। এ ছাড়া তার স্ত্রী, শ্বশুর-শাশুড়িসহ আরও পাঁচজনের বিরুদ্ধে অবৈধ সম্পদের প্রমাণ পাওয়ায় তাদের বিরুদ্ধে নোটিস দেয় দুদক। সূত্র জানায়, ময়মনসিংহ-২ আসনের সাবেক এমপি শরীফ আহমেদের বেনামে ঠিকাদারি সিন্ডিকেট নিয়ন্ত্রণ করতেন জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রলীগের সাবেক সাংগঠনিক সম্পাদক তানভীর রহমান খান। সারা দেশে গণপূর্তের সংস্কার কাজ সব একাই হাতিয়ে নিতেন তিনি। উপজেলা পরিষদের সরকারি অফিসগুলোতে সংস্কারের নামে শুধু রং লাগিয়েই হাতিয়ে নেওয়া হয়েছে কয়েক কোটি টাকা। শরীফ আহমেদের প্রভাব খাটিয়ে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের রেজিস্ট্রার দপ্তরে নিজের স্ত্রী তানজিলা তাজরিনকে নিয়োগ দিয়েছেন তানভীর।
১৪ জানুয়ারি হলফনামায় রাজউকের প্লট থাকার তথ্য গোপন করায় সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও তার ছেলে সজীব ওয়াজেদ জয়ের বিরুদ্ধে পৃথক মামলা করে দুদক। ১৩ জানুয়ারি ক্ষমতার অপব্যবহার করে রাজউক থেকে প্লট গ্রহণের অভিযোগে শেখ রেহানা, তার ছেলে রাদওয়ান মুজিব সিদ্দিক ববি, মেয়ে আজমিনা সিদ্দিক, টিউলিপ সিদ্দিক এবং শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে পৃথক তিনটি মামলা হয়। এ ছাড়া গত ১২ জানুয়ারি শেখ হাসিনা ও মেয়ে সায়মা ওয়াজেদ পুতুল এবং জাতীয় গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের সচিবসহ ১৬ জনের বিরুদ্ধে ক্ষমতার অপব্যবহারের মাধ্যমে পূর্বাচলে প্লট বরাদ্দ নেওয়ার প্রমাণ পাওয়ায় মামলা করে দুদক।
২৭ জানুয়ারি তিন বিমানবন্দরে চার প্রকল্পে ৮১২ কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সামরিক উপদেষ্টা তারিক আহমেদ সিদ্দিকসহ ১৯ জনের বিরুদ্ধে পৃথক মামলা করে দুদক। গত ১২ ডিসেম্বর সাবেক স্বাস্থ্যমন্ত্রী জাহিদ মালেক ও তার ছেলে, সাবেক ডাক টেলিযোগাযোগ ও তথ্য-প্রযুক্তি প্রতিমন্ত্রী জুনাইদ আহমেদ পলক ও তার স্ত্রী এবং সাবেক বস্ত্র ও পাট প্রতিমন্ত্রী মির্জা আজম ও তার স্ত্রীর বিরুদ্ধে পৃথক ছয়টি মামলা হয়।
এরপর অবৈধ সম্পদ অর্জনের অভিযোগে ফেনী-২ আসনের সাবেক এমপি নিজাম উদ্দিন হাজারী, বাংলাদেশ জাতীয় ক্রিকেট দলের সাবেক অধিনায়ক ও মানিকগঞ্জ-১ আসনের সাবেক এমপি নাঈমুর রহমান দুর্জয় ও সাবেক খাদ্যমন্ত্রী সাধন চন্দ্র মজুমদারের বিরুদ্ধে পৃথক তিনটি মামলা হয়। এ ছাড়া ইসলামী ব্যাংকের ঋণ জালিয়াতির ঘটনায় আলোচিত ব্যবসায়ী এস আলমের ছেলেসহ ৫৮ জনের বিরুদ্ধেও হয়েছে মামলা।
গত ২২ ডিসেম্বর ৩৫ কোটি ৯৬ লাখ ৮৭ হাজার ১৬৫ টাকার জ্ঞাত আয়বহির্ভূত অবৈধ সম্পদ থাকার অভিযোগে বরগুনা-২ আসনের সাবেক এমপি শওকত হাচানুর রহমান রিমনের নামে মামলা করেছে দুদক। এ ছাড়া ২ কোটি ৫২ লাখ ৮৪ হাজার ৫৮২ টাকার অবৈধ সম্পদ থাকার অভিযোগে রিমনের স্ত্রী রওনককে সম্পদ বিবরণী দাখিল করতে বলেছে সংস্থাটি।